মাধবী বা আটপৌরে এক নদী
চিত্রকর্ম, নাজিব তারেক
শাহ নিসতার জাহান
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ | ২০:৩৫
বালুকাবেলা থেকে নদীর জল নেমে গেছে অনেক দূর। তপ্ত হয়ে উঠা সেই বালু। বেলা বেড়ে যাবার অপরাধের শাস্তি। শিরোধার্য মেনে চুপচাপ। নিষ্পাপ ফটিক জল কিছুই করতে পারে না। তবু মেয়েটি বসে থাকে। এক্ষুনি সে আসবে নিশ্চিত। কখনো ভুল করে না। মাধবীর মন, শুধুই উচাটন। কতো যে কথা হয়। কতো যে কথা থেকে যায়! এজীবন পূর্ণ হতো যদি পাওয়া যেত তাকে। দিনের সারাটি সময়। কিংবা সারাজীবন। চাঁদের আলোরা যেমন ভালোবাসার চুম্বনে ব্যস্ত রাখে নদী। তার উদাসী মন, এই নদীর জল। বালুকাবেলাকে তুচ্ছ করে। ভয় ডরহীন, অনন্ত জীবন। আজ রোদেরা নেমেছে মেঘ শুন্য করে। স্বর্গে তাদের হয়নি জায়গা কোন। রাগিয়ে দিয়েছে নদীর জলকেও তাই। ছোট হয়ে যাওয়া অভিশপ্ত নদী। মিলিয়ে যেতে পারে যে কোন সময়। আহা, মাধবী! কঙ্কণে তোমার আগুন লেগেছে। সেই আগুনে জ্বলে যাবে নদী। ভস্ম হবে সব। নদীর জলে ঝিকিমিকি তাই। চকমকির মতো। অথচ মৎস্য শিশুরা মেতেছে নিদারুণ তামাশায়। সেই তামাশায় ঘোলা হয় নদীর গভীরের জল। ছেলেটি আসবে কি নদীর নিক্কন নিয়ে! উপমিতে ভরে দেবে মন। মাধবী তাই অপেক্ষায় থাকে। মুল্যহীন এ জীবন। তাকে ছাড়া। চকিতে সে আসে, তাড়াহুড়ো খুব। বলে, জানতাম তুমি আছ। একটু ঝামেলায় গিয়েছিলাম পড়ে। দেরি হল তাই।
এসব খুবই পুরনো কথা।
তবু কিছু একটা বলা। আমার পেটে খুব ছুতো জমা নেই।
পারোও বটে।
তোমার আশীর্বাদে।
শুনেছ তো সব।
না শোনার কিছু নেই। শুধু ধর্মের বাঁধা আছে। আর কিছু নেই।
ধর্ম ত্যাগ করেছি আমি। আমার ধর্ম তুমি।
তুমিও যেমন আমার।
কিছুই কি করতে পারি না আমরা?
কেন নয়?
মেয়েটি মাথা রাখে ছেলেটির কাঁধে। প্রশান্তির আশ্রয়।
একটি পাহাড় জেগেছিল যে, ক্ষনিক আগে। উবে গেলো সে। পরস্পরের স্পর্শে। এমন নির্ভয় সময় ভালো লাগে তো সবার। পরামর্শ করে ফেলে, কেমন করে ফাঁকি দিতে হবে। না হলে, অন্যের ঘরে চলে যেতে হবে মেয়েটিকে। তার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ঢের। ছেলে কিংবা মেয়েটির। সংকল্প দুজনের। পালাতেই হবে। দেবীদের অলক্ষ্যে। সূর্য ডোবার আগে।
খ।
ঘোর লাগা সেই এক সন্ধ্যা। শালিক আর চড়ুইরা শোরগোল তোলে। সংসারের খুঁটিনাটি নিয়ে। মুখে মুখে তর্ক খুব। ওপাশে ঝিম মেরে বসে থাকে এক নিঃসঙ্গ কাক। পাখিদের সাংসারিক ঝামেলা তাকে বিচলিত করে না। মেয়েটি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। সূর্য ডোবার মুখে। ইমন রঙা আকাশ তখন। মন তার বুঝে নিয়েছে নদী। চকমকি নেই তাতে আর। কিন্তু সতত সজাগ স্বর্গের দেবতাদের কোলাহলে। দেবীদের ভারি ফুর্তি আজ। অথচ সময়টি দারুন। জানতো কিন্তু সে, পছন্দ তোমার। সেই রঙ আর সময়। তার মুখে মিথ্যে প্রলোভনে, তোমার কপালের লাল টিপ উপমান অলংকার। ডুবতে থাকা সূর্যের মতো সেই টিপ। মনে অন্য কথা। শুধু নদী বুঝেছিল সব। আর কাশবন। সে রঙ তাই ভাগাভাগি করে নিবির আলিঙ্গনে। শান্ত নদীর জলে। আকাশ, জল আর ইমন রঙা মেঘ। কী বিস্ময়! কিছু পরেই সূর্য হবে পূর্ণতায় বিলীন। তবু কিছু লাল থেকে যায় অপূর্ব নীলিমায়। তবুও কিছু রইলো পড়ে। স্নিগ্ধ নদীর জলে। অথচ এই জলে, অন্য সময় হলে, থৈ থৈ করে সাগরের নীল। মৎস্য-কন্যারা নয়নে মাখে। কিছু সৌরভ মাখা সুর রয়ে যায় জলের কলতানে। সেই জলে সৌরভ থাকে নিশ্চিত। তারই সৌরভে মৎস্য-শিশুরা জেগে থাকে সারা রাত। আহা, মাধবী! রাত্তিরে ফুটবে যেসব ফুল, নতজানু থাকে অথচ। ফুল ফোটানোর পাপবোধে। নয়নে তাদের সাগরের নীল। তোমার নয়ন দেখে। সাড়া বেলা সেই সুর দেখেছে তারা তোমার নয়নে।
এ ভাবনায় অভিশপ্ত হয় নদীর জলেরা। সেই জলে তাই কান্নার শব্দ জাগে। এই সাধারণ আটপৌরে নদী চোখের জলে ভাসে। মৎস্য-শিশুরা সেই কান্নারই জলে ভাসে। ঘুমুতে পারে না তারা। নিদ্রাহীন সময়, চিরায়ত জলের ক্রন্ধনে। সারা রাত তারা জেগেছিল, তোমায় সঙ্গ দিতে। তোমার সঙ্গ পেতে। বুঝেছিল খুব তোমার মন অপলক অলকারা। গাছেরাও ভুলে যায় পারস্পারিক কথোপকথন। নিরবতার গভীর আলিঙ্গনে। তখন, দু'একটি তারা, জেগেছিল যারা, অপলক তাকিয়ে থাকে। সেই মায়াবী সন্ধ্যা রাতে।
মাধবী, তখন দাঁড়িয়েছিলো স্বপ্নের ঘোরে। স্বপ্নের স্বর্ণালোকে। তার আসার বেশ আগে। শেষমেশ সব ছেড়ে, শুধু একবার, কেবলই এক পলক দেখার অপেক্ষা। তার চোখে তোমাকে দেখার আশা। খুব বিশ্বাস করেছিলে যাকে। একবার অন্তত দেখা। আর সামান্য কিছু কথা। বোঝেনি সে। আসেনি তাই। অবিশ্বাসে আত্ম-বিশ্বাসী এক রাখাল। দংশনের নীল দাগে। তোমার সামনে দাঁড়াবার ভয়ে? নাকি পালিয়ে যাবার আপ্রাণ প্রয়োজনে? জানেনি কেউ। শুধু সে ছাড়া। কিন্তু বুঝেছিল শান্ত নদীর জল। আর মৎস্য-শিশুরা। তারাই তোমায় বেসেছিলো ভাল। দিয়েছিল ঠাই। যেমন তুমিও তাদের। অন্তত জেলেদের জালে বাধা না পড়ার আগে। জেলেরা বুঝেছিল, তুমি মৎস্য-কন্যা কোন। ভাগ্য তাদের ফিরবে নিশ্চিত এবার! পরে বুঝেছিল, না, ওসব কিছু নয়। সাক্ষাত দেবী তুমি। না হলে, জলের কোলাহলে মৎস্য-শিশুদের সাথে কেমনে বন্ধুত্ব হয়! এ দেবী দেখা দেয় যদি, রাখবে মনে, সেবছর ভরে যাবে মাঠ। নদীর জল বইবে নিরবধি। জলে আর জালে একাকার হয় নদী। শেষ রাতের জোছনারা তাই ভিড় করে জলে। দেবীর গায়ে লুটিয়ে পরে অজানা ক্রন্ধনে। জেলেরা তাই জল ফেলে চোখের, দেবী দরশনে। জল-পোকারা থমকে দাঁড়ায় জাল, জেলে আর জলের কোলাহলে। শুধু মৎস্য-শিশুরা দুঃখ করেছিল নিদারুন অভিমানে। তোমাকে আর কিছুক্ষণ কাছে পায়নি বলে। কতো যে কথা বাকি রইলো তাদের! জাননি তো তুমি। সাড়া রাত তারা জমিয়েছিল গল্প অনেক। তোমাকে শোনাবে বলে। শোনোনি তো তুমি। আহা, মাধবী!
