একজন ক্রীতদাস : হুমায়ূনের ধূসর মানুষ
মাহরীন ফেরদৌস
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের জীবনে দুঃখ বড় বিচিত্র ও রহস্যময় এক অনুভূতি। সুখের সন্ধানেই মানুষের আজীবন ছুটে চলা, অথচ অনেক সময় একটি দুঃখই মানুষকে নিজের গভীরে পৌঁছে দেয়। হুমায়ূন আহমেদের ‘একজন ক্রীতদাস’ গল্পটি পড়তে গিয়ে আবার নতুন করে এই সত্য উপলব্ধি করতে হলো। গল্পের শেষ লাইনে কথক বলেন, “আমার জন্যে এই দুঃখটার বড় বেশি প্রয়োজন ছিল।”
আর ঠিক এই বাক্যটি থেকেই সম্পূর্ণ গল্পটি মোড় নেয় অন্য নির্জনতায়, অন্য অর্থে। যে গল্পটিকে প্রথমে ভাঙা প্রেমের আখ্যান বলে মনে হয়, সেটাই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে আত্মসম্মান, হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা এবং দুঃখের অস্তিত্বগত প্রয়োজনের এক অনুসন্ধানে।
গল্পের মূল চরিত্র নামহীন। হুমায়ূন আহমেদের বহু গল্পের মতো এই গল্পের নামহীন কথক কালেকটিভভাবে অজস্র স্বপ্নহারা মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। তার প্রেমিকা পারুলকে শুরু থেকে যেভাবে পাঠক আবিষ্কার করে, তাতে পারুলকে যেমন মনে হয় বাস্তববাদী ও বিচক্ষণ, তেমনি তাদের সম্পর্কটিও গতানুগতিক রোমান্টিক বা স্বপ্নালু কোনো প্রেমের সম্পর্ক বলে মনে হয় না। সম্পর্কটির ভেতরে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং বাস্তব জীবনের চাপ টের পাওয়া যায় প্রচ্ছন্নভাবে।
টাঙ্গাইলে গিয়ে তাদের বিয়ে হওয়ার কথা থাকলেও পারুল নির্ধারিত দিনে সেখানে উপস্থিত হয় না। পরে টেলিফোনে সে জানায়, কিন্ডারগার্টেনের একটি চাকরি পেয়েছে এবং বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দিতে চায়। মাত্র তিনশ টাকা বেতনের একটি মাস্টারির চাকরি তাকে আর্থিকভাবে খুব শক্তিশালী না করলেও মানসিকভাবে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী। সে হয়ে ওঠে আরও স্পষ্টভাষী। কোনো আবেগের আশ্রয় না নিয়ে সে কথককে জানিয়ে দেয়, যার ব্যবসার অবস্থা এত অনিশ্চিত, তাকে এখনই জীবনসঙ্গী করা সমীচীন নয়। এই মুহূর্তে মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদ কি পারুলকে অনেকের কাছে নির্মম করে তুলতে চাইছেন? নাকি তিনি আত্মবিশ্বাসী এক নারীতে রূপান্তরিত করছেন? উত্তরটুকু খুঁজে পাওয়া যায় গল্প আগালেই। গল্পটিতে পারুলকে একমাত্রিক নিষ্ঠুর চরিত্র হিসেবে নির্মাণ করা যায় না। বরং তার নানা সিদ্ধান্তে বাস্তবতার কঠিন উপস্থিতি ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। প্রেমের চেয়ে যাপিত জীবনের সচ্ছলতা ও নিরাপত্তাকে সে গুরুত্ব দেয় বেশি। এমন সিদ্ধান্তকে নৈতিকতার মাপকাঠিতে হয়তো বিচার করা যায়, কিন্তু জীবনবোধের বিচারে তা মোটেই অস্বাভাবিক মনে হয় না।
গল্পজুড়েই আমরা পারুলকে দেখি কথকের চোখের ভেতর দিয়ে। ফলে পারুলের নিজস্ব ভাবনা, দ্বিধা বা অনুভূতির চেয়ে বেশি প্রকাশ পায় কথকের আঘাত, অভিমান এবং বেদনা। এই সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পারুল হয়ে ওঠে একইসঙ্গে স্পষ্টভাষী, আন্তরিক এবং রহস্যময়। কখনও সে সহজভাবে কথকের খোঁজখবর নেয়, কখনও বন্ধুর সন্তানের জন্য বেছে দিতে বলে উপহার। পারুলের এমন আচরণ নিয়ে পাঠকমনও এক সূক্ষ্ম অস্বস্তি ও দোলাচলে ভোগে। কারণ, একতরফাভাবে পারুলকে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ফেলা যায় না। তাকে পুরোপুরি নিষ্ঠুর বা স্বার্থপর যেমন বলা যায় না, তেমনি কথকের প্রতি তার গভীর প্রেমও দৃশ্যমান নয়। বরং মনে হয়, সম্পর্কটি আবেগের চেয়ে বাস্তবতার পরীক্ষায় বেশি পরীক্ষিত। এই দ্বৈততাই চরিত্রটিকে আশ্চর্যরকম আকর্ষণীয় ও জীবন্ত করে তোলে।
হুমায়ূন আহমেদের কথাসাহিত্যে এমন নারী চরিত্রের উপস্থিতি প্রায়ই লক্ষ করা যায়। তারা প্রচলিত অর্থে ট্র্যাজিক নায়িকা না, আবার নির্মম প্রতিপক্ষও না। তারা আবেগপ্রবণ, কিন্তু আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে না।
তারা আন্তরিক, কিন্তু জীবনের বাস্তবতা ও সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন না। সে কারণেই, এই গল্পটি পড়তে পড়তে আমার বারবার ‘একটি নীল বোতাম’ গল্পের এশা চরিত্রটির কথা মনে হয়েছে। সেখানেও এশা গল্পকথকের প্রতি আন্তরিক, কিন্তু সেই আন্তরিকতা কখনও প্রেমের প্রতিশ্রুতিতে রূপ নেয় না। দুই গল্পেই নারী চরিত্র যেন পুরুষ কথকের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র, কিন্তু তারা সেই আকাঙ্ক্ষার রাজ্যের বাসিন্দা নন। সম্ভবত এখানেই হুমায়ূন আহমেদের নারী চরিত্র নির্মাণের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই নারী চরিত্ররা রহস্যময়, কিন্তু কোনো নাটকীয় গোপনীয়তার মাধ্যমে নয়; বরং তাদের অসম্পূর্ণভাবে জানার মধ্য দিয়ে। পাঠক তাদের পুরোপুরি বুঝতে পারে না, ঠিক যেমন গল্পকথকরাও পারে না। এই জায়গায় অঞ্জন দত্তের গানের মালা চরিত্রটির কথাও মনে পড়ে। অনেকের কাছে মালা যেন মান্না দে-র গাওয়া ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানের সুজাতার আরেক রূপ। যেখানে জীবনের একসময়কার আবেগ শেষ পর্যন্ত নিরাপদ সংসার, প্রতিষ্ঠিত জীবন ও সামাজিক স্থিতির ভেতর খুঁজে নেয় নতুন অর্থ। তবে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নারী চরিত্রকে সেই সরল সমীকরণে আবদ্ধ করেন না। পারুলের আকাঙ্ক্ষা কোনো বিত্তবৈভবের নয়, বরং একটি স্বাভাবিক, স্থিতিশীল ও নিরাপদ জীবনের।
গল্পে আমরা দেখি তার সুস্থ সংসার, ফুটফুটে সন্তান, বান্ধবীর সঙ্গে স্বাভাবিক চলাফেরা, ভালো চাকরিজীবী স্বামী, এসবই আসলে তার বেছে নেওয়া জীবনের পরিণতি। এই পরিণতিকেই হুমায়ূন আহমেদ কোনো নৈতিক রায় না দিয়ে অস্পষ্টভাবে আঁকেন। পারুলকে তিনি আদর্শও বানান না, আবার অপরাধীও করেন না। আজকের ভাষায় যাকে আমরা গ্রে ক্যারেক্টার বলি, সেই জটিল মানবচরিত্র তিনি বহু বছর আগেই বাংলা কথাসাহিত্যে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নির্মাণ করে গিয়েছেন। গল্পের শেষ দৃশ্যটি কাহিনির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ। সেখানে দেখা যায়, কথকের ভগ্নজীবন দেখে পারুল নীরবে কেঁদে ফেলে। এই চোখের জলের কোনো ব্যাখ্যা লেখক দেন না। সেটি কি অপরাধবোধ, নাকি হারিয়ে যাওয়া এক সম্ভাব্য জীবনের শোক, নাকি একসময় পরিচিত একজন মানুষের করুণ পরিণতি দেখে মানবিক হাহাকার জেগে ওঠা, তার উত্তর পাঠকের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। পাঠকও টের পায়, পারুলের এই কান্না কোনো পুনর্মিলনের সূচনা না, বরং দুজন মানুষের মধ্যকার দূরত্বকেই আরও স্পষ্ট করে। তবু এই কয়েক ফোঁটা জলই কথকের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা অনুভূতিকে আবার জাগিয়ে তোলে নতুনরূপে। এতদিন যে মানুষটি দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বেঁচে থাকার সংকটে ক্লান্ত, হতাহত এক জীবন পার করে প্রেমকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, সেই মানুষই আবার উপলব্ধি করে, পৃথিবীর সকল বেদনার মাঝেও তীব্র বেদনা নিজের একান্ত কাছের মানুষটিকে না পাওয়ার। কারণ একমাত্র সেই মানুষটির কাছেই হয়তো তার নিজেকে মানুষ বলে মনে হতো। সে উপলব্ধি করতে সক্ষম হতো সুখ, দুঃখ, বেদনা। সম্ভবত সেই কারণেই গল্পের শেষ বাক্যটি এত তীব্র মনে হয়। এই দুঃখ-অনুভব এখানে হারানোর স্মৃতি না; কথকের একান্ত অস্তিত্বকে আবার অনুভব করায়।
একঘেয়ে আর ক্লান্তিকর জীবনের গল্পের কাছে আশ্রয় খুঁজতে আসা পাঠক তাই শেষ পর্যন্ত শুধু কথককেই ভালোবেসে ফেলে না, ভালোবেসে ফেলে পারুলকেও। কারণ গল্পটি মানুষকে তার সমস্ত অসম্পূর্ণতা, দ্বিধা, ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজন নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড় করায়। আমাদের ভেতরে রেখে যায় অতৃপ্তির এক দীর্ঘ ছায়া, মেলানকোলিক কোনো গানের মতো।
- বিষয় :
- গল্প