নজরুলের ‘শেষ সওগাত’
কাজী নজরুল ইসলাম [২৪ মে ১৮৯৯–২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬–১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ] : প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
খালেদ হোসাইন
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৬ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৫ | ০৭:২৮
আমরা বসবাস করছি অস্থির, অসহিষ্ণু, অব্যবস্থিত ও অসহায় সমাজ ও সময়ে। দেহে ও মনে দগদগে ঘা নিয়ে আমরা তবু স্বপ্ন দেখি সুন্দর সোনালি এক আগামীর। সময় ও মনের এই স্বভাব সদ্যোজাত নয়। মনে হয় সময়ের স্বভাবই এই। নইলে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে চারপাশের অনাচার-অবিবেচনা ও রূঢ়তার বিরুদ্ধে এত লড়াই করতে হতো না, নামতে হতো না শল্যবিদের ভূমিকায়ও। ইব্রাহিম খাঁর এক চিঠির জবাবে তিনি লিখেছিলেন, “স্নেহের হাত বুলিয়ে এ পচা সমাজের কিছু ভালো করা যাবে না। যদি সে রকম ‘সাইকিক কিওর’-এর শক্তি কারোর থাকে তিনি হাত বুলিয়ে দেখতে পারেন। ফোড়া যখন পেকে পচে ওঠে, তখন রোগী সবচেয়ে ভয় করে অস্ত্র-চিকিৎসককে। হাতুড়ে ডাক্তার হয়তো তখনও আশ্বাস দিতে পারে যে, সে হাত বুলিয়েই ঐ গলিত ঘা সারিয়ে দেবে এবং তা রোগীরও খুশি হয়ে ওঠারই কথা। কিন্তু বেচারা ‘অবিশ্বাসী’ অস্ত্র-চিকিৎসক তা বিশ্বাস করে না। সে বের করে তার ধারালো ছুরি, চালায় সে ঘায়ে অস্ত্র, রোগী চেঁচায়, হাত-পা ছোড়ে, গালি দেয়। সার্জন তার কর্তব্য করে যায়।” যে কোনো কবিই অনাদি ও অনন্ত সময়প্রবাহের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসরে জীবনযাপন করেন। তিনি জন্মান কোনো সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডে এবং সাধারণত সেই পরিপার্শ্বেই তাঁর বিকাশ বাস্তবায়িত হয়। সেই সময়, ভূবাস্তবতা এবং কিছু জন্মগত বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলে তাঁর চেতনালোক। সুতরাং বলা চলে যে কোনো কবির সৃষ্টিসম্ভারই প্রকারান্তরে যুগভাষ্য। কিন্তু ব্যক্তিভেদে মেধার তারতম্য থাকে বলে কারও কারও যুগভাষ্য শিল্পিত সুষমা অর্জন করে এবং কালোত্তীর্ণ, সার্বভৌম ও সর্বজনীন হয়ে পড়ে। কারণ, সমকালের সামূহিক বৈশিষ্ট্যকে বিসর্জন দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় না। যে কবি-প্রতিভা ঐতিহ্যকে আত্তীকৃত করে সমকালের মর্মার্থকে যথার্থভাবে চিত্তে ধারণ করতে পারে, তাঁর সৃষ্টিসম্ভার নিঃসন্দেহে ভবিষ্যাভিসারী। কিন্তু সকলের পক্ষে সমকালের মর্মার্থকে যথার্থভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, এর জন্য সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার সঙ্গে প্রয়োজন প্রতিভার। প্রত্যাশিত সেই সুবেদী চিত্ত ও প্রতিভার সাক্ষাৎ আমরা পাই কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে। স্বাতন্ত্র্য অর্জনের জন্য তাঁকে আয়াসসাধ্য ছক-কাঁটা সাধনা করতে হয়নি। নজরুল ইসলামের পারিবারিক ঐতিহ্য, তা যত অনুল্লেখনীয় হোক না কেন, তাঁর জীবনাচার, তাঁর দারিদ্র্য, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর পঠন-পাঠন, জীবনাভিজ্ঞতা ও জীবনজিজ্ঞাসা তাঁকে অনন্যসাধারণ করে তুলেছে। তাই ‘বর্তমানের কবি আমি ভাই ভবিষ্যতের নই নবী’ বলে তিনি যত নির্বেদ বা বিনয় প্রকাশ করে থাকুন না কেন, তাঁর সৃষ্টিসম্ভার অপ্রতিরোধ্যভাবে ভবিষ্যৎ-ধাবী। বিপরীত যুক্তির আশ্রয় নিয়ে বলা যায় তিনি চির-বর্তমানতার কবি। দেশ-কাল মনুষ্যত্বের এ পরিসরে কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, প্রাসঙ্গিকতা অনিঃশেষ।
পল্টন-প্রত্যাগত ‘হাবিলদার কবি কাজী নজরুল ইসলাম’ সমাদৃত ছিলেন মূলত বন্ধুমহলে এবং মুসলমান সম্পাদকদের সাহিত্যিক আড্ডায়। ‘বিদ্রোহী’ তাঁকে ব্যাপকভাবে কলকাতার বুধমণ্ডলীতে এবং বঙ্গদেশে পরিচিতি দান করে।
লড়াইটা নজরুলের ছোট ছিল না। তাঁকে শুধু সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করতে হয়নি, লড়াই করতে হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধেও। এর জন্য কেবল কবিতা লিখেই সকল সামাজিক দায় শেষ করা সম্ভব হয়নি, আরও কর্মের সঙ্গে জড়িত করেছেন নিজেকে। সম্পাদনা করেছেন নানা পত্রিকা। তাতে গণমানুষের অন্তর্গত চাহিদার কথা স্পষ্ট ও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
আমরা জানি, নজরুল সচেতন ছিলেন বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে এবং তা বিশ্ব-রাজনীতি নজরুল-মানস-গঠনে গভীর ভূমিকা রেখেছে। রুশ বিপ্লব ও তার পরের কামাল আতাতুর্কের আবির্ভাব ও কর্মপ্রক্রিয়া তাঁকে যথেষ্টই আলোড়িত করেছিল। সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’, অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ আর সাপ্তাহিক ‘লাঙল’ পত্রিকায় তার অজস্র চিহ্ন ছড়িয়ে আছে।
‘লাঙল’ পত্রিকায় ভূমিতে প্রজার স্বত্ব এবং সর্বহারা শ্রেণির অর্থনৈতিক মুক্তির আকুতি তিনি বারংবার তুলে ধরেছেন। এখানে তিনি নারী ও পুরুষের, ধনী ও দরিদ্রের, শক্তিমান ও শক্তিহীনের মধ্যে অর্থনৈতিক সাম্য, ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। এমন গভীরভাবে রাজনীতি-সচেতনতা প্রকাশ করতে আর কোনো সাহিত্যশিল্পীকে দেখা যায়নি।
নজরুলের অগ্রন্থিত কবিতাসমূহে তাঁর চেতনালোকের পরিচয়টা কেমন? নজরুলের পরিস্রুত চেতনাজাত ভাবনাবিশ্ব সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকমাত্রই অবহিত। তাঁর শব্দ, ছন্দ, অলংকার– বিচিত্র পুরাণের বহুমাত্রিক ব্যবহার, কিংবদন্তি-কেন্দ্রিকতা প্রায় সর্বজনবিদিত। ‘শেষ সওগাত’ নজরুল ইসলামের অগ্রন্থিত কবিতার সংকলনের গ্রন্ধবদ্ধ রূপ। স্বীকার করা ভালো, এর মধ্যে বিষয়-সংহতি তেমন সহজলভ্য নয়– কিন্তু বৈচিত্র্য এবং নতুন চিন্তার চিহ্ন ব্যাপক। নিরীক্ষা-প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। আর তা কেবল মনোযোগ আকর্ষণ করে না, অনুভূতিকে দুর্দান্তভাবে আলোড়িতও করে। সংকলিত কবিতাগুলোর শিরোনামে এর এই বিচিত্রগামিতার পরিচয় স্পষ্ট। যেমন, ‘জাগো সৈনিক-আত্মা’, ‘কেন আপনারে হানি’ হেলা’, ‘নবাগত উৎপাত’, ‘বন্ধুরা এসো ফিরে’, ‘নারী’, ‘নিত্য প্রবল হও’, ‘আগ্নেয়গিরি বাঙ্লার যৌবন’, ‘তুমি কি গিয়াছ ভুলে?’, ‘চির-বিদ্রোহী’, ‘ভয় করিয়ো না, হে মানবাত্মা’, ‘সুখবিলাসিনী পারাবত তুমি’, ‘হুল ও ফুল’, ‘কোথা সে পূর্ণযোগী’, ‘রবির জন্মতিথি’, ‘বড়দিন’, ‘নবযুগ’, ‘শোধ কর ঋণ’, ‘মোহর্রম’, ‘আর কত দিন?’, ‘বিশ্বাস ও আশা’, ‘ডুবিবে না আশা-তরী’, ‘সকল পথের বন্ধু’, ‘তোমারে ভিক্ষা দাও’, ‘বকরীদ’, ‘আল্লার রাহে ভিক্ষা দাও’, ‘এ কি আল্লার কৃপা নয়’, ‘মোহ্সিন স্মরণে [গান]’, ‘এক আল্লাহ জিন্দাবাদ’, ‘গোঁড়ামি ধর্ম নয়’, ‘জোর জমিয়াছে খেলা’, ‘বোমার ভয়’, ‘কচুরীপানা [গান]’, ‘টাকাওয়ালা’, ‘কবির মুক্তি’, ‘ছন্দিতা’, ‘পূরববঙ্গ’, আরতি’, ‘পার্থ-সারথি’, ‘আত্মগত’, ‘কাবেরী-তীরে’, ‘অমৃতের সন্তান’। গ্রন্থগত বিবেচনায় উদ্ধৃত সৃষ্টিসম্ভারে গানের বিশেষ বাণীও স্থান পেয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় এসবের মধ্যে নানারকম নিরীক্ষা প্রত্যয় এবং প্রমাণও আছে। ‘শেষ সওগাত’ পাঠ করতে করতে চিন্তার ও চিত্তের যে বৈচিত্র্যময় চিত্র আস্বাদন করার সুযোগ মেলে তা কৌতূহলোদ্দীপক ও কৌতুকপ্রদ ও আনন্দদায়ক। সময় পেরিয়েছে, মানব-পরিস্থিতির তেমন প্রত্যাশিত পরিবর্তন বা রূপান্তর লক্ষ করা যায় না। কবিতাগুলো পড়তে পড়তে একটি কবিতায় আমি বারবার ফিরে এলাম। ছন্দগত একটি বিবেচনা ও উপস্থাপন আমাকে আগ্রহী করে তোলে। কবিতার নাম ‘নবাগত উৎপাত’। এ উৎপাত রাজনৈতিক, এর প্রসঙ্গ পলাশীর প্রান্তরে সেই মর্মান্তিক অবিস্মরণীয় যুদ্ধ। সমকালীন পরাস্ত বাস্তবতা সাপেক্ষেই এ প্রসঙ্গের আবির্ভাব। ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের সময়গত সীমাসরহদ্দ এবং পরম পরাক্রমে এ দেশের তরুণদের প্রতি আশাবাদ ও খেদ মুদ্রিত হয়ে আছে এই কবিতায়। তারুণ্য যখন হতবুদ্ধি ও হৃতশক্তি তখন তিনি প্রশ্ন করেন স্বয়ং ঈশ্বরকেই : হে পরম পুরুষোত্তম! বলো, বলো, আর কতদিন
উদাসীন হয়ে রহিবে?– তোমার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির নর নিদারুণ যাতনায় নিশিদিন করিছে আর্তনাদ।
আমার বিশ্বাস পাঠক এই কাব্যাংশের মধ্যে একটি নতুন আমেজ আবিষ্কার করে ফেলেছেন। অসাধারণ শব্দ-ব্যবহার ও অচিন্ত্যপূর্ব অন্ত্যমিলের সম্রাট কবি নজরুল এ কবিতাটি লিখেছেন অমিত্রাক্ষর ছন্দে। বাংলা কবিতার প্রধান তিনটি বাঁকের প্রথমটি সৃষ্টি করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অমিত্রাক্ষর ছন্দকে অসমপার্বিক কায়া-কাঠামোতে। রবীন্দ্রনাথের সেই প্রয়াস অক্ষরবৃত্তছন্দ-কেন্দ্রিক। নজরুল মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অসমপার্বিকতা সৃষ্টি করলেন তিনি তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা কাব্যকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ঔপনিবেশিক-অপশক্তি ও সমাজ-সংস্কার তথা যাবতীয় নঞর্থকতার বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহ বাংলা সাহিত্য এর আগে প্রত্যক্ষ করেনি। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের এমন ত্বরিত-গতি সচ্ছল চলিষ্ণুতার অভিজ্ঞতা এর আগে অর্জন করেনি বাংলা সাহিত্য। অন্তরের তীব্র ক্ষোভোত্থিত আর্তনাদ ও আনন্দের অভ্রভেদী উল্লাসকে এমন তারস্বরে পরিবেশন করেননি কোনো কবি, যার মধ্যে অভিব্যঞ্জিত হয়েছে অপার ও অনিন্দ্য শিল্পিত সুষমা। কিন্তু এর বাইরেও এই কবিতার কিছু ভূমিকা আছে। এ কবিতায় আমরা পাই নজরুল-মানসের কিছু উল্লেখযোগ্য নির্ণায়ক, যার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে তাঁর পৌরষ। এই পৌরষ নিয়েই তিনি লড়াই করে গেছেন। এবং বর্ণিত ‘নবাগত উৎপাত’ কবিতায়ও সেই চিহ্ন লিপ্ত হয়ে আছে। আর এ কবিতায় তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রয়োগ করলেন ছয়মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ব্যবহার করে। কবিতাটিতে ছন্দের-পর্ব-বিভাজনে মধ্য-খণ্ডনের এমন-সব চমৎকার, যা চিত্তকে অভিভূত করে। এর কোনো পূর্বনজির নেই নজরুলের সৃষ্টিসম্ভারে। দূরবর্তী সময়ে সৃষ্ট এ কবিতা আমাদের বসর্বকালীন বাস্তবতায় যথেষ্ট গ্রাহ্য। অর্থাৎ ‘নবাগত উৎপাত’ কাজী নজরুল ইসলামের মৌল চেতনার এক অনুষঙ্গী সৃষ্টি।
- বিষয় :
- কাজী নজরুল ইসলাম
