ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

প্রথম রবি

প্রথম রবি
×

হাশেম খান [জন্ম: ১ জুলাই ১৯৪১]

হাশেম খান

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমি ছবি আঁকি, লেখালেখি করি; দুটি কাজই সমানভাবে চালিয়ে যাই। হয়তো আমার ছবি আঁকার খবরটাই মানুষের কাছে বেশি পৌঁছেছে। 
লেখালেখির প্রসঙ্গে একটা কথা মনে এলো। যত দিন যাচ্ছে, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। আমাদের আমলে সবাই বই পড়ত, পত্রপত্রিকা পড়ত। এখন মোবাইলের যুগ, কম্পিউটারের যুগ। টেলিভিশনের যুগ তো বটেই। কেউ আর বই বা পত্রপত্রিকা ইত্যাদি পড়ে দেখতে চায় না। খুব অল্প সময়ে তারা পুরো পৃথিবীকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে চায়। এর ফলাফল হচ্ছে– কিছু মনে থাকে, কিছু মনে থাকে না। একটা বই পড়লে, সেই বইয়ের ভাষা যেমনই হোক না কেন, তার কাহিনি বা অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো–যেমন মানুষের জীবনযাপন, পরিবেশ, দুঃখকষ্ট–মনের ভেতর গেঁথে যায়। এরপর নিজের চিন্তাভাবনার সঙ্গে মিলে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয় মনে, এবং আমার ধারণা, এর প্রভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়। ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু পড়া বা জানার প্রতি একটা অদম্য আগ্রহ বোধ করতাম। আগ্রহের রসদ জোগাতেন আমার বড় ভাই, সুলেমান খান। তাঁকে দাদা ডাকতাম। দাদার ডাকনাম ছিল দুদু। আমার ডাক নাম মধু। দাদা মেডিসিনের ডাক্তার ছিলেন, এমবিবিএস। ছাত্রজীবন থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক ছিলেন। পাকিস্তানে তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ। জ্ঞান চক্রবর্তী, খোকা রায় তাদের সঙ্গে দাদার ভালো যোগাযোগ ছিল। আরও কয়েকজন ছিলেন, এ মুহূর্তে স্মরণে আসছে না। দাদার বন্ধুদের ভেতর আরো ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। পাকিস্তান আমলে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া ছিল। গোপীবাগের বাসায় রোগী পরিচয়ে দাদা তাঁকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিংবদন্তি বিপ্লবী, সাহিত্যিক, সংগঠক ও উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেনও ছিলেন পরম সুহৃদ। ষাটের দশকের শেষদিকে যখন উদীচীর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল, আমাদের গোপীবাগের বাসায় এর সদস্যদের নিয়ে গোপনে সংগীত অনুশীলন করতেন সত্যেন সেন। এখন ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলীর সঙ্গেও দাদার অন্তরঙ্গ বন্ধুতা ছিল। বন্ধু ছিলেন গণস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও বারডেমের নামকরা চক্ষুবিশেষজ্ঞ প্রয়াত ডা. সাইদুর রহমান খসরু।


ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমাকে দেখলেই বলতেন, ‘তোমার আর সুলেমানের চেহারায় এতো মিল! তোমাকে আসতে দেখলে মনে হয় সুলেমানই আসছে।’ কবি জসীম উদ্দীনের মেজো ছেলে জামাল আনোয়ার, ডাকনাম বাসু ছিলেন দাদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। 
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাবেক সভাপতি প্রয়াত আয়েশা খানমের স্বামী প্রকৌশলী মর্তুজা, শ্রমিক নেতা ও প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান, ডাক্তার ফৌজিয়া মোসলেমের (বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি) স্বামী সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক–তাঁরাও ছিলেন তাঁর সুহৃদ। দাদার অনুজ ভক্তদের মধ্যে ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাত (প্রয়াত) এবং আখতার হুসেন। হাসনাত মজা করে বলতেন, ‘আমরা ছিলাম সুলেমান ভাইয়ের চ্যালা।’ তাঁর প্রিয় অনুজদের আরেকজন ছিলেন বুলবন ওসমান। একাত্তরে কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি দাদাকে নিয়ে ‘সুলেমান ভাই’ নামে একটি গল্প লিখেছিলেন। গল্পটি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সম্পাদিত ‘বাংলাদেশ কথা কয়’ গ্রন্থে স্থান পেয়েছিল।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় দাদা আমাদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যান, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন। চিকিৎসাসেবা দিতেন এবং সেইসূত্রে গ্রামের ঘরে ঘরে তাঁর যাতায়াত ছিল। গ্রামের যারা মুসলিম লীগার বা নেজামে ইসলামীর লোক ছিল–এদের ভেতর অনেকেই ছিল আমাদের খুব পরিচিত–তারা তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে ভাবল, ‘এ দেখছি অতি বিপজ্জনক! আমাদের শেষ করে ফেলবে, পাকিস্তান নষ্ট করে ফেলবে। চিকিৎসার নামে সারাদিন ঘুরে বেড়ায় আর মানুষকে দেশ স্বাধীন করার কথা বলে।’ 
যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পরে আমাদের গ্রামের বাড়ি আক্রান্ত হয়। আক্রমণের ধরন ছিল অভিনব। সেই সময় বাড়িতে বাড়িতে প্রায়ই ডাকাতি হতো। ডাকাতের ছদ্মবেশ নিয়ে তারা এলো। কিন্তু কথা শুনে আমি অনুমান করতে পারছিলাম পাকিস্তানি আর্মিও ওদের ভেতর আছে। ডাকাতের ছদ্মবেশে তারা আমাদের খুন করার জন্য এসেছিল। রাত তখন দুটো। ওরা থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে গুলি করছিল দরজায়, বারবার। হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ছিল। আমরা শুরুতে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, ভাবছিলাম গ্রামের ভেতরে কি পাকিস্তানি আর্মি ঢুকল? এত অস্ত্র নিয়ে ঢাকার ২৫ মার্চ রাতের মতো আক্রমণ কেন! গ্রামের মানুষও হতচকিত। প্রথমে তাদের কজন আমার কাকার বাড়িতে ঢুকল। চিৎকার করে বলছিল, ‘কেউ বের হবি না বাড়ি থেকে!’ 
এক পর্যায়ে কাকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারা আমাদের বাড়ির দরজা খুলতে বলল। আমাদের দরজা কাঠের হলেও খুব শক্ত ছিল। লোহাকাঠের তৈরি। এমনিতে টিনের ঘর, কিন্তু দরজা-জানালাগুলো খুব মজবুত ছিল। আমাদের সেই দরজা ভাঙতে তারা কৌশলের আশ্রয় নিল। আমাদের বাড়িতে অনেক নারকেল গাছ ছিল। পুকুরঘাটে সিঁড়ি করার জন্য একটা নারকেল গাছ কাটা ছিল। ওদের ভেতর দশ বারোজন সেই নারকেল গাছের গুঁড়ি তুলে নিয়ে এসে দরজায় আঘাত করতে থাকে। দরজা কিন্তু ভাঙেনি, কিন্তু বারংবার আঘাতের ফলে এক পর্যায়ে কবজাগুলো খুলে গেল। তারা ঢুকে পড়ল। 
প্রথম ঘর থেকে মা আমাদের সবাইকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেলেন। সেদিন আমার ভাগনে-ভাগনিরা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নানার বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল। ওরা সবাই তরুণ-তরুণী, কেউ কলেজে, কেউ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। দাদার ভয় হলো, মেয়েদের ওপর না আবার আক্রমণ করে বসে। বললেন, ‘শোন, আমরা প্রথমে কিচ্ছু করব না। ওরা কী চায় দেখব। যদি টাকাপয়সা চায়, যা আছে দিয়ে দেব। যদি মেয়েদের ওপর আক্রমণ করে, কেউ ছাড়বি না। খালি হাতেই আমাদের লড়তে হবে, বিনা বাধায় যেন কেউ বের হতে না পারে।’
আমাদের টিনের ঘরের মাঝে ছিল টিনের বেড়া। একপাশে থাকতেন আমার দাদা ও ভাবি, আরেক পাশে থাকতাম আমি ও আমার স্ত্রী। ভেতরে আমার মা তাঁর নাতি-নাতনি নিয়ে থাকতেন। মা আমাদের সবাইকে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিলেন। লোকগুলোও অস্ত্র নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আমার ছোট ভাই মনসুর, ভালো নাম মনসুর আহমেদ, তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় মাস্টার্স পড়ছে। লোকগুলো অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে তার মুখটা দেখল। আমার আরেকটি ছোট ভাই স্কুলে পড়ত। টর্চ জ্বালিয়ে তাকেও দেখল। দেখে বলল, ‘এই দুগা ন। ঐন্য দুগা (এই দুজন না, অন্য দুজন)।’
পাশেই ছিলেন দাদা, আর পারলেন না, দাঁড়িয়ে গেলেন। ওরা বলল, ‘টাকা দে।’ দাদা বলল, ‘দিচ্ছি। কিন্তু আর কিছু চাইতে পারবি না।’ কথাটা উনি শেষ করতে পারেননি। একজন শুধু নিশ্চিত করল, ‘হ্যাঁ, এটাই ডাক্তার।’ সঙ্গে সঙ্গে থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি। মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে। থ্রি নট থ্রি এত ধ্বংসকামী যে, সেটির রেঞ্জের ভেতর যা কিছু পাবে, সবকিছু ভেদ করবে। এর রেঞ্জ ২০০ গজ। ঠিক ২০০ গজই গুলি যাবে। ওরা গুলি করল। ভাগনে-ভাগনি অনেকে এসেছিল বলে সেখানে খাট চৌকি একত্র করে সবার শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, বিছানাগুলো তেমনই ছিল। আমি একটা বিছানার ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই মুহূর্তে আমি আর দাদাই শুধু দাঁড়ানো, বাকিরা বসে ছিলেন। দাদাকে গুলির পর টের পেলাম আমাকেও গুলি করেছে। জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। একটু পরেই আমার জ্ঞান ফিরে এল। সেই সময় আমি শরীরের নিচের অংশে একদম অনুভব করতে পারছি না। আমি উপুড় হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম, কেউ একজন আমাকে চিৎ করে দিল। টর্চের আলো। আমি মরার ভান করে পড়ে থাকি। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। রক্তের শব্দ পাচ্ছি। ওরা বলল যে, ‘খতম হো গিয়া।’ এরপর ওরা সব চলে গেল।
চলে যাওয়ার পর আমি ধীরে ধীরে উঠে বসি। দাদা তাঁর ক্ষতস্থান ধরে রেখেছেন। ডাক্তার তিনি, নিজেও সব বুঝতে পারলেন। বললেন যে, ‘আমি হয়তো বেশিক্ষণ সারভাইভ করতে পারব না। যদি আমার ব্লাড ক্লট (রক্ত জমাট বাঁধা) করতে পারো, তাহলে যদি কিছু হয়।’ তখন এমন একটা অবস্থা, চাঁদপুরের কী গ্রামে, কী শহরে কোনো ডাক্তারই নেই প্রায়। মানুষ সব চলে গেছে, আর্মি ঢুকেছে। তাছাড়া শহর আমাদের বাড়ি থেকে সাড়ে চার মাইল, নৌকায় যেতে হয় অথবা রিকশায়। রাত তখন দুটো। থানা ফরিদগঞ্জ আরও দূরে। খবর পেয়ে গ্রামের ডাক্তার দৌড়ে এলেন। দাদা বললেন, ‘তোমার কাছে এটিএস আছে? যদি থাকে, দিয়ে দাও। আর দেখো ব্লাড ক্লট করতে পারো কি না।’
ব্লাড কিছুতেই ক্লট হচ্ছে না। তুলে ধরতেই ভিজে যাচ্ছে সব, কিছুতেই ক্লট হচ্ছে না। আমার পায়ে গুলি করেছে। পা নাড়তে পারছি না, অবশ। উঠে দাঁড়াতেও পারছি না। দাদা আমার কাছে এসে বলল, ‘তোকেও গুলি করেছে?’ 
‘হ্যাঁ।’ 
‘মাকেও গুলি করেছে। মঞ্জুকেও (ভাগনি) গুলি করেছে। এটা থ্রি নট থ্রি।’ 
দাদা এগুলো সব জানতেন। আর্মস সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা ছিল। বললেন, ‘আমি আর থাকতে পারছি না। প্রচণ্ড পেইন। আমাকে পানি খাওয়াও।’ আবার বললেন, ‘কিন্তু পানি খাওয়ালেই আমি মারা যাব। চেষ্টা করো, চেষ্টা করো আমার ব্লাডটা ক্লট করতে পারো কি না।’
এত তুলা, শাড়ি, কাপড় কিছু দিয়েই তাঁর রক্ত বন্ধ করা গেল না। দাদা আর দু’ ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন। আমার ‘গুলিবিদ্ধ ৭১’ নামে গ্রন্থে আমি এ নিয়ে লিখেছি। 
বলছিলাম, আমার জানার ক্ষুধা মেটাতেন দাদা। বই পড়া নেশা তাঁর আমার চেয়েও বেশি ছিল। আমি তখন থেকেই বিস্মিত। আমার থেকে মাত্র দুই বছরের বড়, কিন্তু অনেক বেশি জ্ঞান রাখতেন তিনি। অসম্ভব বই পড়তেন। বড়দের সঙ্গে কথা বলতেন একেবারে বড়দের মতো করেই। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছু ছোটবেলা থেকেই তাঁর নখদর্পণে। খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। খুব ভালো বাংলা বলতেন, ভালো বক্তৃতা দিতেন। আমার চোখে দাদার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল–অল্প সময়ে মানুষকে বন্ধু করে ফেলতে পারতেন। ডাক্তারিতেও সেরা। বই পড়ার অভ্যাস তাঁর কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি। 
পেছনে তাকালে দেখতে পাই ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র দুটির জন্মই হয়েছিল অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক উপায়ে, উদ্ভট নিয়মের ওপর। পাকিস্তানের সেই শুরুর দিনগুলোতেই গ্রামে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে। আমি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছি গ্রামের স্কুলে। বই পড়ার কারণে মনে অনেক প্রশ্ন জন্ম নিত, প্রশ্নগুলো কাকাকে করতাম, বাবাকেও জিজ্ঞেস করতাম যদিও তুলনামূলক কম। তবে আমার সমস্ত প্রশ্ন, সকল গল্পের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিলেন আমার দাদা, শহীদ ডা. সুলেমান খান— আমার জীবনের প্রথম প্রহরে আঁকা ও লেখার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। 

আরও পড়ুন

×