চোখ : পিপাসা ও প্রার্থনা
মাজহার সরকার
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
হুমায়ূন আহমেদের ‘চোখ’ গল্পটি ছাপার অক্ষরে পড়ার আগে আমি প্রথম দেখেছিলাম নাট্যরূপে। বহু বছর আগে টেলিভিশনের পর্দায়, সম্ভবত স্কুল জীবনে। কৈশোরে দেখা সেই হাড়হিম করা কিছু দৃশ্য ও সংলাপ এখনও মনে গেঁথে আছে। সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও অস্তিত্ববাদের জটিল সংমিশ্রণ এই ছোটগল্প।
গল্পের প্রথম বাক্যটিই পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, “আজ বাদ-আছর খেজুর কাঁটা দিয়ে মতি মিয়ার চোখ তুলে ফেলা হবে। চোখ তুলবে নবীনগরের ইদরিস।” এই যে চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতাকে দৈনন্দিন একটি কাজের মতো সহজভাবে ঘোষণা করা, এটাই গল্পের মূল সুর। হুমায়ূন এখানে সচেতনভাবে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। আমরা দেখতে পাই, কীভাবে একটি জনপদ সম্মিলিতভাবে তার মানবিক বোধ বিসর্জন দিয়ে আদিম উৎসবে মেতে ওঠে।
গল্পের প্রধান চরিত্র মতি মিয়া। সে একজন ‘দাগী অপরাধী’ হতে পারে, কিন্তু গল্পের কাঠামোর মধ্যে সে ক্রমশ ট্র্যাজিক হিরোর অবয়ব পায়। এই ট্র্যাজেডি কোনো বীরত্বের নয়, বরং অসহায়ত্বের। মতি মিয়ার হাত-পা বাঁধা, পাঁজরের হাড় ভাঙা, আঙুল থ্যাঁতলানো। এই বর্ণনা আমাদের মনে করুণা জাগানোর কথা ছিল, কিন্তু গল্পের পার্শ্বচরিত্রদের মধ্যে তা কেবল কৌতূহল ও আমোদ জাগায়।
এখানে হুমায়ূন সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ ও ‘শিক্ষিত’ শ্রেণির মুখোশ খুলে দিয়েছেন। যখন নয়াপাড়া হাই স্কুলের হেডমাস্টার বা রিটায়ার্ড স্টেশন মাস্টার মোবারক সাহেব এই বীভৎস দৃশ্য দেখতে আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হন, তখন বোঝা যায় যে শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থান মানুষের ভেতরের পাশবিকতাকে দমন করতে পারেনি। বরং তারা এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা অঙ্গহানিকে বৈধ বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করেছে।
‘চোখ’ গল্পটি আজ আবার পড়তে গিয়ে স্মরণে আসে যুক্তরাষ্ট্রের লেখিকা শার্লি জ্যাকসনের ‘দ্য লটারি’-র কথা। সেই গল্পে একটি জনপদ প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে তাদেরই একজন নিরপরাধ সদস্যকে পাথর ছুড়ে মারার জন্য নির্বাচন করে। সেখানেও নিষ্ঠুরতা আছে, প্রথা বা ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। ‘চোখ’ গল্পে মতি মিয়ার চোখ তুলে ফেলাকে যেভাবে ‘জন্মের মহ (মোহ) অচল’ করার উপায় হিসেবে গ্রামবাসী মেনে নিয়েছে, তা শার্লি জ্যাকসনের সেই আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ নিষ্ঠুরতারই আরেকটি সংস্করণ। জ্যাকসনের গল্পে পাথরের আঘাত আর হুমায়ূনের গল্পে ‘খেজুর কাঁটা’ উভয়ই গোষ্ঠীবদ্ধ বর্বরতা হিসেবে উপস্থিত হয়।
আবার মতির যে নিরাসক্তি বা নির্লিপ্ততা, তা আলবেয়ার কাম্যুর ‘দ্য আউটসাইডার’-এর নায়ক মারসো-র কথা মনে করিয়ে দেয়। মারসো যেমন নিজের মৃত্যুদণ্ডের সামনে দাঁড়িয়েও জগতের অর্থহীনতা নিয়ে ভাবছিল, মতি মিয়াকেও আমরা দেখি তার আসন্ন অন্ধত্বের খবর শুনে বিচলিত না হতে। সে উল্টো তৃষ্ণার্ত হয়ে পানি চায়। তার এই ‘পানি খামু’ বলাটা জীবনের প্রতি আদিম জৈবিক টান, যেখানে মহৎ কোনো আদর্শ নেই, আছে শুধু টিকে থাকার তীব্র আকুতি।
মতি তার পলাতক স্ত্রীর কথা ভাবে, বাজারের নটী মর্জিনার মাঝে নিজের হারিয়ে যাওয়া সঙ্গিনীকে খুঁজে ফেরে। তখন সে আর চোর বা ডাকাত থাকে না, হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ এক মানুষ। এই নিঃসঙ্গতা কাম্যুর দর্শনে ‘অ্যাবসার্ডিটি’র সমার্থক। মতি জানে তার বিচার কোনো আইনি আদালতে হচ্ছে না, বরং হচ্ছে উন্মত্ত জনতার আদালতে, যেখানে যুক্তি অচল।
‘চোখ’ গল্পটিতে ‘আইন’ এবং ‘বিচার’ শব্দ দুটিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হাসান আলী যখন মতিকে ধরে আনার বীরত্বগাথা শোনায়, তখন সেখানে আইনের কোনো স্থান নেই।
মেম্বার সাহেব থানায় গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তা বিচার পাওয়ার জন্য নয়, বরং এই পৈশাচিক কাজটিকে ধামাচাপা দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে।
ফ্রানৎস কাফকার ‘ইন দ্য পেনাল কলোনি’ গল্পের কথা এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কাফকার সেই গল্পে জটিল এক যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধীর শরীরে তার অপরাধের বিবরণ লিখে দিয়ে তাকে হত্যা করা হতো। সেখানেও অপরাধ প্রমাণের চেয়ে দণ্ড বা শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়াটিই প্রধান হয়ে উঠেছিল। হুমায়ূনের গল্পে খেজুর কাঁটা দিয়ে চোখ তুলে ফেলার যে পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা, তা কাফকার সেই টর্চার মেশিনের মতোই ভয়ংকর। কাফকার গল্পের মতো এখানেও জল্লাদ (নবীনগরের ইদরিস) এবং দর্শকদের মধ্যে পেশাদারিত্ব বা উৎসাহ কাজ করে, যা মানুষের নৈতিক পতনকে সূচিত করে।
মতি চরিত্রটিতে দেখা যায়, সে নিজেকে পশুস্তর থেকে উপরে তোলার চেষ্টা করছে। সে হাসে, কারণ সে জানে জন্তু-জানোয়ার হাসতে পারে না। তার এই হাসি হাসান আলীর মতো মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। কারণ অত্যাচারী তখনই তৃপ্ত হয় যখন তার শিকার আর্তনাদ করে বা ভয় পায়। মতির হাসি এখানে যেন নীরব বিদ্রোহ। দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর রাস্কলনিকভ যেমন নিজের অপরাধবোধের যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে মুক্তির পথ খুঁজছিল, মতি মিয়ার মুক্তিদাতার চিত্রকল্পটি অন্যরকম। সে ট্রেনের সেই অজানা মেয়েটির কথা ভাবে, যে তাকে একবার বাঁচিয়েছিল। এই যে শেষ মুহূর্তে এসে কোনো অলৌকিক দয়ার বা গ্রেস-এর প্রত্যাশা করা, এটিই মতির মানবিক সত্তার শেষ অবলম্বন।
মতি বিশ্বাস করতে চায় যে জগতের সব মানুষ নিষ্ঠুর নয়। এই যে চূড়ান্ত অন্ধকারের মুখে দাঁড়িয়ে আলোর স্বপ্ন দেখা, এটিই হুমায়ূন আহমেদকে একজন মানবিক সম্ভাবনায় বিশ্বাসী লেখক হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে এই আশাবাদ একই সঙ্গে করুণ। কারণ পাঠক হিসেবে আমরা জানি যে আছর ওয়াক্তের আজান হয়ে গেছে এবং অলৌকিক কেউ মতিকে আর বাঁচাতে আসছে না।
হুমায়ূনের গল্পের ভাষা নির্মেদ ও সংকেতময়। লেখক কোথাও আবেগপ্রবণ হননি। তিনি যখন বর্ণনা করেন যে মতির নাকের কাছে ‘সিকনির মতো রক্ত’ ঝুলে আছে, তখন তিনি সৌন্দর্যতত্ত্বের চেয়ে কুৎসিত বাস্তবতাকে বেশি প্রাধান্য দেন। এই আপাত ‘কুৎসিত’ বর্ণনাগুলোই পাঠকের মনে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। হাসান আলীর মোড়লপনা, হেডমাস্টার সাহেবের সিগারেট খাওয়া আর মতির তৃষ্ণা, সবকিছু মিলে গল্পে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গণপিটুনির একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ান তৈরি করে ‘চোখ’ গল্পটি। সমাজ যখন বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তখন সে নিজেই দানব হয়ে ওঠে, এই ধ্রুব সত্যটিই গল্পকার এখানে তুলে ধরেছেন। ‘চোখ’ যেন কেবল মতি মিয়ার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি সমষ্টিগত অন্ধত্বের গল্প। যারা চোখ তুলছে এবং যারা বসে দেখছে, সবাই মানসিকভাবে অন্ধ। মতি মিয়ার চোখ হয়তো খেজুর কাঁটা দিয়ে উৎপাটিত হবে, কিন্তু তার স্মৃতিতে থাকা সেই মমতাময়ী মেয়েটির ছবি বা তার স্ত্রীর কথা, এগুলো কোনো কাঁটা দিয়ে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি সভ্যতা আসলে খুব পাতলা একটা আস্তরণ; সুযোগ পেলেই তার নিচ থেকে বেরিয়ে আসে রক্তলিপ্সা। হুমায়ূন আহমেদ এখানে দেখিয়েছেন যে, দয়া বা মমতা কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রবৃত্তি নয়, এটি অর্জন করতে হয়। আর যখন কোনো সমাজ এই অর্জন হারিয়ে ফেলে, তখন ‘বাদ-আছর’ কোনো মতির চোখ যাওয়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
‘চোখ’ গল্পটি তাই একটি আয়না, এর সামনে দাঁড়ালে আমরা নিজেদেরই কুৎসিত চেহারাটি দেখতে পাই। মতির শেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষা তাই কেবল তার একার নয়, এটি পুরো মানবজাতির মনুষ্যত্ব ফিরে পাওয়ার করুণ আর্তি হয়ে পাঠকের মনে বাজতে থাকে। v
- বিষয় :
- গল্প