ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত

মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত
×

মূল : লাসলো ক্রাসনাহরকাই অনুবাদ : সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শেষ পর্ব 

 “যার হাতে প্রযুক্তি থাকবে, সে-ই শাসন করবে—আর আমরা নিজেরাই সেই নজরদারির ভেতর স্বস্তি খুঁজে নেব”
                    অথবা 
“কখনো হাল ছেড়ো না—কারণ জীবন একসময় অসাধারণ হয়ে উঠবে… শুধু একবার চোখের পাতা ফেল”

~

শত শত পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটছে, একে অপরকে ত্বরান্বিত করছে,  আর এখন আমাদের কাছে আছে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট—যা তোমাকে কাজের খোঁজ দেয়,  হতে পারে তিন মিনিটের কাজ—যদিও এখনও একটি কন্ট্রাক্ট সেট করতে চার দিন লেগে যায়—কিন্তু দেখবে ব্লকচেইনের জন‍্য  একসময় সবকিছু সম্পূর্ণ দ্রুত আর স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে, তখন হয়তো আইনজীবীরও দরকার পড়বে না—দুই পক্ষই আগেই সব জানবে,  এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে আমি তোমাকে একটি কাজের জন্য নিয়োগ করতে পারব, সবকিছু সামলাবে ব্লকচেইন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,  এখনো আমাদের “ভ্যালিডেটর” লাগে,ধরো, তুমি তোমার ফ্ল্যাটটা বিক্রি করতে চাও, আর আমি সেটা কিনতে চাই—তখন পুরো প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ে এক মধ্যস্থতাকারী, একজন আইনজীবী, সে সবকিছু যাচাই করবে, সময় নেবে, আর তার জন্য খরচও করতে হবে, তাতে  পুরো ব্যাপারটাই ধীর হয়ে যায়, কিন্তু সামনে আর এমন থাকবে না, ভ্যালিডেটরটাই তখন মুদ্রার ভেতরেই গাঁথা থাকবে—ব্লকচেইনের মাধ্যমে সে নিশ্চিত করবে, তুমি সত্যিই সেই ব্যক্তি, যাকে তুমি দাবি করছ ; দুই পক্ষই তখন শতভাগ নিশ্চিত থাকবে—একজন আরেকজন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যা যা জানা দরকার, সবই জেনে যাবে,  স্মার্ট কন্ট্রাক্ট সম্পন্ন—ব্যস, আইনজীবীদের জন্য দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই—তারা তখনও ব্লকচেইনের স্রোতে চড়ে তাদের পারিশ্রমিক পাবে, ব্যাংকগুলোর জন্যও দুঃখ পাওয়ার দরকার নেই—তারা নিজেরাই নিজেদের ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু করবে, তখন তুমি হয়তো বলবে—“এই ব্যাংক আমাকে এক লাখ রিভনিয়া ঋণ দিয়েছে”—কিন্তু প্রশ্ন উঠবে, সত্যিই কি সেটা এক লাখ রিভনিয়ার সমান মূল্য রাখে? আমার মনিটরে যদি দেখা যায়, আমার অ্যাকাউন্টে এক লাখ রিভনিয়া আছে—তাহলে আমি কখনোই, কোনোদিনই, এই ব্যাংক ছাড়ব না — কারণ তার টাকা-ই আমার টাকা,  আর এই যুক্তিটাই পুরো সমাজজুড়ে যথেস্ট হয়ে উঠবে—মুদ্রার সীমানা ছাড়িয়ে, একেবারে ব্যবস্থাগত স্তরে, কিন্তু এসব ঘটতে হলে নজরদারির পদ্ধতিকে ভীষণ উন্নত হতে হবে—  সেটাও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে—যদিও এগুলো মূলত স্বৈরশাসিত দেশগুলোতে বেশি দেখা যায়, কিন্তু একসময় বৈশ্বিক স্তরেই নজরদারির প্রয়োজন হবে,  কারণ সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে হলে, প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পর্কে পূর্ণ তথ্যের প্রাপ্যতা দরকার—গ্লোবালভাবে— তবেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, যে ব্যক্তির সঙ্গে তুমি লেনদেন করছ, সে সত্যিই সেই ব্যক্তি—আর তার দেওয়া তথ্য নির্ভরযোগ্য, হ্যাঁ, শুনতে ভয়ানক লাগতে পারে,  কিন্তু ব্যাপারটা সেদিকেই যাচ্ছে—ফিরে যাওয়ার আর পথ নেই,  ব্লকচেইন তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের সুযোগ দেয়—মানুষ ছাড়াই, বা যাদের আমরা “গেটকিপার” বলি, তাদের ছাড়াই, এতে অবিশ্বস্ত মানুষরা ধীরে ধীরে সিস্টেমের বাইরে পড়ে যাবে, আর বিশ্বস্তরা থেকে যাবে, শেষ পর্যন্ত যারা এই নিরাপত্তার মান পূরণ করতে পারবে না, তারা স্বাভাবিক জীবনযাপনও করতে পারবে না, তোমাকে অবশ্যই বিশ্বস্ত হতে হবে। ভালো হতে হবে; না হলে তুমি সমাজের সঙ্গে সংযুক্তই থাকতে পারবে না, এবার তুমি হয়তো বলবে—“এগুলো  সবই অসম্ভবই, যদি না সর্বক্ষণ নজরদারি থাকে” — এটা সত‍্যি, এর মানে হচ্ছে—সপূর্ণ উন্মুক্ততা মানেই হল সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়া, আসলেই তাই,  কিন্তু অন্য কোনো পথ নেই, 
জলসংকট ভয়াবহ হয়ে উঠছে—পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—  আর সেটা করতে হলে আমাকে জানতে হবে—তুমি কতটা পানি খাচ্ছ, টয়লেট ফ্লাশে কতটা ব্যবহার করছ, গোসলের জন্য কতটা, বাগানে কতটা দিচ্ছ, তারপর সেই অনুযায়ী তোমাকে পুরস্কৃত বা শাস্তি দিতে হবে,  অর্থাৎ, সবাইকে থাকতে হবে সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে, 
কিন্তু—এ কথা বলতে বলতে সে গলা নামিয়ে আনল, আবার সঙ্গীর দিকে গড়িয়ে গেল, তার হাতটা খুঁজে পেল—ঠান্ডা ! সে হাত ছাড়ল না, ধরে রেখেই বলল— সবকিছু যদি খুব ভয়ের মনে হয়, তাহলে একটা বিষয় আছে, যা এটাকে সহনীয় করে তোলে— তা হল সচেতনতা, আর স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ, 
এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। সবাইকে অংশ নিতে হবে বৈশ্বিক জীবনে—সবাইকে, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া,  প্রত্যেককে জানতে হবে—সে কী করছে, কেন করছে, এর মূল্য কত, এর ফল কী?
যেটা বন্ধ করতে হবে—তা হলো, আমরা আজও কত নির্বোধের মতো অন্যদের আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দিই, আমাদের সম্মতি ছাড়াই !  কিন্ত অন্য কোনো পথ নেই—সত্যিই নেই, যার হাতে প্রযুক্তি থাকবে, সে-ই শাসন করবে—সে-ই হবে প্রভু — দেখবে কেউ আপত্তি করবে না। সবাই বরং উপভোগ করবে—এই নজরদারির মধ্যেই খুঁজে পাবে স্বস্তির জীবন,  আমাদের এক পা ইতিমধ্যেই ভার্চুয়াল জগতে, এতক্ষণ যা বললাম—সবই সেদিকেই যাচ্ছে, পনেরো বছর ধরে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছি;  পনেরো বছর আগে কেউ যদি বলত—একদিন মানুষকে গেমের ভেতর একটা আলোর তরবারির কেনার জন্য টাকা দিতে হবে—হ্যাঁ, একটা আলোর তরবারি —যেটা কখনো হাতে নেওয়া যাবে না, কারণ বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্বই নেই—তাহলে আমরা হয়তো হাসতাম,  অথচ আজ সেটাই এক বিশাল বাজার,  অথবা এমন একটা জুতোর জন্য টাকা দেয়া লাগবে —যা কখনোই বাস্তবে পায়ে পরা হবে না,  কখনোই না, শেষবার কবে হাতে ধরে ছবি দেখেছিলে? এখন আর হাতে ধরার দরকার নেই—স্ক্রিনেই যথেষ্ট - তোমার আবেগ আর  অনুভূতিটা তো  একই রকম থাকে —আমরা ক্রমশ আরও বেশি জিনিস ভার্চুয়াল জগতে নিয়ে যাচ্ছি, 
চলো—একবার চোখ পিটপিট করতো —বলতে বলতে সে বরফঠান্ডা, রক্তমাখা হাতটা চেপে ধরল, 
NFT-কে ভুলে গেলে চলবে না। নন-ফাঞ্জিবল টোকেনের এই জগৎ আমাদের এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে—যদিও, সত্যি বলতে, এটা এখন আর ভবিষ্যৎ নয়—এখনই ঘটছে — বিশেষত শিল্পের জগতে,  
শুনতে অদ্ভুত লাগে—স্বীকার করি, আমরা এখন অনেক নতুন জিনিস নিয়ে পরীক্ষা করছি—কিছু টিকবে, কিছু টিকবে না,  শিল্পবিপ্লব যেমন এক অপচয়ী জীবনধারার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি ডিজিটাল বিপ্লব অপচয়কে শাস্তি দিয়ে তা কমিয়ে আনবে,   আমরা ধীরে ধীরে আরও বেশি মেশিন নির্ভর হয়ে পড়ব—এমনও হতে পারে, জীবিত মানুষের চেয়ে মেশিনের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ বেশি হবে, ফলে আমাদের জীবনে ভার্চুয়াল জগতের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যাবে,
 আর একটা কথা—আমরা অমর হতে চাই।, সেটা সম্ভব হবে, যখন আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বকে ডিজিটাল করে আপলোড করতে পারব — তাত্ত্বিকভাবে, সেটাও এখন সম্ভব, আমরা শরীর বদলাতে পারব, মনকে ডাউনলোড করতে পারব, শরীরের যেকোনো অংশ প্রতিস্থাপন করতে পারব—এসব তো খুঁটিনাটি ব্যাপার, 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইউটোপিয়া ; একটা নিখুঁত পৃথিবীর স্বপ্ন,
সে  আবারও জোর দিয়ে বলল—ইউটোপিয়া মানে এমন একটা বিষয়, যা অসম্ভব বলে মনে হয়, হাজার হাজার ইউটোপিয়া ব্যর্থ হতে পারে—কিন্তু হয়তো এক লক্ষ এক নম্বরটি সফল হবে,  এটা যেন গির্জা নির্মাণের মতো—ধীর গতির, দীর্ঘ, কিন্তু একদিন পূর্ণতা পায়,
 সে আশা করছিল—তার কথাগুলো যেন এতটাই শক্তিশালী হয়, যাতে তার সঙ্গী ঘুমিয়ে না পড়ে,  “জেগে ওঠো সৈনিক, আমি T-64-এর শব্দ শুনতে পাচ্ছি—ওরা আমাদের নিতে আসছে। আমি যদি টিকে থাকতে পারি, তুমিও পারবে। শুধু শেষ কথাটা শোনো—”
“কখনো হাল ছেড়ো না, কারণ জীবন একসময় অসাধারণ হয়ে উঠবে, একবার শুধু চোখের পাতা ফেলো—দয়া করে, একবার ।
যেন বুঝতে পারি তুমি এখনো আমাকে শুনছ।
[সমাপ্ত]
 

আরও পড়ুন

×