বিষাক্ত পার্থেনিয়াম ছড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজ পথঘাটে
দেবীগঞ্জ উপজেলার পুলিশ সার্কেল অফিস-সংলগ্ন সড়কে ছেয়ে গেছে বিষাক্ত পার্থেনিয়াম সমকাল
দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে নীরবে বিস্তার লাভ করছে বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিকর আগ্রাসী আগাছা পার্থেনিয়াম। উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকা এবং জনসমাগমস্থলে ছড়িয়ে পড়া এ আগাছা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
২০২১ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অ্যাগ্রোনমিতে (Agronomy) প্রকাশিত এক গবেষণায় পার্থেনিয়ামকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিকর আগাছাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, পার্থেনিয়াম মাটি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম দ্রুত শোষণ করে প্রধান ফসলের পুষ্টির অভাব ঘটায়। এর শিকড় ও পাতা থেকে ‘পার্থেনিন’ নামক রাসায়নিক নিঃসরণ করে অন্য উদ্ভিদের অংকুরোদগম ও বৃদ্ধি রুখে দেয়। উদ্ভিদটির পরাগরেণু বাতাসে ভেসে অন্যান্য ফসলের পরাগায়নে তীব্র বিঘ্ন ঘটায়।
মানবদেহেও এটি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই গাছের সংস্পর্শে এলে ত্বকে লালচে দাগ, চুলকানি ও তীব্র অ্যালার্জি (কন্ট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস) হয়। বাতাসে ভেসে থাকা এর পরাগরেণু ফুসফুসে প্রবেশ করে মানুষের হাঁপানি, সাইনোসাইটিস ও অ্যালার্জিক রাইনাইটিস তৈরি করে। বাতাসে ওড়া রেণু চোখে লাগলে চোখ লাল হওয়া, জল পড়া ও চোখের পাতা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় এই আগাছার সংস্পর্শে থাকলে মানুষের জ্বর (হে ফিভার) এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্থেনিয়াম দমনে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। ফুল আসার আগেই গাছ অপসারণ করা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি বিভাগের অধ্যাপক ড. পারভেজ আনোয়ার বলেন, ‘পার্থেনিয়াম একটি অত্যন্ত আগ্রাসী উদ্ভিদ। এটি নতুন পরিবেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করে স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতিকে হুমকির মুখে ফেলে। কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়লে ফসলের অঙ্কুরোদ্গম ও ফলন কমে যায়। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। মানুষের মধ্যে অ্যালার্জি, চর্মরোগ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদসংলগ্ন লিচুতলা এলাকা এবং সোনাহার-দেবীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ পার্থেনিয়াম গজিয়ে উঠেছে। সড়কের দুপাশে, খোলা জায়গায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংলগ্ন এলাকায় আগাছাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
দেবীগঞ্জ সরকারি কলেজ, নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, দেবীগঞ্জ মহিলা কলেজ, দেবীগঞ্জ টেকনিক্যাল কলেজ ও আলাদিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষার্থী প্রতিদিন এসব পথ ব্যবহার করে। তাদের চলাচলের পথেই আগাছাটির বিস্তার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
দেবীডুবা ইউনিয়নের মরিচচাষি খোরশেদ আলম দেড় বিঘা জমিতে মরিচ আবাদ করেছেন। তাঁর ক্ষেতে এ আগাছার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। আগাছা দমনে অতিরিক্ত নিড়ানি দিতে হয়েছে, ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
খোরশেদ আলমসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই বললেই চলে। অনেকেই জানেন না যে দেখতে সাধারণ গাছের মতো হলেও পার্থেনিয়াম অত্যন্ত ক্ষতিকর আগ্রাসী উদ্ভিদ। ফলে বছরের পর বছর এটি বিস্তার লাভ করলেও এর বিস্তার রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
তাদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকা থেকে দ্রুত পার্থেনিয়াম অপসারণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করা হোক। অন্যথায় ভবিষ্যতে এটি দেবীগঞ্জের কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকট হয়ে দেখা দিতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার আগে ধারণা ছিল না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈম মোর্শেদ বলেন, ‘উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পার্থেনিয়ামের বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষকদের এটি শনাক্ত করতে সহায়তা করা হচ্ছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।’
- বিষয় :
- বিষাক্ত বর্জ্য