ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

আনন্দ-বেদনার কাব্য

একটি পুনর্পাঠ

একটি পুনর্পাঠ
×

হুমায়ূন আহমেদ [১৩ নভেম্বর ১৯৪৮–১৯ জুলাই ২০১২] প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

হামীম কামরুল হক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

অতি সাধারণ ও তুচ্ছ বিষয় এবং মানুষদের অসাধারণ করে তোলার বিষয়টি হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্পের অন্যতম দিক। আরও অনেক দিক আছে। এখানেও তিনি তাঁর উপন্যাসের মতো করুণ ও হাস্যরসের ধারা বইয়ে দেন। আনেন ভয়, উদ্বেগ ও আতঙ্কের তীব্র অনুভব। পশ্চিমা মতবিচারে হুমায়ূন আহমেদের লেখাকে রিয়ালিজম বা বাস্তববাদের চেয়ে ভাবোচ্ছ্বাসপূর্ণ বা রোমান্টিকই বলবেন কেউ কেউ। প্রাচ্যের ধারায় করুণ, হাস্য, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত ও শান্তরস ছাড়ানো আছে তাঁর নানান লেখায়। মুক্তিযুদ্ধের গল্প-উপন্যাসগুলি ধরলে বীর ও রৌদ্ররসও কম পাওয়া যাবে না। তাঁর লেখার মূল হলো তিনি ড্রামাটিক বা নাটকীয়। এপিক বা মহাকাব্যিক মেজাজ তাঁর ধাতে নেই।– এই বাস্তবতাই হুমায়ূনের তাবৎ লেখারই দৃশ্যকাব্য। কিন্তু ছোটগল্পের এক মাস্টার-লেখক যে তিনি, তাও আমাদের অনেকে স্বীকার করতে চান না। অসাধারণ সব ছোটগল্প ও নিজের একটি স্টাইল রচনাশৈলী তিনি তৈরি করেছেন। কিন্তু এর ভেতরে ব্যতিক্রম আছে। যেখানে তিনি আরেক মেজাজে মূর্তিমান। ‘আনন্দ-বেদনার কাব্য’ ছোটগল্পটি এরই একটি অসামান্য নমুনা। 
‘আনন্দ-বেদনার কাব্য’ গল্পটি শুরু হচ্ছে ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’ নামের একটি বইয়ের প্রচ্ছদের বর্ণনা দিয়ে। বইটি কবিতার। বইয়ের প্রচ্ছদ লেখক তথা কবির কন্যা মোসাম্মৎ নূরুন্নাহান খানম বেনুর করা। কন্যাটি দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় মারা যায়। সে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল। বইটির প্রকাশ সে দেখে যেতে পারেনি। বাবার বইয়ের জন্য তার প্রচ্ছদ করার ভেতরে যে মমত্ব– আর হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে তুলে ধরেছেন সেটি পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। আর মৃত কন্যার প্রতি কবিমনা এক পিতার হৃদয়টাই যে স্বয়ং একটি কবিতা– গল্পটি এই বার্তা দিয়েই যেন শেষ হয়। 
এ গল্পে ঘটনা তেমন কিছুই নেই। প্রচ্ছদের বর্ণনার পর কবি, যার কোনো নাম উল্লেখ করা হয়নি, তার স্বভাবে ও জীবনের দশাদুর্দশার কথা নিরাসক্তভাবে লেখক তুলে ধরতে থাকেন। ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’ মফস্বলের এই কবি যেভাবে প্রকাশ করেছেন এবং প্রকাশ করতে গিয়ে কাদের কতটা সহায়তা ও মুগ্ধতা পেয়েছেন– সেসবের বর্ণনা দিয়েছেন হুমায়ূন। সেইসঙ্গে এই কবির এক ধরনের বাকিতগ্রস্ততার কথাও এসেছে, যেখানে বিয়ের রাতে নবপরিণীতা স্ত্রীকে বসিয়ে রেখে, দুযোর্গপূর্ণ সেই রাত্রিতে তিনি ছয় পৃষ্ঠার একটি কবিতা লিখেছেন, সেটি আবার নিজেই বইটির সেই কবিতার নিচে ফুটনোট আকারে দিয়েছেন। এমন অনেক ফুটনোট আছে, যাতে কবিতা নিয়ে তার পাগলামিটাই ফুটে ওঠে। এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক যে, কবিতা নিয়ে যার এত পাগলামি, বইতে থাকা একটি কবিতাও সত্যিকারের কবিতা হয়ে ওঠেনি।– এটা যে করুণ– সেটি উল্লেখ না করেও হুমায়ূন তাঁর কবি-চরিত্রটি এঁকেছেন। মফস্বলের কবির এই বইটি গল্পের কথকের কাছে ‘হঠাৎ করে অসামান্য হয়ে উঠল’– এর কারণ এই বইটিকে ঘিরে ওই হতদরিদ্র পরিবারের জীবনের আনন্দ ও বেদনার বিষয়গুলি ছবির মতো তার সামনে ভেসে উঠতে থাকে। 
খেয়াল করার ব্যাপার হলো, একটি কবিতার বই ঘিরে গল্পটির শুরু ও শেষ হয়, সেখানে নমুনা হিসেবে কোনো কবিতার পঙ্‌ক্তি দেওয়া হয়নি। বরং বেশ কিছু কবিতার লেখার পেছনের গল্প বা পটভূমির কথা বলা হয়েছে। বইতে মোট ১১৩টি কবিতা আছে– যার একটিরও প্রকৃত অর্থে কোনো কাব্যমান নেই। মহাসাগর নিয়ে তিনটি কবিতা আছে, কিন্তু কবি নিজে কোনো দিন স্বচক্ষে সাগর-মহাসাগর দেখেননি। ইরানের শাহ নিয়েও কবিতা আছে। বলা সেগুলিও যথারীতি নিম্নমানের কবিতা। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে নিজের কন্যার প্রতি যে মমত্ব, মেয়ের করা প্রচ্ছদ দিয়ে কবিতার বইটি প্রকাশ করার সামান্য ঘটনাবলি এবং মেয়ের সম্পর্কে কবি-পিতার আকুল করা ভালোবাসার জন্যই কবিতার বইটিই শুধু নয়, কবি স্বয়ং এ গল্পে অসামান্য হয়ে দেখা দেন। ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’ নামের কবিতার বই ঘিরে জগতের একটি নিভৃত কোণে একজন কবি মানুষ ও তার পরিবারে একদিনের অনন্য আনন্দের ঘটনাতেই এটি একটি স্মরণীয় ছোটগল্প হয়ে ওঠে। 

যেটা শুরুতেই বলেছি, এই গল্পে কোনো ঘটনার ঘনঘটা নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই; সেই অর্থে এটা নিটোল কোনো গল্পও নয়। চকিতে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের প্রায় ঘটনাহীন ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে যেমন মানুষের মনে এক গভীর অব্যাখ্যনীয় টান ও বিচ্ছেদ মহাজাগতিক বেদনাবোধ তৈরি করে– এই গল্পে মৃত কন্যার প্রতি (ব্যর্থ, নগণ্য ও অকিঞ্চিৎকর কবি) পিতার ভালোবাসাটাও তেমন কাব্যিক হয়ে ওঠে। আরও একটি ব্যাপার হলো, এই গল্প সম্পর্কে বলে/লিখে কোনোভাবেই এই গল্পের স্বাদ পাঠকের টকরায় এনে দেওয়া যাবে না, যদি না পাঠক স্বয়ং এই গল্পটি না পড়েন। 
‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’– এ নামটি ভালোমতো খেয়াল করা যেতে পারে। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে, কবিতাহীন পৃথিবী এক রিক্ত বা শূন্য পৃথিবী নয় কি? যেখানে মানুষের আকুল আকুতির কোনো মূল্য নেই। জিনিসটি বাজারে বিকোয় কিনা– সে হিসেবেই মূল্যায়িত হয়। মফস্বলীয় ‘কবি’, তার ওপরে বাতিকগ্রস্ত; এবং আমরা এমন অনেক কবির কবিতার বই মফস্বল থেকে প্রকাশিত হতে দেখতে পাই, যেখানে ওই কবির বইতে ওই এলাকার কোনো মানী-গুণী ব্যক্তির মুগ্ধতার কথা থাকে।– এসবই অদ্ভুত হীনম্মন্যতাকেই দেখিয়ে দেয়। সেই মানী-গুণী ব্যক্তির মুগ্ধতার ভেতরেও একটা গ্রাম্য ব্যাপার দেখা যায়। জীবনযাপনে নাজুক দশায় থাকা কবির এই কবিতা লেখাকে প্রায় ‘গরিবের ঘোড়ারোগে’র কাছাকাছিও বলেও মনে হয়।– কিন্তু না, হুমায়ূন এই গল্পের মাধ্যমে মফস্বলের তেমন সমস্ত কবির প্রতি গভীর মায়া জাগিয়ে তোলেন। এই যে মায়াময় একটা জগৎ একটি গল্পের মধ্য দিয়ে তৈরি তিনি করতে পারলেন– এটাই তাঁর কৃতিত্ব।
জগতের সব গল্প লেখক একই ধরনের গল্প লেখেন না। পাঠকেরও ভেদ আছে পড়ার বেলায়। সবাই সব লেখকের পাঠক নন। তবু আমরা বিশ্বমান বা স্থানীয় মান তৈরি করি; ক্যাননিক সাহিত্য বা যেগুলি সর্বজনীন, চিরায়ত সেগুলিকেই কেবল মান্যতা দিই। কিন্তু বাস্তবতা হলো এরই আড়ালে দেশে দেশে তো বটেই, একেকটি দেশের প্রান্তিক এলাকায় যেসব লেখক-কবি সত্তার মানুষ আছেন, যাদের কোনো শৈল্পিক দক্ষতা নেই, যারা ‘সাহিত্য’ নামের বিষয়টি কীভাবে সম্পন্ন হয় জানেনই না, তাতে তাদের অতি সামান্য সৃষ্টি মিথ্যা বা অমূলক হয়ে যায় না। তাদের সেই সামান্য নগণ্য কবিতা বা গল্পের বই বা উপন্যাসকে ঘিরে তাদের পরিবারে বন্ধু মহলে যেটুকু আনন্দের সঞ্চার ঘটে, তা যত সামান্য ও সাময়িকই হোক না কেন, তাও কম মূল্যবান নয়। বরং এও বলা যায়, এই যে সামান্য প্রয়াসগুলি জগতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অখ্যাত অনামা লেখকদের হাতে তৈরি হয়, তারা আছেন বলেই মহৎ বৃহতের দেখা– যে মেলে তাই নয়, সেই অনামা অখ্যাত লেখকদেরও আলাদা মহত্ত্ব আছে। ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’র কবিকে ঘিরে, যার নাম এ গল্পে দেওয়া হয়নি; হুমায়ূন ইচ্ছা করেই দেননি, কারণ অনামা অখ্যাত কবির মহত্ত্ব পিতৃহৃদয়ের বড়ত্ব নাম দেওয়া না-দেওয়া ছোট হয়ে যায় না।
হুমায়ূন আহমেদের এই গল্পটি তাঁর ‘গল্পসমগ্রে’ বা ‘শ্রেষ্ঠগল্পে’ থাকার পরই হয়তো একটু আড়ালেই পড়ে গেছে। আর যারা ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থের নামগল্প হিসেবে এটি পড়েছিলেন, তাদেরও স্মরণে নাও থাকতে পারে। বইটি প্রকাশ করেছিল স্টুডেন্ট ওয়েজ। এতে ৯টি গল্প ছিল। গল্পগুলি হলো: ‘আনন্দ-বেদনার কাব্য’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘উনিশ শ একাত্তর’, ‘জলছবি’, ‘খেলা’, ‘শিকার’, ‘পাখির পালক’, ‘অসুখ’ এবং ‘কবি’। লক্ষণীয় এর ভেতরে ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘১৯৭১’ এবং ‘কবি’ নামে হুমায়ূন উপন্যাসও লিখেছিলেন। ‘এইসব দিনরাত্রি’ টিভি নাটক হিসেবেও হুমায়ূনের তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তার প্রথম ধাপটিই দেখিয়ে দিয়েছিল। সেই হিসেবে ‘আনন্দ-বেদনার কাব্য’ বইটি তাঁর একটি বিশেষ সময়ের স্মারকই বলা যায়, বলা যায় তাঁর জলোচ্ছ্বাসের মতো বিপুল জনপ্রিয়তার সূতিকাগার। অথচ সেই সূতিকাগারের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ‘আনন্দ-বেদনার কাব্যে’র কথা হয়তো আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। 

আরও পড়ুন

×