চিরদিনের নক্ষত্র
হুমায়ূন আহমেদ ও কাজী আনোয়ার হোসেন (প্রচ্ছদ- আনিসুজ্জামান সোহেল)
ধ্রুব এষ
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৫ | ০০:৩৩ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৫ | ১২:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হুমায়ূন আহমেদ ও কাজী আনোয়ার হোসেন—বাংলাদেশের সাহিত্যজগতের দুই যুগপৎ অনিবার্য ও জনপ্রিয় নাম। কথাসাহিত্যের জগতে নিজের একান্ত দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজত্ব থাকলেও হুমায়ূন আহমেদ প্রচুর ‘নন-ফিকশন’ গদ্য লিখেছেন, লিখেছেন সাহিত্য সমালোচনাও। আবার কাজী আনোয়ার হোসেন রহস্যসাহিত্যের নানান ধারায় তৎপর থাকার পাশাপাশি অল্পবিস্তর গদ্যলেখাও লিখেছেন।
ভূতের গল্প যখন লিখবা তখন তোমাকে ভূত বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস না করে কিছু লিখবা না। ধরো তুমি রাতভর ভূত দেখার একটা গল্প শোনালে পাঠককে, সকালে বললে ভূত না এটা আসলে কলাপাতা ছিল। এটা কি ভূতের গল্প হলো? এটা তো প্রতারণা হলো।
কাজী আনোয়ার হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ এই দুজন আমার লেখা পড়তেন। সস্নেহে পড়তেন। না হলে কেন পড়বেন?
দৈনিক সমকালের সাহিত্য সাময়িকী কালের খেয়ায় আমি একবার একটা মব-তাড়িত লেখা লিখেছিলাম, ‘হাইওয়েতে হুমায়ূন আহমেদ’। কালের খেয়া শুক্রবারে ছাপা হয়, শনিবারে দখিন হাওয়ায় গেছি। সালেহ ভাই ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, সালেহ চৌধুরী। হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে নানা ডাকতেন। সালেহ ভাই আমাকে দেখে বললেন, ‘কালের খেয়ায় তোমার গল্পটা পড়লাম। ভালো লিখছো।’
ম্রিয়মাণ ভাবে বললাম, ‘গল্প না সালেহ ভাই, ঘটনা সত্যি।’
‘কী বলো?—হুমায়ূন, তুমি কি ধ্রুবর লেখা পড়ছো?’
প্রসন্ন হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘আমি ধ্রুবর সব লেখা পড়ি।’
‘রহস্যপত্রিকায়’ গল্প ছাপা হলো, কাজী আনোয়ার হোসেন প্রশংসা করলেন। আরও কিছু গল্প পরপর ‘রহস্যপত্রিকার’ জন্য লিখলাম। ছাপাও হলো। একটা গল্প ছাপা হলো না।—‘সবুজ বাংলা শার্ট পরে কে যায়’। কাজী আনোয়ার হোসেন বললেন, ‘রহস্যগল্প ঠিক আছে, কিন্তু এটার মধ্যে আরও কিছু আছে। এটা তুমি ভালো কোনো সাহিত্য পত্রিকায় দাও।’
কোন সাহিত্য পত্রিকায় দেব? তারা আমার গল্প কেন ছাপবেন? গল্পকার হামিদ কায়সারের সঙ্গে আমার সখ্য আছে। হামিদ কায়সার একটা গল্প দিতে বললেন—বিখ্যাত এক সাহিত্য পত্রিকার বয়োজ্যেষ্ঠ সম্পাদক তাঁকে কিছু তরুণ লেখকের গল্প জোগাড় করে দিতে বলেছেন। অপুকে গল্প দিলাম।—‘সবুজ বাংলা শার্ট পরে কে যায়’। হামিদ কায়সারের ডাকনাম অপু। বললেন গল্প জমা করে দিয়েছেন। কিন্তু সেই সাহিত্য পত্রিকায় আমার গল্প আর ছাপা হয় না। অবশেষে ছাপা হলো গ্রাফিক-উৎপাতসমেত, ওনারা যাকে ‘অলংকরণ’ বলেন, সেই জিনিসের বিকট রূপ এখনও আমার মগজ থেকে যায় নাই। হন্ট করে। গল্পটা না ছাপতেন বরং মহাজন।
ছোট এই লেখাটার এই অংশটুকু শাহীন ভাইয়ের জন্য লিখি। আহসান হাবীব, আমাদের শাহীন ভাই, দেশসেরা রম্য ম্যাগাজিন, ‘উন্মাদ’-এর সম্পাদক প্রকাশক। গ্র্যান্ড ফাদার অব বাংলা জোকস, জনপ্রিয় রম্য লেখক। শাহীন ভাইয়ের কোনো একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছি, ‘দাদাভাই’ তাঁর লেখা পড়তেন কিনা সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
শাহীন ভাইয়ের ‘দাদাভাই’ হুমায়ূন আহমেদ।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি হুমায়ূন আহমেদ শাহীন ভাইয়ের লেখা পড়তেন। আমাকে ভর্ৎসনা করেছিলেন একদিন, ‘গল্পের শেষে গিয়ে আমি বুঝি না, তুমি আর শাহীন, তোমাদের দুজনের মাথায় কি কেউ হাতুড়ি ধরে রাখে নাকি গল্প শেষ করে দেওয়ার জন্য? এত তাড়াহুড়া করো কেন?’
এই ‘গল্প’ শেষ না করি তবে।
টিপস শোনাই হুমায়ূন আহমেদের।
: ভূতের গল্প যখন লিখবা তখন তোমাকে ভূত বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস না করে কিছু লিখবা না। ধরো তুমি রাতভর ভূত দেখার একটা গল্প শোনালে পাঠককে, সকালে বললে ভূত না এটা আসলে কলাপাতা ছিল। এটা কি ভূতের গল্প হলো? এটা তো প্রতারণা হলো।
টিপস শোনাই কাজী আনোয়ার হোসেনের।
: ছোটদের লেখা যারা লেখেন ছোটদের কখনোই ‘ছোট্ট বন্ধু’ বলে সম্বোধন করবেন না। ‘তোমরা কি জানো’ কথাটাও লেখবেন না। আপনি কি নিশ্চিত আপনি যা বলবেন বা লেখবেন কোনো একটা বাচ্চা সেই কথাটা জানে না? বা আপনার চেয়ে বেশি জানে না? ছোট্ট বন্ধুরা তোমরা কি জানো বলে তো আপনি চ্যালেঞ্জ করছেন সেই বাচ্চাকে। বোকা হচ্ছেন।
- বিষয় :
- গল্প
- হুমায়ূন আহমেদ
