জলিল সাহেবের পিটিশন
সামান্য দাবি অসামান্য ইঙ্গিত
হুমায়ূন আহমেদ [১৩ নভেম্বর ১৯৪৮–১৯ জুলাই ২০১২] প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
শাহ্নাজ মুন্নী
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৯৮৬ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার দিনরাত্রি প্রকাশনী থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘শীত ও অন্যান্য গল্প’ শিরোনামের ছোটগল্প সংকলনে ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পটি প্রথম সংকলিত হয়। ধারণা করা যায়, সেই সময়েই অর্থাৎ ১৯৮৫ বা ৮৬ সালের দিকেই এই সাধারণ কিন্তু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছোটগল্পটি লেখা হয়েছিল। বহুল পঠিত ও আলোচিত গল্পটির মূল চরিত্র দুটি। একজন জলিল সাহেব, যিনি বয়স্ক ও দুজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পিতা, অন্যজন গল্পের বর্ণনাকারী, প্রফেসর আতিক বা লেখক। প্রফেসর সাহেবের সাথে ষাটোর্ধ্ব জলিল সাহেবের কথোপকথনের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি, তাঁর একটিমাত্র চাওয়া। তিনি চান মুক্তিযুদ্ধে যে ৩০ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক। এই দাবির পক্ষে তিনি সারাদেশের মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে বেড়ান। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত জলিল সাহেব এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পক্ষে তাঁর পিটিশন বা আবেদনে ৩২ হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। সংলাপ রচনায় সিদ্ধহস্ত হুমায়ূন আহমেদ জলিল সাহেবের মুখে যে তীক্ষ্ণ সংলাপগুলো বসিয়েছিলেন, সেগুলোর দিকে একটু তাকানো যাক।
“আমার ছেলে মারা গেছে যুদ্ধে। ওদের মৃত্যুর জন্য আমি কোনো বিচার চাই না। বিচার চাই তাদের জন্য, যাদের ওরা ঘর থেকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছে।’
‘বুঝলেন ভাই, অনেকে মানবতার দোহাই দেয়। বলে বাদ দেন। ক্ষমা করে দেন। ক্ষমা এত সস্তা? অ্যাঁ, বলেন সস্তা?”
“আপনি কি মনে করেছেন, আমি ছেড়ে দেব? ছাড়ব না। আমার দুই ছেলে ফাইট দিয়েছে, আমিও দেব। মৃত্যু পর্যন্ত ফাইট দেব। দরকার হলে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের সিগনেচার জোগাড় করব। ত্রিশ লক্ষ লোক মরে গেল, আর কেউ কোনো শব্দ করল না? আমরা মানুষ না অন্যকিছু বলেন দেখি?”
যখন ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পটি লেখা হয়েছিল, আমরা তখনকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটটি একবার ঘুরে দেখে আসতে পারি।
১৯৮৬ সালে দেশে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের একনায়কতন্ত্র চলছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে পেরিয়ে গেছে ১৫টি বছর। সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারের কবলে মুক্তিযুদ্ধ, শহীদদের আত্মত্যাগ, পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতা– সবই যেন বিস্মৃতপ্রায়। গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন। নানা রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাজনীতি ও সমাজে পুনর্বাসিত হতে শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ক্রমশ বিপন্ন ও বিস্মৃতির অতলে বিলীয়মান। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস, তাদের খুনিদের বিচার দাবির প্রসঙ্গটিও তখন আলোচনার বাইরে।
এরশাদ নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে সাংবিধানিক বৈধতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। এরশাদের সামরিক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভেতরে চলছে টানাপোড়েন এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির নির্বাচন বর্জন কিন্তু আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধের দেড় দশক পরের এই জাতীয় নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব উপভোগ করতে ব্যাকুল।
এ রকম যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন দেখতে পাই, ১৯৮৬ সালেই হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সাবলীল ভাষিক দক্ষতায় লিখছেন ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ শিরোনামের ছোটগল্প। আবার সেই একই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় দিনগুলো সামনে তুলে ধরে প্রকাশিত হয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা একাত্তরের মর্মস্পর্শী দিনলিপিগ্রন্থ– ‘একাত্তরের দিনগুলি।’
এর আগে ১৯৮৫ সাল থেকেই বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী ও সচিত্র সন্ধানীর সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দীনের উদ্যোগে জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনলিপি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল সচিত্র সন্ধানীতে। হয়তো আরও অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় তখন লিখছিলেন এসব প্রসঙ্গে। অর্থাৎ রাজনীতি ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বৈরী বাতাস বইলেও দেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ কিন্তু একাত্তরের স্মৃতি ও আত্মত্যাগের ইতিহাসের টিমটিম করে জ্বলতে থাকা ছোট্ট প্রদীপটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের চরিত্র জলিল সাহেব একাত্তরকে মনে রাখা সেই মানুষদের মধ্যে একজন। যিনি ব্যক্তিগত শোক ও প্রাপ্তির কথা বিবেচনা না করে স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারের সামান্য কিন্তু অসামান্য দাবিতে নিরীহ ফাইল সঙ্গে নিয়ে একা একাই লড়াই করে যাচ্ছেন। গল্পে সেই লড়াই তিনি শেষ করতে পারেননি। পারেননি সফল হতে। কিন্তু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল পরবর্তী প্রজন্মের কেউ না কেউ এই বিচারের দাবি ও এই পিটিশন বা আবেদন নিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য গল্পের মতোই সহজ স্বচ্ছন্দে এই গল্প পড়ে শেষ করে ফেলা যায়। কিন্তু মনের মধ্যে, মাথার মধ্যে জলিল সাহেবের প্রশ্নগুলো কুটকুট করে কামড়াতে থাকে। “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দশ লাখ ইহুদি মারা গিয়েছিল। সেই অপরাধে অপরাধীদের প্রত্যেকের বিচার করা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। কিন্তু এ দেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষ মেরে অপরাধীরা কী করে পার পেয়ে গেল? কেন এ নিয়ে আজ কেউ কোনো কথা বলছে না?”
আমরা কিন্তু দেখতে পাই পরবর্তী দশকগুলো জুড়ে জলিল সাহেবের এই প্রশ্নগুলো দেশের নাগরিকরা সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
নব্বই দশকের শুরু থেকেই বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনমত গঠন, তথ্য সংগ্রহ ও নাগরিক আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। আমরা মনে করতে পারি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত প্রতীকী গণআদালতের কথা। যা সেই সময় গণমানুষের মধ্যে প্রবল আলোড়ন তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে।
এটা ঠিক যে শুধু হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্প বা এককভাবে সাহিত্য একটি আন্দোলন তৈরি করতে পারে না। আরও অনেক উপাদান সংযুক্ত হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম দানা বাঁধে। কিন্তু এটাও সত্য জনমানসে পরিবর্তন আনতে সাহিত্য কখনও কখনও সামান্য হলেও ভূমিকা রাখে। আমরা দেখেছি, অনেক সময় লেখক কল্পনাআশ্রিত যে আখ্যান নির্মাণ করেন তা বাস্তব সত্যের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পের মাধ্যমে কে জানে হুমায়ূন আহমেদ হয়তো সাধারণ পাঠকের মনে একাত্তরের হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বপ্ন ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। হয়তো তিনি পাঠকের মনের সুপ্ত ক্ষোভ ও আবেগকে নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন।
হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্পের জগৎ বিচিত্র। ভালোবাসার দৈনন্দিন গল্প যেমন লিখেছেন, গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ভয়ংকর নিষ্ঠুরতার গল্পও লিখেছেন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগুলোও বিষয়বৈচিত্র্যে ও সৃষ্টি কুশলতায় অনন্য। ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নানামাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে হৃদয়স্পর্শী গল্প লিখেছেন তিনি। আমরা ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ ছাড়াও ‘উনিশ শ একাত্তর’, ‘জনক’, নন্দিনী’, ‘শীত’ ও ‘পাপ’ শিরোনামের গল্পগুলোর কথা উল্লেখ করতে পারি। এসব গল্পে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী বিভিন্ন বাস্তবতা ও জীবনসংগ্রামের ছবি তিনি এঁকেছেন নিপুণ চিত্রকরের মতো, তুলির দুয়েকটা সরল কিন্তু ব্যঞ্জনাময় টানের মাধ্যমে। ছোট পরিসরে মুক্তিযুদ্ধের মতো ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয়কে গভীর ও পরিমিতভাবে ‘কুশলী স্রষ্টার পাকা হাতে’ তুলে ধরেছেন।
- বিষয় :
- গল্প