রণতূর্য হাতে
‘অরুণ প্রাতের তরুণ দল’ ও জুলাই অভ্যুত্থান
কাজী নজরুল ইসলাম [২৪ মে ১৮৯৯–২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬–১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ] : প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
মোহীত উল আলম
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৭ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৫ | ০৭:২৯
১৬ জুলাই ২০২৪। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ বুক পেতে পুলিশের গুলি একের পর এক নিচ্ছেন। আমরা টাইম মেশিন দিয়ে ভ্রমণ করে ঠিক একশ বছরের চেয়ে দু’বছর বেশি কলকাতায় ফিরে গেলাম। একটি ভাড়া বাসার দোতলায় তরতাজা এক যুবক শুধু পেন্সিল দিয়ে একটি কাগজে খসখস করে লিখে যাচ্ছেন: ‘বল বীর/ বল উন্নত মম শির।’ যুবকটি আবু সাঈদের কিছু ছোট হবে হয়তো, সবে তেইশে পা দিয়েছেন, কিন্তু লিখছেন ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি যেন হাজার লক্ষ আবু সাঈদের প্রতিভূ।
কবি নজরুল থেকে আবু সাঈদ পর্যন্ত একটি সরলরেখা টানলে সেটি হবে একটি প্রতিবাদী একরৈখিক ঐতিহাসিক বর্ণনা। কবি নজরুল রাজনৈতিক ও কাব্যিক উভয়ার্থে একটি বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ঠিক একশ দুই বছর পরে জুলাই অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নজরুলীয় বিদ্রোহী চেতনার একটা মূর্ত প্রকাশ হয়েছে।
এমনও মনে হাতে পারে যে নজরুল তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে যেন দেখতে পেয়েছিলেন যুবশক্তির উদ্বোধন একদিন না একদিন হবে। যদি জুলাই-আগস্টের দিনগুলো স্মরণ করি, নিচে উদ্ধৃত পঙ্ক্তিগুলোর অসামান্য প্রাসঙ্গিকতা বিস্ময়কর: ‘ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত/ আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,/ আমরা টুটাব তিমির রাত,/ বাধার বিন্ধ্যাচল।’ (‘চল্ চল্ চল্’)
আবু সাঈদের শহীদানের মধ্য দিয়ে ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’ যেমন হার-না-মানা-হারকে মর্যাদা দেয়, তেমনি ‘নব নবীনের গাহিয়া গান/ সজীব করিব মহাশ্মশান,/ আমরা দানিব নতুন প্রাণ/ বাহুতে নবীন বল’ স্মরণ করিয়ে দেয় আবু সাঈদের সহযোদ্ধাদের, যারা অবলীলায় জেনেছে, নজরুলের ভাষায়, যে ‘মৃত্যু-তোরণ দুয়ারে দুয়ারে’ থাকলেও, অবশ্যম্ভাবী আছে ‘জীবনের আহ্বান।’
তরুণ শক্তির প্রতি নজরুলের অবাধ বিশ্বাস বিস্ময়কর: ‘এই যৌবন-জল-তরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ?’ (‘যৌবন-জল-তরঙ্গ’) এইখানে নজরুলের সঙ্গে হয়তো আমাদের বিতর্ক থাকতে পারে। ‘যৌবন-জল-তরঙ্গ’ কি সকল মুশকিল আসান? প্রবীণদের কি কোন ভূমিকা নেই দেশ ও সমাজ গঠনে? নজরুলের বিচ্ছেদকৃত সাংস্কৃতিক ধারণা হলো যুবকেরাই নতুন যুগের ধারক ও বাহক। যদিও ‘যৌবন-জল-তরঙ্গ’ ধারণাটি বয়সের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কিনা সেটি নজরুল স্পষ্ট করেননি, আমরাই ধরে নিচ্ছি যে ‘যৌবন-জল-তরঙ্গ’ শুধু যুবকদের জন্য প্রযোজ্য। তারপরও সাহিত্য থেকে নজরুলের ধারণার বিপরীতে একটি দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা যায়। দৃষ্টান্তটি আসছে শেক্সপিয়ারের রচিত হ্যামলেট নাটক থেকে। শেক্সপিয়ারের যুগে লন্ডন শহরসহ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে মূল বিনোদন ছিল খোলা নাট্যমঞ্চে নাটক প্রদর্শন ও দেখা। আর নাট্য কোম্পানিগুলো ছিল নাট্যকলায় অসম্ভব দক্ষ ও পেশাদার। এক পর্যায়ে উঠতি বয়সের ছেলেরা অভিনয় পেশাকে গ্রহণ করতে থাকে, এবং তারাই বড়দের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। ফলে বড়দের নাট্যদলগুলো ব্যবসা হারাতে থাকলে তখন তারা ক্ষতি পোষাতে লন্ডনের বাইরে গ্রামাঞ্চলে গিয়েও নাট্য প্রদর্শনে ব্যাপৃত থাকে। লন্ডনের বড় নাট্যদলের এই দুর্দশা শেক্সপিয়ার নিয়ে এলেন তাঁর নাটক হ্যামলেট-এ; যেটির প্রেক্ষাপট ইংল্যান্ড নয়, ডেনমার্ক। ডেনমার্কের পার্শ্ববর্তী দেশ নরওয়ের সঙ্গে খলনায়ক রাজা ক্লডিয়াস একটি শান্তিচুক্তি করতে সক্ষম হয়, এবং সেটি উদযাপন করার উপলক্ষে তিনি একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন যেখানে নাট্য প্রদর্শনের জন্য এসে পৌঁছায় একটি ভ্রমণরত নাট্যদল।
হ্যামলেট নিজেই আবার নাট্যকলায় প্রচুর উৎসাহী। খবর নিয়ে জানলেন যে এই নাট্যদলটি অফ সিজনে দূরান্তরে অভিনয় করতে বের হয়েছে। কেননা, চিলড্রেনস থিয়েটার তাদের বাধ্য করেছে ভ্রাম্যমাণ নাট্যদলে পরিণত হতে। হ্যামলেটের কপট বন্ধু রোজেনক্রান্টস বাচ্চা অভিনেতাদের বর্ণনা করছে এভাবে: “স্যার, অ্যান ইয়ারি অব চিলড্রেন, লিটল ইয়াসিস” (২.২.৩৫৫-৩৫৬)। লিটল ইয়াসিস বলতে ঈগলপক্ষীর শাবককে বোঝানো হচ্ছে, যারা বড় ঈগলদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তখন হ্যামলেট বলছেন, এটা করে তো তারা নিজেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ খাচ্ছে। কারণ একদিন তো তারা বড় হবে, তখন তারা কি তাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শিশু অভিনেতাদের থেকে চ্যালেঞ্জ পাবে না?
যে কারণে হ্যামলেটের এই উদ্বেগের সাথে নজরুলের তারুণ্য-উদ্বোধনের সংঘাত সেটি হলো নজরুল তারুণ্যকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে দেখছেন। যেন এর আগের পর্যায় নেই, পরের পর্যায়ও নেই। হ্যামলেটের দৃষ্টিভঙ্গি অপেক্ষাকৃত বাস্তব, কারণ এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পরম্পরায় বিশ্বাসী।
তারপরও নজরুলের তারুণ্য শক্তির উদ্বোধনের পক্ষে আমরা যুক্তি দাঁড় করাব। তার আগে নজরুলের আরেকটি ঘোষণা, যেটি আবু সাঈদের শহীদানের আলোকে আরও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে, সেটির মধ্যে যে রিস্ক ফ্যাক্টর আছে সেটি একটু পরিষ্কার করা দরকার। উক্তিটি পূর্বেও উল্লেখ করেছি: “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।” এখন এই কথাটি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তো নয়ই, এমনকি সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনেও প্রয়োগ করা যাবে না। শুধু কাব্যিক জগতে এই উচ্চারণটির সত্যতা আমরা মেনে নিতে পারি। আধ্যাত্মিক জগতে সৃষ্টিকর্তা মুহুর্মুহু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, “কুলহু আল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস সামাদ, লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ” অর্থাৎ “বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কাউকে জন্ম দেননি।” এই রবের আলোকে নজরুলের বাক্যটি সংশয়শীল। আধুনিক যুগের সমাজতত্ত্ববিদ কার্ল মার্ক্স, মিশেল ফুকো প্রমুখ বারবার সমাজকে ব্যাখ্যা করেছেন ডিপেন্ডেন্সি কালচার বা নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি হিসেবে। যেমন– স্বৈরশাসন একচ্ছত্রভাবে তখনই শাসন করতে পারে, যখন রাষ্ট্রের সকল অঙ্গে একটি নতজানু সংস্কৃতি তৈরি হয়। নিউক্লিয়াস লেভেলে পরিবারে ব্যাপকভাবে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় পিতা কর্তৃক একটি নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। একই কথা বিশ্ববিদ্যালয় ও আমলাতান্ত্রিক জগতের জন্যও প্রযোজ্য। বহিঃরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নির্ভরশীলতা একটি গুরুতর অভিযোজন। যেমন– বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থানের বিপক্ষে পূর্বেকার স্বৈরাচারী শাসনের প্রেক্ষাপট যদি নির্ভরশীলতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয় তা হলে বলতে হবে পূর্বেকার সরকার ছিল ভারতনির্ভর, আর বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর। কিন্তু এই রাজনৈতিক বাস্তব সত্যতা সত্ত্বেও যে কোনো সরকারই নজরুলের উক্তির কাব্যিক সত্যতার ভাষায় ঘোষণা করবে: “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।” অর্থাৎ নজরুলের উক্তির মধ্যে যে কাব্যিক সত্যতা আছে সেটি যখন সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উচ্চারিত হয় তখন খুবই সম্ভাবনা থাকে যে সেটি একটি নিছক মুখোশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই যে সংকট তৈরি হচ্ছে নজরুলকে নিয়ে সেটির সমাধান কী?
“বিদ্রোহী”র কবিকে আমরা জাতীয় কবি করেছি তাঁর বৈপ্লবিক স্পিরিটের জন্য, যে স্পিরিট আমরা ২০২৪-এ এসে যেমন আবু সাঈদের নিহত হবার ঘটনায় প্রতীকীভাবে পেয়েছি, তেমনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পেয়েছিলাম শহীদ রুমীর মধ্যে। রুমী সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন। তখন মা জাহানারা ইমামকে বললেন, তিনি ডিগ্রি করতে যাবেন না, যাবেন মুক্তিযুদ্ধে। বলেছিলেন, দেশ যেখানে যুদ্ধরত সেখানে বিদেশে বসে পড়াশোনা করার কোনো অর্থ নেই। রুমী শহীদ হলেন। আবু সাঈদ বা রুমী বা এ রকম আরও লক্ষ লক্ষ যুবক– তারা নজরুলের হিরোয়িক চরিত্র। কারণ তারা জেনেশুনে শহীদানের পথ বেছে নিয়েছিলেন। কারণ নজরুলের ভাষায়, “আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!/ আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।” (“বিদ্রোহী”)
এই নজরুলকে আমরা জাতীয় জীবনে চর্চা করছি শুধু একটি মুখোশ হিসেবে। অর্থাৎ নজরুলকে আমরা বরাবরই বাঘ হিসেবে দেখাচ্ছি, কথিত করছি, অনুপ্রেরণাদায়ী মহাত্মন হিসেবে দেখছি। আসলে আমাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডে আমরা তাকে পোষ মানানো বিড়াল হিসেবে গণ্য করছি। অর্থাৎ নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা আমাদের কাছে শুধু একটি মুখোশ। তাঁর কোনো আদর্শই আমরা অনুসরণ করছি, না তাঁর হিরোয়িক চেতনা, না তাঁর সাম্যবাদ। আমাদের বিদ্বজ্জনের সংস্কৃতি মোটামুটিভাবে লোভাতুর একটি দুষ্টবীজের সমাজ, সেখানে আমাদের নির্মিত নজরুলের ভাবমূর্তি হচ্ছে ভয়াবহ রকমের একটি কৃত্রিম মুখোশ।
এই তৈরিকৃত মুখোশসংবলিত নজরুলকে এই পোষ-মানানোর কৃষ্টি থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারলেই, আমরা শহীদ রুমী ও শহীদ আবু সাঈদের সত্তার সঙ্গে নজরুলের বীর চেতনার একটি সংশ্লেষ ঘটাতে পারব।
সেটি কীভাবে সম্ভব?
আবু সাঈদ প্রাণ দিয়েছিলেন বৈষম্য হটাতে। রাষ্ট্রের সকল অঙ্গে বৈষম্য ঘোচানোর জন্য আবু সাঈদ যখন শহীদ হলেন, তখন বলা যায় নজরুলকে বিকৃতভাবে মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করার রীতি থেকে বের করে নিয়ে আসার প্রত্যয়ও যেন পাওয়া গেল। এতদিন নজরুল ছিল আমাদের মুখে মুখে, একটি বিবমিষাময় রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে। আবু সাঈদ এবং তাঁর সহযোগীদের আত্মত্যাগের ফলে বাংলাদেশ এসে দাঁড়াল সে জায়গায়, যেখানে মুখোশবিহীন, বৈষম্যবিহীন একটি দেশ পুনর্গঠনের মুখোমুখি আমরা।
এই কথাটা নজরুলকে পুনর্যাচাই করে আমরা চেষ্টা করতে পারি কীভাবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব, যদি আমরা নজরুলের সঙ্গে শহীদ রুমী এবং শহীদ আবু সাঈদদের সংযোগটা শুধু কাব্যিক অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেও চারণ করতে পারি।
- বিষয় :
- কাজী নজরুল ইসলাম
