এখনও যে কারণে কাফকা
মোজাফ্ফর হোসেন
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মৃত্যুর শতবর্ষ অতিক্রম করার পরও বলতে হচ্ছে, যত দিন যাচ্ছে ততই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন কাফকা। তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাজগৎ (kafkaesque) বর্তমান সত্য-উত্তর সমাজে ব্যক্তির অবস্থান নির্ণয়ের অপরিহার্য সূত্র হয়ে দেখা দিয়েছে। এটা এমন একটা সময় যখন সত্য আর ‘ফ্যাক্টস’ না, ‘পারসেপশন’। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যেটা উপস্থাপন করে, সেটা না; ব্যক্তি বা সমষ্টি যেটা মনে করে সেটাই সত্য। কাফকা যেটা শতবর্ষ আগে দেখিয়েছেন– একজন ব্যক্তির ফাইল বা নথিপত্র ওই ব্যক্তির জায়গা জুড়ে নিয়েছে– ফাইলটাই হলো আসল, ব্যক্তি তার ছায়াবিশেষ। সেটা এখন আরও সাংঘাতিক হয়ে দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিচ্ছে যেখানে অপরাধী নিজে তার অপরাধ খুঁজে নিচ্ছে। একজনকে অত্যাচার করা হচ্ছে– মুক্তি পেতে হলে তাকে স্বীকার করতে হবে যে সে অপরাধী। সমস্যাটা শুধু সামাজিক বা রাজনৈতিক না, মনস্তাত্ত্বিকও বটে। কখনও কখনও অভিযুক্ত একসময় সত্যি সত্যি মেনে নিচ্ছে: সে অপরাধী। মেনে নেওয়ার ভেতর দিয়ে সে নিজেই তার শাস্তির যথার্থতা খুঁজে নিচ্ছে। যেমন– জোসেফ কে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ জানতে না পেরে তার অতীতটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে বলে ঠিক করে। অর্থাৎ সে তার অপরাধ খুঁজতে শুরু করে।
কাফকার সাহিত্যে এই সমস্ত পরিস্থিতিকে মনে হবে যেন উপহাস, শুধু উপহাসের ওই চরিত্রগুলোর কাছে মনে হবে এটা একটা দুঃস্বপ্নের মতো। (এই উপহাসকে কুন্দেরা দেখছেন এইভাবে, ‘আমাদেরকে মানুষের মহত্ত্বের সুন্দর ইল্যুশন দেখিয়ে দুঃখবোধ সান্ত্বনা জানায়। কমিক বড়ই নিষ্ঠুর, এটা নির্মমভাবে আমাদের বেঁচে থাকার অর্থহীনতার ওপরই অর্থারোপ করে।’) কাফকা যে জগৎটা চিহ্নিত করছেন সেই জগৎটা অফিস-আদালত ও আমলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মিলান কুন্দেরা বলেছেন, ‘কাফকা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভেবে লেখেননি। তাঁর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল না। সিস্টেমের কারণেই যেন কাফকার গল্পগুলো আজ সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।’ তিনি এও বলেছেন, ‘কাফকা আমলাতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে উঠিয়ে এনেছেন তাঁর উপন্যাসের কাব্যে। তিনি যেভাবে খুব সাধারণ একজন মানুষের অতি সাধারণ একটা গল্পকে মিথে রূপান্তরিত করেন, তা আগে দেখা যায়নি।’
এই মিথ তৈরির বিষয়টি একটি ঘটনা দিয়ে চমৎকার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন কুন্দেরা। একবার প্রাগের জনৈক ইঞ্জিনিয়ার আমন্ত্রিত হয়েছিলেন লন্ডনের এক আলোচনা সভায়। তিনি প্রাগে ফিরে আসার পর একটি খবরের কাগজে পড়লেন তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে: ‘লন্ডনের একটি আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত এক চেক ইঞ্জিনিয়ার, পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁর সমাজতান্ত্রিক স্বদেশ সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করে পশ্চিমেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।’
ইঞ্জিনিয়ার ছুটে গেলেন পত্রিকার অফিসে। সম্পাদক ক্ষমা চেয়ে বললেন, তাঁর কিছু করার নেই, লেখাটা তিনি পেয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। ইঞ্জিনিয়ার এবার মন্ত্রণালয়ে গেলে তাঁকে বলা হলো যে, ভুল হয়ে গেছে, কিন্তু তাদেরও কিছু করার নেই কারণ প্রকৌশলবিদ সম্পর্কে এই রকমই রিপোর্ট পাঠিয়েছে লন্ডন দূতাবাসের গোয়েন্দা বিভাগ। খবরটি প্রত্যাহার করা সম্ভব নয় মর্মে তারা জানালেন, ইঞ্জিনিয়ারের এতে কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার হঠাৎ বুঝতে পারলেন যে তাঁকে নজরে রাখা হচ্ছে, তাঁর টেলিফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে। তিনি দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। অবশেষে আর চাপ না নিতে পেরে, অনেক ঝুঁকি নিয়ে বেআইনিভাবে দেশত্যাগ করলেন। এবং সত্যি সত্যিই রাজনৈতিক কারণে অবৈধ অভিবাসী হতে বাধ্য হলেন।
গল্পের এই পলাতক ভদ্রলোক কোনোদিনই জানতে পারবেন না তাঁর সম্পর্কে কে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা দিয়েছিলেন। তাঁর পরিস্থিতি যেন আদালতের সামনে জোসেফ কে কিংবা ‘ক্যাসল’-এর সামনে জমির জরিপকারী কে-এর মতোই। এদের তিনজনই একটা গোলকধাঁধার মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্দি। এই গোলকধাঁধাটা আরও অসহনীয় ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যখন ব্যক্তি ও সমাজ জানে অপরাধ তার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য যে অপরাধীকে খুঁজে নিয়েছে সে আসলে নির্দোষ। সবাই সবকিছু জানলেও কতগুলো আইনি প্রক্রিয়া কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে নির্দোষ ব্যক্তি দায়মুক্ত হতে পারছে না।
শতবর্ষ পরে কাফকার সেই ‘কে’-কে খুঁজে নিতে আমরা চোখ রাখতে পারি ঢাকার সংবাদপত্রে। দৃষ্টান্ত হিসেবে আমি দুটি ঘটনা তুলে ধরছি।
ঘটনা-১: সোনালী ব্যাংক থেকে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পালিয়ে গেছেন আবু সালেক নামে এক ব্যক্তি। কিন্তু দুদকের মামলায় সালেকের পরিবর্তে বিনা অপরাধে কারাভোগ করছেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। যার নিজের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, দুদক তাকে ভয়ংকর ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে ৩৩টি মামলা দিয়েছে। তাকে জেলে ঢুকিয়ে বলা হয়েছে, তুমিই অপরাধী। অশিক্ষিত জাহালম কাগজে কলমে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শুনানিতে দুদকের আইনজীবী স্বীকার করছেন, জাহালম ঋণগ্রহীতা নন। কিন্তু এরপরও তাকে জেলে থাকতে হয়েছে মাসের পর মাস।
ঘটনা-২: অপরাধ না করেও ভারতের আদালত হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশি নাগরিক বাদল ফরাজিকে। বেনাপোলে ইমিগ্রেশন শেষ করে ভারতের সীমান্তে প্রবেশের পরপরই বাদলকে আটক করে বিএসএফ। অপরাধী না হয়েও সে বোঝাতে পারেনি, খুনের অভিযোগে যে বাদলকে খোঁজা হচ্ছে সে আসলে অন্য কেউ। ১০ বছর জেলজীবন অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দেশে এসেও তাকে কারাগারেই থাকতে হচ্ছে। কিন্তু কেন? কারণ ভারতীয় আদালত তাকে দণ্ড থেকে রেহাই দেয়নি। আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী দণ্ডের বাকি মেয়াদ সে বাংলাদেশের কারাগারে ভোগ করবে। চাইলে সে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে পারবে। যে অপরাধ সে করেনি, সেই অপরাধের জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে অপরাধ মেনে নেওয়ার ভেতর দিয়ে তার মুক্তি।
এবার আসছি কাফকার ‘ট্রায়াল’ উপন্যাসে। সকালে ঘুম থেকে উঠে জনৈক ‘জোসেফ কে’ দেখলেন তার দরজায় পুলিশ, ওকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে। ‘কে’র বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ‘কে’ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কথা জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, সেটা তারা জানে না। এমনকি দারোগাও অবগত নন।
এই রহস্যময় মামলায় ফেঁসে যাওয়ার পর ‘কে’-কে সবাই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। কেউ কেউ তার মধ্যে অপরাধীকে দেখতে পায়। ‘কে’-এর কথা কেউ শোনে না। তার বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগেই তার দোষ খুঁজে বের করে আশেপাশের মানুষেরা। যে ঘটনা ‘কে’-র জীবন শেষ করে দিচ্ছে তা অন্যদের কাছে তামাশার মতো। ‘কে’-র উকিলও মনে করে, এই মামলায় ওর জেল হবে, তাই দেরিতে বিচারকাজ হলে তারই ভালো।
অথচ, মজার ব্যাপার কেউই জানে না ‘কে’-র অপরাধ কী! কে যখন জানতে পারছে না তার অপরাধ, তখন সে কীভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবে?
অন্য ঔপন্যাসিকেরা যেখানে প্রতিষ্ঠানের মুখোশ এমনভাবে উন্মোচন করেন যেন এইগুলো আসলে বিভিন্ন ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কাফকা দেখালেন, প্রতিষ্ঠান একটা স্বতন্ত্র নিয়মে চলে, কেউ জানে না কে বা কারা এই নিয়মগুলোর চালক বা এগুলো কবে চালু হয়েছিল, কিন্তু নিয়মগুলো আর কেউ পরিবর্তন করতে আসে না। ফলে খুব সাধারণ একজন মানুষের অতি সাধারণ একটা গল্প ভয়ংকর মিথে রূপান্তরিত হয়। মিথটা তৈরিই, চরিত্র সেখানে পা দিচ্ছে সিস্টেমের অংশ হিসেবে। তাই আমরা ‘কাফকা-সদৃশ’ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু এই চেষ্টা কি সফল হচ্ছে? সম্প্রতি একটি ঘটনা ঘটেছে ভারতের গুজরাটে। ঘুষ মামলায় ৩০ বছর কারাভোগের পর নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরদিনই ভুক্তভোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে ২০ রুপি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৯৯৭ সালে অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ার পাঁচ বছর পর অভিযোগ গঠন করা হয়। এরও এক বছর পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাত বছর চলে যায় রায় হতে। ২০০৪ সালের রায়ে সেশন আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। চার বছরের সাজার রায়ের জন্য আগেই জীবন থেকে সাত বছর শেষ। তবে সাজার চার বছর কেটে যেতে পারত। কিন্তু সেই ভুক্তভোগী সেটা মানতে পারলেন না। রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলেন। কাফকার হিসেবে ভুলটা করলেন এখানেই। সেই আপিল নিষ্পত্তি হতে সময় লেগে গেল দীর্ঘ ২২ বছর। এত বছর পর এসে হাইকোর্ট বলছেন, তিনি নির্দোষ। আর সেটা শোনার একদিন পর তিনি মরেও গেলেন।
এই হলো মুক্তির প্রহসন। এই কারণে কাফকার প্যারাবল ‘বিফোর দ্য ল’ বা ‘আইনের দরজায়’ দেখা যায়, একটি লোক তার প্রয়োজনে আইনের কাছে আসতে চায়। কিন্তু আসতে দেওয়া হয় না। সে অপেক্ষা করতে করতে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে জানতে পারে, আইনের এই দরজাটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারণ এটি শুধু তার জন্যই বানানো ছিল। কাফকা আমাদের দেখালেন, আইনের দরজা সব সময় খোলা, সকলের সমান অধিকার সেখানে। কিন্তু এক অতি সাধারণ নাগরিক আইনের দরজার মুখে আটকে যান। সামান্য গেটকিপারকে সে অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। অপেক্ষা করতে করতে তার মধ্যে রূপান্তর ঘটে যায়। সে হয়তো মৃত্যুবরণ করে, যেভাবে গুজরাটের ভুক্তভোগী মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু শারীরিক মৃত্যু না ঘটলে আরও ভয়াবহ ‘রূপান্তর’ তার জন্য অপেক্ষা করে– যে ধরনের রূপান্তরের ঘটনা ঘটেছে গ্রেগর সামসার ক্ষেত্রে। কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ গল্পে আমরা দেখি, ‘একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা দেখল সে পোকা হয়ে গেছে।’ শুরুর চমকপ্রদ এই লাইনটাকে সাহিত্যের সবচেয়ে ‘অস্বস্তিকর’ বা ‘ভীতিকর’ সূচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখল সে পোকা হয়ে গেছে। অস্বস্তি বা ভয়টা অবশ্য মানুষের এই পোকায় রূপান্তরিত হওয়ার মধ্যে নেই। আছে পরবর্তী ঘটনার মধ্যে। কারণ গ্রেগর সামসার জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, কিন্তু তার চারপাশের জগতে এতটুকু পরিবর্তন ঘটল না। পুরো পৃথিবী যেখানে বিস্ময়ে ভেঙে পড়ার কথা, সেখানে সবাই, এমনকি পরিবারের লোকজনও নির্লিপ্ত, যেন কিছু্ই ঘটেনি। তারা শুধু উদ্বিগ্ন, পোকা হওয়ার কারণে সংসারের রোজগেরে এই লোকটা যে অফিস করতে পারবে না, আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে, এই বিষয়টা নিয়ে। সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় এটাই। এই যে বর্তমানে বাংলাদেশে হামে প্রায় ছয়শ শিশুর মৃত্যু ঘটল, এটা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বেদনাদায়ক ঘটনা। কিন্তু এটা ‘ভীতিকর’ ঘটনা না। ভীতিকর ঘটনা হলো, সেই মৃত শিশুকে বুকে নিয়ে রাজপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে বাবা কিংবা মা; কিন্তু পুরো সমাজ নির্বিকার। শিশু মারা যাচ্ছে রোজ, যাদের মারা যাওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু কারও মধ্যে কোনো বিকার নেই। শিশুর মৃত্যুর চেয়ে এই বিকারহীন সমাজটা হলো ভীতিকর।
‘মেটামরফোসিস’-এর প্রথম বাক্যেই যেমন সামসার মৃত্যু ঘোষিত হয় এবং গল্পজুড়ে সে ক্রমেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, তেমনি আমরা জানি এই সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যর্থ হবে, জানার পর আমরা সকলে মিলে সেই ব্যর্থতার চিত্রনাট্য রচনা করতে থাকি। ব্যর্থ যে হবে, সেটা ভয়ংকর না– ভয়ংকর হলো সবকিছু জেনে প্রতিকারের নামে আমরাই ব্যর্থ করে তুলব।
না, আক্ষরিকভাবে আমরা কেউ পোকা হয়ে যাইনি। (শুরুতে বর্ণিত) জাহালম, বাদল কিংবা গুজরাটের ঐ ভুক্তভোগী মানুষই আছে। কিন্তু তাদের রূপান্তরটা গ্রেগর সামসার চেয়ে কোনো অংশে কম ভীতিকর না। সামসার মানুষ থেকে পোকায় রূপান্তর হওয়ার মতো একজন নিঃস্ব মজুরের হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপির দায়ে অভিযুক্ত হওয়া এবং ভিনদেশে বেড়াতে গিয়ে খুনের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাগুলো আমাদের কাছে ‘অ্যাবসার্ড’ বলে মনে হয়। ‘চরম রসিকতা’ ভেবে আমরা হয়তো কিঞ্চিৎ হেসেও ফেলি। কিন্তু তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে যায়, ‘দ্য ক্যাসল’-এর ‘কে’-র মতো তারা একটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর ফেঁসে গেছে। ‘দ্য ট্রায়াল’-এর জোসেফ কে-র মতো হয়তো স্মৃতি ঘেঁটে উদ্ধার করার চেষ্টা করছে তারা আসলেই কোনো অপরাধ করেছে কি না। অনেক সময় জাহালম কিংবা বাদলের মতো আক্রান্ত না হয়েও আমরা প্রত্যেকে আমাদের অপরাধগুলোর কথা স্মরণ করার চেষ্টা করি, এবং কোনো অপরাধ করেছি ধরে নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে আর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলতে সাহস করি না: যদি ফেঁসে যাই?
কাফকার এই আলোচনা শেষ করছি ডব্লিউ. এইচ. অডেনের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। কাফকার সাহিত্যের চরিত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অডেন বলছেন: যুদ্ধকালীন সময়ে একবার পেন্টাগনে আমাকে এক দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর দিন কাটাতে হয়েছিল। আমার কাজ শেষে বাড়ি ফেরার তাড়া নিয়ে আমি দ্রুত নেমে আসতে থাকি দীর্ঘ কয়েকটি করিডোর পেরিয়ে এবং চলে আসি একটি ঘোরানো-দরজার কাছে যার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন প্রহরী। প্রহরী আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ আমি জবাব দেই, ‘বেরোবার চেষ্টা করছি?’ ‘আপনি তো বাইরেই আছেন’ সে বলে। এক মুহূর্তের জন্য আমি অনুভব করি, আমিই ‘কে’।
- বিষয় :
- গল্প
