স্ববিরোধী নজরুল
কাজী নজরুল ইসলাম (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ – ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ)
ইমরান খান
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ | ২০:২৬ | আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ | ২০:৩০
নজরুলের আধ্যাত্মিক গান ও কবিতাগুলো ঘুরেফিরে শুনলে এবং পড়লে মনে একটা খটকা লাগতে পারে। স্ববিরোধীতার খটকা। ‘মসজিদের পাশে আমায় কবর দিও ভাই’ গানটা সবারই শোনা। তুলনামূলক কম প্রচলিত একটি গান হলো ‘যেদিন লব বিদায় ধরা ছাড়ি প্রিয়ে/ ধুয়ো লাশ আমার লাল পানি দিয়ে’। কবি চাচ্ছেন মৃত্যুর পর তার লাশটিকে যেন মদ দিয়ে গোসল করানো হয়। এই গানেরই অন্তরায় আমরা শুনি, ‘শারাবী জমশেদী গজল ‘জানাজায়’ গাহিও আমার/ দিবে গোর খুঁড়িয়া মাটি খারারী ঐ শারাব-খানার!/ ‘রোজ-কিয়ামতে’ তাজা উঠব জিয়ে’। মদ দিয়ে ধোয়ার পর তাঁর দেহটিকে যেন মদ্যশালাতেই কবর দেয়া হয়। এতে তিনি নাকি কেয়ামতের দিন তরতাজা অবস্থায় পুণরুত্থিত হবেন। এই একইসাথে মসজিদের পাশে আর মদ্যশালায় কবর পাওয়ার আকুতি কবির কোন্ ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে? একই ভাবে ‘‘ক্ষমা করো হযরত” কবিতায় তিনি মহানবির আদর্শ পালন করতে ব্যর্থ হয়ে অনুতপ্ত। আবার ‘‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা” গানটিতে সংসারের যন্ত্রণায় দগ্ধ মানুষের শেষ আশ্রয় হিসেবে শ্মশান-মাতা কালীর উপাসনা দেখতে পাই। এমনকি এই গানে তিনি মৃত্যুকে মহীয়ান করেছেন। এভাবেই তাঁর পুরো সাহিত্যকর্ম জুড়ে বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে আছে নানান স্ববিরোধীতা। দ্বিচারিতা?
নজরুলের তুলনামূলক স্বল্পপঠিত কাব্যানুবাদ জুড়ে আছে হাফিজ আর ওমর খৈয়ামের মতো আধ্যাত্মিক কবিদের শের-শায়েরির অনুবাদ। সেখানে কোথাও তিনি প্রেমিকার ঠোঁটে খুঁজেছেন যন্ত্রণা থেকে ক্ষণিকের মুক্তি, মদ খাওয়াকে করেছেন মহিমান্বিত, পৃথিবীতে আসার ইচ্ছে তাঁর ছিল না বটে, তবে এসেছেন যখন, আর যাবার ইচ্ছে নেই— এই ধরনের কথাও আছে।
একজন শিল্পী নির্দিষ্ট কোনো বিশ্বাস, বাঁধন, জাতি বা ধর্মে আবদ্ধ থাকেন না। নির্দিষ্ট একটি বিশ্বাসকে প্রচার করা মানে হলো জগতে সত্য একটিই— এই দাবি করা। কবি জানেন জগত বহুমাত্রিক, জগতের ইতিহাসও তাই এবং আজ যাকে সত্য বলে জানেন, দুদিন পরেই তা ভুল মনে হতে পারে। জীবন বহুরূপী। সুতরাং তাঁর চিন্তার দরজা-জানালা সবসময় খোলা থাকে। নজরুলের জ্ঞানতৃষ্ণা ছিল অসীম। ফারসি কবিদের মধ্যে হাফিজ, ওমর খৈয়াম, রুমি এবং সাদি শিরাজি-র প্রভাব তাঁর রচনায় স্পষ্ট। বিশেষ করে রুমির সুফিবাদ এবং হাফিজের প্রেমচেতনা নজরুলের কবিতায় নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। তাঁর “দেওয়ান”, “রুবাইয়াত-ই-হাফিজ” অনুবাদ, কিংবা গজলধর্মী গানগুলোতে ফারসি কাব্যের প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলা সাহিত্যে গজলধারাকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও নজরুলের ভূমিকা অনন্য। তিনি ফারসি শব্দ, উপমা ও ছন্দকে বাংলা ভাষার সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে তা বাংলা কাব্যভাষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। “শিরাজি”, “সাকি”, “মেহের”, “ইশ্ক”, “ফিরদৌস” প্রভৃতি ফারসি শব্দ তাঁর কবিতায় স্বাভাবিক সৌন্দর্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনের সঙ্গেও নজরুলের পরিচয় ছিল গভীর ও আন্তরিক। তিনি কেবল ইসলামী ঐতিহ্যের কবি ছিলেন না; বরং ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের বহুত্ববাদী চেতনাকেও আত্মস্থ করেছিলেন। হিন্দু পুরাণ, উপনিষদ, ভক্তিবাদ এবং শাক্ত দর্শনের নানান উপাদান তাঁর সাহিত্যজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তিনি ভগবদ্গীতা, পুরাণ ও বৈষ্ণব পদাবলির ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাঁর কবিতায় কালী, শিব, কৃষ্ণ কিংবা অর্জুন-এর উল্লেখ যেমন এসেছে, তেমনি ইসলামী ইতিহাস ও প্রতীকেরও সমান উপস্থিতি রয়েছে। মানুষের ইতিহাসে যত মতবাদ, বিশ্বাস, জীবনাদর্শ আর দর্শন এসেছে, কোনোটিকেই তিনি পরিত্যাগ করে অন্যটিকে গ্রহণ করেননি। একজন কবির পরিচয় তিনি কবি। তাঁর সকল দায়বদ্ধতা শিল্পের কাছে, নির্মোহ সত্যের কাছে, স্বাভাবিক মানবিক আবেগের কাছে। আর কোনো দায়বদ্ধতায় শিল্পী ধরা দেন না।
নজরুলের আধ্যাত্মিক দর্শনের মূলভিত্তি ছিল মানবমুক্তি ও সাম্যের আদর্শ। সুফিবাদ এবং ভারতীয় ভক্তিবাদের মিলিত প্রভাব তাঁর মনে ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে এক মানবতাবাদী চেতনা সৃষ্টি করে। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল বিভাজনের নয়, মিলনের শক্তি। ‘ধর্ম’ মানে স্বভাব। মানুষকে মানুষ হতে গেলে মানব স্বভাবকে অতিক্রম করে সাম্যবাদী চেতনায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
সব মিলিয়ে, ফারসি সাহিত্য নজরুলকে দিয়েছে প্রেম, সুর, সুফি ভাবনা ও কাব্যিক রূপকল্পের ঐশ্বর্য; আর ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন তাঁকে দিয়েছে বহুত্ববাদ, সাম্য ও মানবধর্মের উপলব্ধি। এই দুই ধারার সৃজনশীল সংমিশ্রণই কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য, বিশ্বজনীন কবির মর্যাদা দিয়েছে।
- বিষয় :
- নজরুল উৎসব
- নজরুল জন্মজয়ন্তী
