ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

সেতুর জন্য দশকের অপেক্ষা

সেতুর জন্য দশকের অপেক্ষা
×

শরীয়তপুরের নড়িয়া সদরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ভাষাসৈনিক গোলাম মাওলা সেতু সমকাল

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রলারে করে কীর্তিনাশা নদী পারাপারের সংগ্রাম শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের। কাকডাকা ভোরে শুরু হয় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। চলে মাঝরাত পর্যন্ত। নড়িয়া থেকে জাজিরা হয়ে ঢাকাগামী সড়কে একটি সেতু নির্মাণের কাজ ১০ বছরেও শেষ না হওয়ায় হাজারো মানুষের এই দুর্ভোগ। শুরুতে সেতুটির খরচ ধরা হয়েছিল ১৪ কোটি টাকা, বাড়তে বাড়তে যা এখন প্রায় ৩৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। 

জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, নড়িয়া উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত কীর্তিনাশা নদীর পূর্ব পাশে উপজেলা সদর; আর পশ্চিমে মোক্তারের চর, রাজনগর, নশাসন ও জপসা ইউনিয়ন। এ ছাড়া জাজিরা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষকে নড়িয়া সদরের যেতেও ব্যবহার করতে হয় ভাষাসৈনিক গোলাম মাওলা সেতুটি। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ১৯৯৭ সালে ১০৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করে এলজিইডি। ২০১৫ সালে সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভারী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০১৭ সালে ১৪ কোটি টাকা খরচে ১৪৫ মিটার দীর্ঘ নতুন সেতু নির্মাণ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাভানা কনস্ট্রাকশন কয়েক মাস কাজ করার পর বন্ধ করে দেয়। এক পর্যায়ে ২০১৯ সালে প্রকল্পটি ছেড়ে চলে যায় প্রতিষ্ঠানটি। ওই সময় পর্যন্ত তারা ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিল তোলে। 

এলজিইডি জানায়, ২০২১ সালে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে সেতুর সঙ্গে ২২২ মিটার ভায়াডাক্ট যুক্ত করা হয়। ২৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০৫ মিটার সেতু ও ভায়াডাক্ট নির্মাণের কাজ পায় কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর কার্যাদেশ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ করে। পরে তারাও কাজ বন্ধ করে দেয়। ইতোমধ্যে তাদের ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। আরও ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হবে।
এখনও প্রকল্পের ৫০ শতাংশ কাজ বাকি। এ জন্য তৃতীয় দফায় নতুন ঠিকাদারের সঙ্গে ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকায় চুক্তি করেছে এলজিইডি। এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলা হলেও স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে সংশয়। এরই মধ্যে নতুন সেতুর কাজ শুরুর জন্য ২০২৩ সালে পুরোনো সেতুটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর থেকে যাত্রী পারাপারের জন্য নদীতে তিনটি ট্রলার দেওয়া হয়। এসব ট্রলারে প্রতিদিন যাত্রী ও মোটরসাইকেল পারাপার করা হয়।

গত ৯ জুলাই সরেজমিনে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে ট্রলারে পারাপারের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও দেখা দেয়। মোক্তারের চর ইউনিয়নের খলিফাকান্দি থেকে প্রতিদিন এই 
পথে নড়িয়া সরকারি কলেজে যাতায়াত করেন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌসুমী আক্তার। তিনি 
বলেন, ‘আজ নদী পার হওয়ার জন্য ট্রলারে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টি শুরু হয়। বাধ্য হয়ে বসে বসেই বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। এভাবেই আমাদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি আর দুর্ভোগ নিয়ে 
চলাচল করতে হচ্ছে। আর কত দিন এভাবে চলতে হবে, তা জানি না।’
একই ইউনিয়নের মাদবরকান্দির বাসিন্দা আবুল মিস্ত্রি। তাঁর স্ত্রী প্রসব ব্যথা নিয়ে এদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আবুল মিস্ত্রি বলেন, প্রায় তিন কিলোমিটার পথ ভ্যানে আসেন। পরে গাদাগাদি করে ট্রলারে করে নদী পার হয়ে নড়িয়া হাসপাতালে যেতে হয়। প্রায় তিন বছর ধরে এভাবেই তাদের চিকিৎসাসহ সব প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ঝুঁকি নিয়ে নড়িয়া আসতে হচ্ছে।
নড়িয়া সদর থেকে জাজিরা হয়ে ঢাকায় যাওয়ার প্রধান পথেই পড়েছে সেতুটি। পদ্মা সেতু চালুর পর এই পথে যানবাহন চলাচল অনেক বেড়েছে। সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়ায় যানবাহন নদী পার হতে পারে না। যারা ট্রলারে উঠতে চান না, তাদের জেলা শহরের প্রেমতলা হয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ ঘুরে পদ্মা সেতু ব্যবহার করতে হয়। 
শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলামের ভাষ্য, নানা কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে পারেনি। তাই তৃতীয় দফায় ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ না করা দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় দফার ঠিকাদারের পাওনা টাকা থেকে ২০ শতাংশ কেটে রাখা হবে। নতুন ঠিকাদারকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×