সৈয়দ শামসুল হক
বাবর ও নূরলদীনের দ্বৈরথ
সৈয়দ শামসুল হক [জন্ম: ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫–মৃত্যু: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬] ছবি :: কালের খেয়া
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৪
সাহিত্যে ইতিহাস থাকে। থাকতেই হবে, না হলে সাহিত্য তো নিছক রূপকথা। না, কথাটা ঠিক হলো না, কারণ রূপকথাও ইতিহাসের বাইরে নয়। সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্মে ইতিহাস অনিবার্যভাবেই উপস্থিত। এই ইতিহাসের এক প্রান্তে বাবর আলী [ খেলারাম খেলে যা] অপর প্রান্তে নূরলদীন [নূরলদীনের সারাজীবন]। পরস্পরের প্রতিপক্ষ। মাঝখানে আছে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর কিশোরী মেয়েটি। মাতবরের মেয়ে, মাতবর নিজে ছিল পাকিস্তানি দখলদার-হানাদারদের সহযোগী। কিন্তু মাতবর তার নিজের মেয়েকে রক্ষা করতে পারেনি। এটাও ইতিহাসেরই অংশ। মাতবর পাকিস্তানপন্থি, শক্ত শাসকের সে প্রকাশ্য ভক্ত, মিলিটারিকে সে উদ্ধারকারী হিসেবে কল্পনা করে। কিন্তু পরাজয় যখন আসন্ন তখন তার বন্ধু পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন মাতবরের মেয়েকে চেয়ে বসে। মাতবরের পক্ষে রাজি না হয়ে উপায় থাকে না। কাকুতিমিনতি করে, শেষে সান্ত্বনা হিসেবে ক্যাপ্টেনকে সম্মত করায় বিয়ের অভিনয় করতে। ক্যাপ্টেন তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে পরের দিন ভোর হওয়ার আগেই সৈন্যসামন্ত নিয়ে পালিয়ে যায়। মেয়েটি প্রকাশ্য জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে তার পিতাকে অভিযুক্ত করে। এবং নিজে বিষপান করে পিতাকে ধিক্কার জানিয়ে চলে যায়। মাতবর নিহত হয় গ্রামবাসীর হাতে। নাটকের সমাপ্তিতে অসংখ্য লাশ দেখা যায়, জানাজার আয়োজন করা হয় তাদের জন্য। বেঁচে থাকাটাই সেখানে শোকের গোজার। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর সমাপ্তিটা কিন্তু ভিন্ন রকমের। নূরলদীন মারা গেছে, কিন্তু তার মৃত্যুর চেয়েও তার বন্ধুদের আশাবাদটা বড়। সমাপ্তিতে বন্ধু আব্বাস হাত তুলে ঘোষণা করে যে, আগামীতে আরও যুদ্ধ হবে, একটি দুটি তিনটি যুদ্ধ, প্রয়োজনে অসংখ্য যুদ্ধ।
মেয়েদের কণ্ঠস্বর কোথায় কতটা শোনা যাচ্ছে তা দিয়েও সামাজিক বাস্তবতার বিষয়ে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ‘খেলারাম খেলে যা’র জগতে মেয়েদের স্বরটা খুবই সামান্য। মেয়েরা সেখানে পিতৃতান্ত্রিকতার দমন ও পীড়নকে নিঃশব্দে মেনে নিয়েছে। মেনে নেওয়ার বাইরে তাদের চাওয়ার কিছু নেই। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’তে কিন্তু ব্যাপার একেবারেই ভিন্ন। সে-নাটকের কেন্দ্রে আছে মাতবর কন্যার দীর্ঘ উক্তি। দু’শ বছর আগের নারী, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর লিসবেথ। সে কিন্তু কোম্পানির কালেক্টরকে পরিষ্কারভাবে ধরিয়ে দেয় যে কোম্পানির কর্মচারীদের স্ত্রী হিসেবে ইন্ডিয়াতে এসে লিসবেথরা সাম্রাজ্যবিস্তারে সহায়ক হয়েছে, দুঃখকষ্ট সহ্য করে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বই পালন করেছে। লিসবেথের বক্তব্য:
আমরা না এলে ইন্ডিয়ায়
ইংরেজ মোগল হতো,
হুঁকো টেনে, পালকি চড়ে, গোধূলি বর্ণের পুত্র জন্ম দিয়ে দিয়ে
ইন্ডিয়ান হতো, [...] ইন্ডিয়ান এম্পায়ার হতো না।
বুঝতে অসুবিধা নেই যে, এই মেয়ের ভেতর ইংল্যান্ডে ঘটে-যাওয়া বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রভাব পড়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর ওই বিপ্লব পেছন থেকে কোম্পানির কর্মচারীদের উপনিবেশ স্থাপনের কাজে উৎসাহ জুগিয়েছে, নইলে তারা এতটা সাহসী হতো না। তাদের সঙ্গে যে মেয়েরা এসেছে তারাও ইতিহাসের ওই অগ্রগতির সুফলভোগী। নূরলদীনের স্ত্রী আম্বিয়া কোম্পানি-শাসিত কৃষক সমাজের মেয়ে, কিন্তু যেহেতু তার স্বামী আছে যুদ্ধের ময়দানে, তাই সে ঘরের বাইরে আসতে পারে, তর্ক করতে পারে আব্বাসের সঙ্গে, আব্বাসকে ধমকে দিতে পারে ফাতরামি না করতে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কাঁদে, আবার গানও গায়। অক্ষরজ্ঞানবিহীন আম্বিয়া যে ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়, দু’শ বছর পরে জন্মগ্রহণকারী বড় লোকের ইংরেজি শিক্ষিত মেয়ে জাহেদা তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারে না।
ইতিহাস বিষয়ে সৈয়দ হকের কবিতায় একটি বক্তব্য স্মরণীয়। সেটি এ রকমের:
ইতিহাস কিছু নয়
যদি না সে অগ্রসর হয়।
তাঁর সাহিত্য ইতিহাসের এই অগ্রগামিতার খবরটা আমাদের জানিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের ইতিহাস তো দেখা যাচ্ছে আটকা পড়ে গেছে ট্র্যাফিক জ্যামে। এর দায়টা পুরোপুরি বাবর আলীদের। ষাটের দশকে তারা বেপরোয়াভাবে কেবল যে গাড়ি চালিয়েছে তা নয়, বিনা শুল্কে গাড়ি আমদানি করে ঢাকা শহরকে সয়লাব করে দেওয়ার কাজটি শুরু করে দিয়েছে। তাদের কারণেই রাজধানী ঢাকা এখন অচল হয়ে গেছে। আটকা-পড়া এই ইতিহাসকে সচল করবে কে? অবশ্যই বাবর আলীরা করবে না, বাবর আলীরা তো গাড়ি ছাড়া চলতেই পারে না, এবং বাবর আলীরা নিজেরাই এখন নিজ নিজ গাড়ির ভেতরে অচল অবস্থায় আটকা পড়ে গেছে। ইতিহাসের উদ্ধারকর্তা হচ্ছে নূরলদীন। ট্র্যাফিক জ্যাম ভাঙতে যদি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বাড়াতে হয়, যদি দরকার পড়ে রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের, পাতালরেল তৈরি করার, নৌপথে যাতায়াত বাড়ানোর, বাবর আলীদের হাঁকিয়ে দেওয়ার, তবে সেসব কাজ তখনই সম্ভব হবে যখন নূরলদীনরা রাষ্ট্রক্ষমতা পাবে, তার আগে নয়। ইতিহাসের পালাবদলে বাধা দেবে অন্য কেউ নয়, বাধা দেবে আমাদের পরিচিত বাবর আলীরাই। দিচ্ছেও।
আমরা যারা নিজেদের আলোকিত ভাবি বাবর আলীদের সঙ্গেই তাদের নিত্য ওঠাবসা, চলাফেরা, আত্মীয়তা এবং ঝগড়া-বিবাদ। ব্যক্তি সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গেও বাবর আলীর ভালো জানাশোনা রয়েছে, নইলে সে তাঁর উপন্যাসে প্রধান চরিত্র হলো কী করে? জানা-শোনার কথাটা তো বাবর আলী নিজেও জানিয়েছে আমাদের। রংপুর-অভিযানের দ্বিতীয় দিনে বাবর আলী গিয়েছিল রংপুর সাহিত্য পরিষদের এক বৈঠকে, সেখানে স্থানীয় সংস্কৃতিসেবীরা ওই শহরে সংস্কৃতিচর্চার অন্তরায়গুলো সাড়ম্বরে চিহ্নিত করছিল। জবাবে বাবর আলী কথার পিঠে কথা সাজিয়ে চমৎকার এক বক্তৃতা দাঁড় করিয়ে শেষে যোগ করল এই কথাটা:
এবং হ্যাঁ, আপনাদের ক্ষোভ, আপনাদের প্রতিরোধের সংবাদ আমি ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকদের কাছে পৌঁছে দেব। আপনাদের রংপুরের ছেলে সৈয়দ শামসুল হক, টেলিভিশনে প্রায়ই আসেন, আমি তাঁকে বিশেষ করে বলব।
পরিচিত ঠিকই, কিন্তু শামসুল হক কি বাবর আলীর সঙ্গে ছিলেন? মোটেই না। বাবর আলীকে তিনি গুরুত্ব দেন, তাকে বোঝার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাকে ‘হিরো’ বানাতে পারেন না। তাঁর কাছে নায়ক নূরলদীনই, যদিও তিনি জানেন যে বাবর আলীরাই ক্ষমতা ধরে রাখবে, নূরলদীনদের থাকতে হবে দূরেই। কিন্তু ইতিহাসের ভবিষ্যৎ যে নূরলদীনদের হাতে এটা তাঁর কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট, এবং সে-কথা বলেছেনও তিনি তাঁর সাহিত্যে।
তবে সেটা বলার জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে একাত্তরের যুদ্ধ পর্যন্ত। একাত্তরের আগে নূরলদীনকে নায়ক করে সাহিত্য সৃষ্টি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। যদিও নূরলদীনের মতোই তিনিও রংপুরেরই লোক। মানুষের মনই সাহিত্য সৃষ্টি করে, কিন্তু মানুষের মন ততটা স্বাধীন নয়, যতটা সে ধারণা করতে পছন্দ করে। বায়ান্নর ধাক্কা সৈয়দ শামসুল হককে লেখক হতে বলেছে, একাত্তরের ধাক্কা তাঁর কাছ থেকে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো বের করে এনেছে। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ লেখা হয়েছিল ১৯৮২-তে, ওই কাব্যনাটকের অসামান্য উচ্চতা তিনি পরের কোনো লেখাতেই লঙ্ঘন করতে পারেন নি। তিনি কি অপেক্ষা করছিলেন নতুন একটি ধাক্কার জন্য? কিন্তু সেটা তো আর আসেনি। নূরলদীন নিজেই তো কষ্টে আছে। আমাদের সৃষ্টিশীলতার সাধারণ মানও তো থমকে গেছে, ইতিহাসের আটকে-পড়ার সঙ্গে তাল রেখে। এর জন্য বাবর আলীদের বাহাদুরি কতটা দায়ী তা সমীকরণ কষে বলা যাবে না। মাপজোকের কাজটা মোটেই সহজ নয়।
থাক সেটা। আপাতত শেষ করা যাক তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথাটা দিয়ে। বলেছিলাম, আমরা সবাই আপনার সঙ্গে আছি। কিন্তু আমরা তাঁর সঙ্গে থাকব কী করে? তিনি তো চলে গেছেন সময়ের অপর পাড়ে। উল্টো তিনিই আমাদের সঙ্গে থাকবেন, এখনকার আমাদের সঙ্গে যেমন, ভবিষ্যতের আমাদের সঙ্গেও তেমনি। থাকবেন তাঁর সাহিত্যকর্মের ভেতর দিয়ে।
** সৈয়দ শামসুল হক স্মরণিকা ‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব’ গ্রন্থে প্রকাশিত প্রবন্ধের অংশবিশেষ
- বিষয় :
- সৈয়দ শামসুল হক
