ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সরদার ফজলুল করিমের দর্শনজগৎ

সরদার ফজলুল করিমের দর্শনজগৎ
×

সরদার ফজলুল করিম [১ মে ১৯২৫–১৫ জুন ২০১৪]

কাবেরী গায়েন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরদার ফজলুল করিম একাধারে দার্শনিক, অধ্যাপক, সমাজ পরিবর্তনের সক্রিয় অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তাঁর দার্শনিক পরিচয়টি। অথচ পাশ্চাত্যের দার্শনিকদের আকরগ্রন্থ অনুবাদক হিসেবে যতবার তাঁর নাম উচ্চারিত হয়, তাঁর নিজস্ব দর্শন-ধারা নিয়ে আলোচনা খুব সামান্যই হয়। কীভাবে দেখব আমরা সরদার ফজলুল করিমের দার্শনিক জগৎ? 
সরদার ফজলুল করিমের রচনাকে তিন ভাগে দেখতে পাই– অনুবাদ, নিজস্ব প্রবন্ধ এবং আকরগ্রন্থ। এ ছাড়া লিখেছেন অজস্র কলাম। দিয়েছেন বক্তৃতা। তাঁর দার্শনিকতা এসব লেখা এবং সক্রিয়তার নিরিখেই দেখতে হবে। 
সারাটা জীবন তিনি যুক্তি বা আর্গুমেন্টের চর্চা করেছেন। কী সেই আর্গুমেন্ট? তাঁর আর্গুমেন্ট ছিল সস্তা নিশ্চয়তা দাবির বিরুদ্ধে, যে কোনো ধরনের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। তিনি ‘কৃষকের পোলা’ মাটির মর্মমূল থেকে উঠে আসা দার্শনিক। কিন্তু শুধু এটুকু বললে সবটা বলা হয় না। তিনি দ্রুত প্রশ্নের উত্তরে পৌঁছে যাবার দাবি করার চেয়ে বরং প্রশ্নের মধ্যে বসবাস করেছেন। সেইসব প্রশ্ন তাঁর কাছে অনেক দাবি তুলেছে, এবং এমনভাবে তাঁর জীবন সাজিয়েছে যে সেই জীবন নিজেই হয়ে উঠেছে এক দার্শনিক টেক্সট। যে টেক্সটের প্রকরণ এক প্রাবন্ধিকের, দর্শনের ভাষায় যাকে বলা হয় এসেইস্ট।
ব্রিটিশ মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রবন্ধকার অ্যাডাম ফিলিপস একবার দ্য প্যারিস রিভিউতে লিখেছিলেন, কোনো প্রভাব বিস্তারকারী প্রবন্ধ লেখার জন্য একজন প্রাবন্ধিককে প্রয়োজনে তাঁর টোন পরিবর্তন করার নমনীয়তা থাকতে হয়। নিজেকে নিজেই নিরীক্ষণ করতে হয়। সরদার স্যার ছিলেন সত্যিকার অর্থে– কাগজেকলমে নন কেবল, বরং তাঁর সময়ের যে ব্যাকরণ, সেই ব্যাকরণের এসেইস্ট। নিজের কাজকে বারে বারে নিরীক্ষণ করেছেন, যেন কোনো নিরঙ্কুশের ধারণা প্রশ্রয় না পায়। শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা, নিরঙ্কুশের ধারণা আক্রান্ত যে কোনো রচনাই শেষতক ফ্যাসিবাদে পর্যবসিত হতে পারে।
সরদার এসেইস্ট ছিলেন একেবারে মূলগত অর্থে। কী সেই অর্থ? বেঁচে থাকার চেষ্টা, উদ্যোগ এবং নিরীক্ষা। তিনি জীবনবাদী দার্শনিক–  বলেছেন, “জীবন জয়ী হবে”। তিনি সেই জীবনকে অর্থবহ করার জন্য উদ্যোগ ও সক্রিয়তার চর্চা করেছেন, এবং প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করেছেন। যখনই মনে করেছেন ফ্যাসিবাদের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, খুব শক্তভাবে সেটা প্রতিহত করেছেন। যে পার্টির জন্য একদিন অবলীলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, তারও আগে লন্ডনের ফেলোশিপ ছিঁড়ে ফেলেছেন, সেই পার্টিও তিনি প্রয়োজনে ত্যাগ করেছেন, অথচ শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার প্রতি তাই বলে আস্থা হারাননি। এই কাজটি কঠিন। কোনো বিষয়ে নিশ্চিত মতামত দেওয়া সহজ কাজ। 


খুব শক্ত থাকা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু কোনো বিষয়ে  প্রশ্নহীন আনুগত্য থেকে মুক্ত থাকা এবং একইসাথে নীতিবান থাকা কঠিন। কনভিকশন এবং সন্দেহ হাতের একই মুঠোতে রাখা কঠিন। 
সরদার স্যারের দার্শনিক উত্তরাধিকার স্যারকে এই দুই বিষয়কে একত্রে পরিচালনা করতে পারার শক্তি দিয়েছে। প্লেটো বিষয়ে পণ্ডিত, অ্যারিস্টটল-রুশো-এঙ্গেলসের অনুবাদক হিসেবে তিনি পাশ্চাত্য চিন্তার মহৎ টেক্সটগুলো বাংলায় অনুবাদ করেছেন। লাখো পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এসব পাঠকের বৃহত্তর অংশ নয়তো কোনোদিনই এসব মহাগ্রন্থের সাথে পরিচয় হতো না হয়তো। তিনি প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সেতুবন্ধ করেছেন, প্রাচীন জ্ঞানের সাথে আধুনিক লড়াইয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছেন, যুক্ত করেছেন লাইব্রেরি এবং রাস্তার উত্তাপ। তিনি অনুবাদ করেছেন প্লেটোর ‘দ্য রিপাবলিক’, রুশোর ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’, এরিস্টটলের ‘পলিটিক্স’ এবং এঙ্গেলসের ‘অ্যান্টি-ডুরিং’। এগুলো শুধু স্কলারলি কাজ ছিল না। সরদার স্যারের কাছে এটা ছিল র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্রেসির জন্য কাজ– তিনি এই কাজের মধ্য দিয়ে বুঝিয়েছেন যে আইডিয়া সবার জন্য উন্মুক্ত, যারা গ্রিক, জার্মান বা ফ্রেঞ্চ জানেন, কেবল তাদের জন্য নয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর জনগণকে জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াইয়ের অস্ত্র জুগিয়েছেন।
কেবল বইয়ের মধ্যে যে জীবন, সেই জীবন বেছে নিয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি আরাম বেছে নেননি। 
তাঁর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯২৫ সালে জন্ম নিয়ে খুব অল্প বয়সেই বিপ্লবী চিন্তায় আকৃষ্ট হন। তাঁর সমসাময়িক অনেকের মতোই তিনি শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ উপন্যাস দিয়ে সাম্যবাদে উদ্বুদ্ধ হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পড়ার জন্য কিন্তু তাঁর ভবিতব্য ছিল দর্শনের সাথে বাঁধা। দর্শনের অধ্যাপক হরিদাস ভট্টাচার্যের বক্তৃতা তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি প্রভাষক হন। কিন্তু তারপর ইতিহাসের অনুপ্রবেশ ঘটে তাঁর জীবনে, বাকিটা ইতিহাসের অংশ।
পাকিস্তান আমলে, তিনি বিবেচিত হয়েছেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে। ১১ বছর কারাভোগ করেছেন ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে। চিন্তা করার অপরাধে, ভিন্নমত থাকার অপরাধে, গরিব এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য কণ্ঠস্বর থাকা প্রয়োজন– এমন কথায় বিশ্বাস করার জন্য জীবনের এতগুলো বছর অন্ধকার কারাগারে জীবন কাটানো আসলে কী জিনিস, তিনি জেনেছেন। জেলের মধ্যে থেকেই ১৯৫৪ সালে তিনি কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে নির্বাচিত হয়েছেন। আইয়ুব খানের আমল নিশ্চিত করেছে তিনি যেন শিক্ষকতায় ফিরতে না পারেন।  আইয়ুবশাহী তাঁকে চিহ্নিত করেছে ধ্বংসাত্মক ব্যক্তি হিশেবে। ঠিকই আছে। তিনি মিথ্যাকে ধ্বংস করেছেন সত্য দিয়ে। নিপীড়নকে ধ্বংস করেছেন সংহতি দিয়ে। তিনি নীরবতাকে ধ্বংস করেছেন বক্তব্য দিয়ে। 
গ্রিক দর্শনের স্টোয়িক বা আত্মনিয়ন্ত্রণকারী মতবাদ আমাদের শেখায় ভোগান্তি (সাফারিং) এবং মিনিং (অর্থ) পাশাপাশি অবস্থান করে। সেইন্ট এক্সাপারি লিখেছেন, “We don’t ask to be eternal beings. We only ask that things do not lose all their meaning”। দীর্ঘ কারাবাস, বঞ্চনা, রাজবন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণের দাবিতে ৫৮ দিন অনশন– এসবের কিছুই সরদার ফজলুল করিমকে ভাঙতে পারেনি কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন ভোগান্তি কখনও শেষ হয় না। তিনি স্টোয়িকদের মতোই নিজের ভেতরকার দুর্গে বিশ্বাস করতেন। নিজের মধ্যে এমন দুর্গ বানানো যে বাইরের কষ্ট তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না যদি না তিনি নিজে তাদের ঢুকতে দেন। ভারতীয় দর্শনেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবল উপস্থিতি রয়েছে।
এই বিন্দুতে এসে বলা যায়, সরদার স্যার কেবল ভাষার অনুবাদ করেননি, বরং অনুবাদ করেছেন অভিজ্ঞতার। একজন অনুবাদক দুই তীরের মধ্যে অবস্থান করেন। অনুবাদক দুই জগৎকেই অন্তরঙ্গভাবে বুঝবেন, সকল শব্দের অর্থ প্রেক্ষিতসহ বুঝবেন। তিনি ভোগান্তিকে অনুবাদ করে জ্ঞানে রূপান্তর করেছেন। কারাগারের নির্জনতা অনুবাদ করে রূপান্তরিত করেছেন সংহতিতে। তিনি প্রাচীন টেকস্টকে আধুনিক বাংলায় অনুবাদ করেছেন, এবং সেটা করতে গিয়ে তিনি দর্শনকে অতীতের একাডেমিক বিলাসিতা থেকে মুক্ত করে মুক্তির উপায় হিশেবে অনুবাদ করেছেন। সাম্যবাদী দর্শনে দীক্ষা তাঁকে এভাবে তৈরি করেছে।
স্টোয়িক দার্শনিকেরা শিখিয়েছেন আমরা আমাদের পরিস্থিতি সব সময় বেছে নিতে পারি না, কিন্তু সেই পরিস্থিতির বিপরীতে আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে– সেটা বেছে নিতে পারি। এ কথা জানতেন  মারকুস ওরেলিয়াস নর্থান ফ্রন্টিয়ারে বসে যিনি লিখেছেন মেডিটেশন  কিংবা এপিকিউরাস যিনি জন্মেছিলেন দাস হয়ে। তাদের মতোই সরদার স্যার জেলের নির্জন কুঠুরিতে বসে চিন্তা, অনুবাদ এবং লেখার সময় জানতেন এই কথা। তিনি জেলের কুঠুরিতে বসেই অনুবাদ করেছেন প্লেটোর ‘রিপাবলিক’। অনবরত আলাপচারিতায় থেকেছেন যেখান থেকে বের হয়েছে অধ্যাপক রাজ্জাকের সাথে তাঁর আলাপচারিতা হিসেবে। এই আলাপচারিতার ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছে এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যানভাসের কাঠামো যার মধ্যে বাংলাদেশ ধারণাও নিহিত ছিল।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। এবার তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। তিনি একের পর এক লেখেন দর্শনকোষ, লেখেন সেই সে কাল, চল্লিশের দশকের ঢাকা, নানা কথা, নানা কথার পরের কথা। প্রবন্ধকার নীরবে তাঁর কাজ করতে থাকেন।
তাঁর দার্শনিক নৃতত্ত্ব– মানুষ সম্পর্কে তাঁর বোঝাপড়া– একেবারে মূলগতভাবে নৈতিক। তিনি বলতেন মানুষ হলো একাধারে সামাজিক এবং নৈতিক সত্তা, যে বৈষম্য কমানোর জন্য কাজ করবে। তাঁর কাছে নৈতিকতা কোনো একসেট নৈর্ব্যক্তিক নীতিমালা ছিল না, বরং ছিল সমাজের সকল পরতে বিদ্যমান বঞ্চনা কমিয়ে আনার জন্য নিরন্তর প্রশ্ন। এদিক থেকে তিনি সক্রেটিসের অনুগামী, পরীক্ষণহীন জীবনযাপনের উপযোগী নয়, এবং পরীক্ষণের নিচে রাখা জীবন সব সময় আরামের হয় না।  
স্বঘোষিত চাষার পোলা পাশ্চাত্য দর্শনের সাথে গভীর সংস্পর্শে এসেছেন, কিন্তু এই সংস্পর্শ তাঁকে তোতাপাখি বানায়নি। তিনি বরং অবিরত সংলাপে থেকেছেন, যা প্রতিনিয়ত চারিপাশ থেকে গ্রহণ করেছে, রূপান্তর করেছে এবং নতুন তৈরি করেছে।
শুরু করেছিলাম প্রবন্ধ লেখার ধরন নিয়ে। সেখানে ফিরে আসি। প্রাবন্ধিক  কখনও শেষ কথা বলেন না। বরং পাঠককে নিয়ে যান একটা চিন্তা-প্রক্রিয়ার মধ্যে। উপসংহার উপস্থাপন করা দার্শনিক প্রক্রিয়ার লক্ষ্য নয়। তিনি অন্বেষী থেকে নিজের পথ খুঁজে পেয়েছেন এবং সেই পথে অবিচল সাহস নিয়ে হেঁটেছেন। কিন্তু তিনি সেই পথকেই একমাত্র মনে করেননি। 
শুরুর দিকে আমি প্যারিস রিভিউ-এর কথা লিখেছি। এদের একটা প্রথা হলো সাক্ষাৎকার কাঠামোতে লেখা। ফিলিপ গুরেভিচ খেয়াল করেছেন, এই প্রক্রিয়ায় বক্তা একধরনের কথ্য প্রবন্ধ তৈরি করতে পারেন। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে সরদার স্যারের কথোপকথন সেই ধারার কাজ। এসব লেখা ফুটনোট এবং প্রথাগত যুক্তি প্রমাণের একাডেমিক পেপার নয়। এখানে দুই কথকই একই সাথে চিন্তা করেন কোনো বৃহত্তর চিন্তাকে অবয়ব দেওয়ার জন্য।
স্টোয়িকরা বলতেন, বাইরের কোনো বিষয় তাদের বিরক্ত করে না। তাদের বিরক্ত করে কোনো বিষয় সম্পর্কে বিচারিক প্রবণতা। সরদার স্যারের জীবনেও দেখি এই বোধের সাক্ষ্য। তিনি জেলে বসে অ্যারিস্টটল অনুবাদ করতে পারেন। তিনি রাষ্ট্রের সকল নিপীড়নের মুখেও বিনয়ী, প্রশান্ত, কর্মমুখর থাকতে পারেন। আধিপত্য বিস্তার নয়। খ্যাতি নয়। সম্পদ ও অর্থের আকাঙ্ক্ষা নয়। স্যারের মাস্টারিটা ছিল ধৈর্যবান, শান্ত, নীরব কাজ পূর্ণ মনুষ্যত্বের দিকে ধাবিত হবার পথে। আর সেইসাথে অন্যকেও একই রকমভাবে কাজ করতে দেবার পথ তৈরিতে সাহায্য করা।
আমি একটা উপমা দিয়ে শেষ করি। লাইব্রেরি এক আশ্চর্য বিষয়। কক্ষভর্তি অনেক স্বর, কিন্তু শান্ত। এখানে সবার র‍্যাডিক্যাল সমতা– যে কেউ ঢুকতে পারে, পড়তে পারে, যে কেউ প্লেটো-অ্যারিস্টটল-রুশোর সাথে তর্কে লিপ্ত হতে পারে। লেখকরা মৃত, কিন্তু তারা কথা বলছেন। পাঠক জীবিত, কিন্তু তারা শুধু শোনেন। এই পরিসর সরদার স্যার তাঁর ভাষার মানুষদের জন্য তৈরি করেছেন। তিনি বাংলা ভাষায় এক লাইব্রেরি তৈরি করেছেন। তিনি পৃথিবীর মহৎ দর্শন চিন্তার টেক্সটগুলো জড়ো করেছেন। তারপর তিনি বলেছেন: এসো। পড়। চিন্তা কর। বাহাস কর। এই পরিসর তোমার।
দরজা খোলা। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, রুশো, এঙ্গেলস এবং সরদার ফজলুল করিমের শান্ত, নিরবচ্ছিন্ন স্বর সেখানে অবিরত সংলাপে রত। কী শিখলাম তাঁর জীবন এবং দর্শন থেকে? আমরা সবাই বিপ্লবী নই। আমরা সবাই যুগ ধরে জেলে থাকিনি। কিন্তু আমরা শিখতে পারি সততা এবং স্পষ্টতার সাথে চিন্তার কথা। শিখতে পারি কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতে। নিজেদের শক্ত মতামত ধারণ করার সাথে সাথে নিজের চিন্তাকে নিরীক্ষণ করতে– নিজের বক্তব্যের সত্যতা সাক্ষ্যের সাথে মেলানো, আমাদের নৈতিক প্রতিজ্ঞার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এবং ভালোবাসা ও ন্যায়বিচারের দাবির প্রতি সত্য অবস্থান নেওয়া হতে পারে আমাদের শিক্ষা। আর আমাদের কাজ হলো জ্ঞান এবং অনুভবের অনুবাদ অব্যাহত রাখা। নদীর দুই পারে ফের সেতু বানানো বিরোধ উপশমের জন্য। অবিরত সংলাপ জারি রাখা। মনে রাখা জরুরি যে নিজের জীবনের নিরীক্ষণ কঠিন কাজ, বিপজ্জনক এবং অত্যন্ত প্রয়োজন। ভাস্কর্য বানিয়ে কিংবা কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে আমরা তাঁকে সম্মান জানাতে পারব না, তাঁর মতো কাজ করার চেষ্টার মধ্য দিয়েই কেবল তাঁকে সম্মানে রাখতে পারব। 

আরও পড়ুন

×