ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

রাজবাড়ীতে যৌন সহিংসতা বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন নাগরিকেরা

রাজবাড়ীতে যৌন সহিংসতা বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন নাগরিকেরা
×

রাজবাড়ী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

যৌন নিপীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে রাজবাড়ীতে। গত দেড় মাসে জেলার বিভিন্ন থানায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় ১১টি মামলা হয়েছে। যদিও প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা অনেক বেশি। অধিকাংশ ঘটনার ভুক্তভোগী পরিবার সামাজিক লোকলজ্জা বা প্রভাবশালী মহলের ভয়ে থানা পর্যন্ত যেতে চান না। স্থানীয় নারীনেত্রীরা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিনে ছাড়া পাওয়া ও হুমকিধমকি এবং মাদকাসক্তির কারণে এমন ঘটনা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা এ ধরনের অপরাধ কমাতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। 
রাজবাড়ী জেলায় পাঁচটি থানা থাকলেও গত ১ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত তিনটি থানায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি করে মামলা হয়েছে রাজবাড়ী সদর ও পাংশা থানায়। গোয়ালন্দ ঘাট থানায় হয়েছে অপর মামলাটি। কালুখালী ও বালিয়াকান্দি থানায় এই সময়ের এমন কোনো মামলা হয়নি। 

১১টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের পাঁচজনের বয়স ৬ থেকে ৮ বছর। এ ছাড়া দুজন কিশোরী, একজন মাদ্রাসাছাত্রী, একজন প্রতিবন্ধী তরুণী ও দুজন গৃহবধূ আছেন। এর মধ্যে একটি ঘটনা দলবদ্ধ ধর্ষণের। ১১টি ঘটনায় ইতোমধ্যে পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। তাদের 
মধ্যে বখাটে কিশোর-তরুণ যেমন আছে, তেমনি আছেন মসজিদের ইমাম, ঝালমুড়ি বিক্রেতা, বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিও। যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে বেশি শিশুরাই।
রাজবাড়ী সদর থানায় শিশু ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের একটি মামলার সূত্রে কথা হয় ভুক্তভোগীর বাবার সঙ্গে। তিনি গত বুধবার সমকালকে বলেন, ঘটনার পর থেকে তাঁর মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তাঁকে স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। সামাজিকভাবেও নানা কটুকথা শুনতে হচ্ছে। যদিও পুলিশ ঘটনার পরপরই আন্তরিক ব্যবহার করেছে, আসামিকেও গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তির যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়। 

মামলাটির তদন্ত করছেন রাজবাড়ী সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ঘটনার পর রাজবাড়ী আদালতে ২২ ধারায় শিশুটির জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হয়েছে। সেই প্রতিবেদন পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তিনি চূড়ান্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) জমা দেবেন। 
থানায় যে কয়টি মামলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে দেড় মাসে এমন ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গেছে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গ্রাম বা শহর, পাড়া বা মহল্লায় এমন ঘটনা ঘটেই চলছে। তবে ভুক্তভোগীর পরিবার সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে থানা পর্যন্ত যেতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী লোকজন নিপীড়কের পক্ষে সালিশের কথা বলে সময় নষ্ট করেন। এমনকি হুমকি-ধমকিও দেন। কিছু ঘটনায় সালিশ বসিয়ে নামমাত্র বিচার করে এসব অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া হয়। যে কারণে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাজবাড়ী জেলা শাখার আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক শায়লা তাবাসসুম নেওয়াজ জেলায় শিশু ধর্ষণ, বলাৎকারের ঘটনা বেড়ে যাওয়াকে মহামারি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগজনক। শিশু ধর্ষণের নানাবিধ সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, পরিবেশগত কারণ রয়েছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলেছে। এই সময়ে মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা তৈরি হয়েছে। পারিবারিক শিক্ষা মানুষের নৈতিকতা গঠনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পারিবারিক শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকাসক্তি এবং ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়ায় এসব অপরাধ বাড়ছে। 

তিনি মনে করেন, এসবের পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, জামিনে ধর্ষকের মুক্তিও ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া মাদকাসক্তিও একটা বড় কারণ। দীর্ঘদিন মাদকাসক্ত থাকলে মানুষে রুচি বিকৃত হয়ে যায়। 
শায়লা তাবাসসুম বলেন, ‘পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে মেয়েদের মানুষ না ভেবে শুধু শরীর এবং ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখাটা আমাদের সমাজের এক শ্রেণির মানুষের সংস্কৃতি হয়ে গেছে। সেই বিকৃতি থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে সে জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া খুবই প্রয়োজন।’
এসব বিষয়ে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল হক বলেন, এমন যেসব ঘটনা পুলিশের কাছে এসেছে, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। এসব বিষয়ে তারা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছেন। এসব ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।
মো. শামসুল হকের ভাষ্য, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বিট অফিসারদের মাধ্যমে পুলিশ সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটলেও সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা চেপে যান। তারা যদি পুলিশকে জানান, তাহলে পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এমন অপরাধপ্রবণতা বাড়ার জন্য সামাজিক মাধ্যমও অনেকাংশে দায়ী বলেও মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন

×