নিরুপম নারী নদী বৃক্ষ ও বন
অপরূপ কাপ্তাই হ্রদ
ইনাম আল হক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৮
আমাজন বনে প্রবেশের সময় ঘনিয়ে এসেছে! সাড়ে ৯ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়চূড়ায় ইকুয়েডরের রুদ্ধশ্বাস রাজধানী ‘কিটো’ থেকে রাতের বাসে গতকাল রওনা হয়েছি। আজ বেলা ১২টায় পাহাড়ের ঢালে এসে বাস থেমেছে; সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আমাজন বন। আমাদের জার্নি এখনও শেষ হয়নি; বাকি আছে তিন ঘণ্টার নদীভ্রমণ! জালের মতো ছড়ানো শাখানদী দিয়ে ফাইবার-গ্লাসের ক্যানিউ আমাদের নিয়ে যাবে বনের ভেতরে। বাসের কুঠুরি থেকে সবার লটবহর এনে নদীতীরে স্তূপ করা হচ্ছে। ঘাটে দাঁড়িয়ে আমাদের গাইড নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করলেন। জলপ্রবাহের হিসাবে বিশ্বের বৃহত্তম নদী আমাজন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গঙ্গা-পদ্মা নদীটি; যদিও তার জলপ্রবাহ আমাজনের এক-পঞ্চমাংশ মাত্র। দক্ষিণ আমেরিকার সাতটি দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে মহানদ ‘আমাজন’। এর সহস্র ধারা জন্ম দিয়েছে ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই মহাবন। বিশ্বের বৃহত্তম বনভূমি এবং জীববৈচিত্র্যে বিশ্বের সর্বাধিক সমৃদ্ধ স্থান, অনন্য ‘আমাজন’। ৩০ লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে এই বনে এবং ৩৯ কোটি মহিরুহ তার সূর্যরশ্মিলোভী পল্লব দিয়ে ঢেকে রেখেছে আমাজনের জমিন ও জলাভূমি। ইকুয়েডরের ৪০ শতাংশ ভূমিজুড়ে আছে আমাজন বন; এর বৃহত্তর অংশ রয়েছে ব্রাজিলে। এই বনের একটি বৃক্ষের ইংরেজি নাম ‘আমাজন-ট্রি’; বড় বড় আঙুরের মতো সুস্বাদু ফলে ভরে থাকে সেই গাছ। সে ফলের মৌসুম এখন শুরু হয়েছে এবং দুই দিন পরেই আমরা সেই ‘ট্রি-গ্রেপ’ নিজ হাতে পেড়ে খেতে পারব– এই সুসংবাদ দিয়ে গাইড থামলেন। আমরা হাঁটু ভাঁজ করে বসলাম; পানি ছিটিয়ে ছুটে চলল আমাদের ক্যানিউ দুটি।
চমৎকৃত না হয়ে উপায় নেই! এক প্রজাতির ফলদ বৃক্ষের নামই শুধু ‘আমাজন’ নয়; এই পুরো বনের নাম ‘আমাজন’ এবং এ নদীর নামও আবার ‘আমাজন’! দখলদারের হাত থেকে এই বৃক্ষ, বন ও নদী রক্ষার জন্য একদা যেসব বন্য-ললনা লড়াই করেছিলেন, সেই নারী যোদ্ধাকেও বলা হয় ‘আমাজন’। এই নামকরণ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। নারীর নাম থেকেই নদী, বৃক্ষ ও বনের নাম হয়েছে আমাজন। সেটা আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের ৫০ বছর পরের কথা। তখন স্পেনের নাবিকেরা দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল বরাবর বন্দর ও বসতি গড়তে শুরু করেছে। ‘গয়াকিল’ নামে নতুন উপকূলীয় একটি বসতির গভর্নর হয়েছে মধ্যবয়সী এক নাবিক, যার নাম ‘ফ্রান্সিস্কো ডি ওরিয়ানা’। গয়াকিলের পুবদিকে বিশাল দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আছে অ্যান্ডিজ পর্বত। এই পর্বত থেকে নেমে এসে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে ‘গয়া’ নদী। সে নদীর মোহনায় গড়ে উঠেছে গয়াকিল বন্দর। আজকের ‘গয়াকিল’ বন্দরনগরীতে দুই দিনের সফরে গিয়ে আমরা কোথাও সেই স্প্যানিশ গভর্নরের কোনো চিহ্ন দেখতে পাইনি। বরং ১৯ শতকের প্রথমার্ধে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের কবল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চল স্বাধীন করার সংগ্রামের দুই পুরোধা, জেনারেল সিমন বলিভার ও জেনারেল সান মার্টিনের অতিকায় মূর্তি ছিল নগরীর বিনোদন কেন্দ্রে। তবে সেই বিস্মৃত গভর্নর ফ্রান্সিস্কোই কিন্তু অ্যান্ডিজ পর্বতের ঢালে জন্ম নেওয়া আমাজন নদীর আদ্যোপান্ত জানার উদ্যোগটি নিয়েছিল।
অ্যান্ডিজ পর্বত তো সোজা চলে গেছে দক্ষিণে; আর সেই পর্বত থেকে শাখা মেলে পুবদিকে বয়ে গেছে পাহাড়ি নদী। কেউ জানে না কোথায় গেছে সে নদী। গভর্নর ফ্রান্সিস্কো সংকল্প করল, এ নদীর ধারা কোথায় ও কতদূর গেছে তা আবিষ্কার করতে হবে। তার মনে হয়েছিল, এই নদীর কোনো নিভৃত তীরেই রয়েছে কাল্পনিক নগর ‘এল ডোরাডো’। গভর্নর ফ্রান্সিস্কো ৫০ জন নাবিক নিয়ে নদীতে জাহাজ ভাসিয়ে দিল ১৫৪১ সালের এপ্রিলে। তারপর বছর শেষ হলো, নদী শেষ হলো না।
বনের নানা স্থানে আদিম যুগের বনবাসী মানুষ নদীতীর থেকে তীর ছুড়ে এবং কাঠের-ক্যানিউ চালিয়ে এসে বারবার ফ্রান্সিস্কোর জাহাজ আক্রমণ করতে থাকল। তবে সে আক্রমণ প্রতিহত করা বন্দুকধারী নাবিকদের জন্য কঠিন ছিল না। কিন্তু আদিবাসীদের দলে নারী-যোদ্ধার আধিক্য দেখে তারা বিস্মিত হয়েছিল। দেড় বছর ধরে চলার পর একদিন জাহাজটি পুরো মহাদেশ পার হয়ে নদীর বিস্তৃত মোহনা হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে নামল। সেখান থেকে গয়াকিলে ফেরা সহজ নয় বলে আটলান্টিক পার হয়ে জাহাজ চলে গেল স্পেন। ‘সেভিল’ বন্দরে এই জাহাজের নাবিকদের গল্প থেকে ছড়িয়ে পড়ল গহিন বনের আদিবাসী নারী যোদ্ধাদের কথা। সবাই স্মরণ করল গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াডের নারী যোদ্ধার অমর কাহিনি। গ্রিক পুরাণকথায় নারী যোদ্ধাদের বলা হয়েছে ‘আমাজন’। সেই থেকে দক্ষিণ আমেরিকার সদ্য আবিষ্কৃত নদীর নাম হয়ে গেল ‘আমাজন’ এবং কালক্রমে বনের নামও হলো ‘আমাজন’।
দুর্ধর্ষ নারী যোদ্ধা বাহিনীর অনেক কাহিনি আছে গ্রিক গাথায়। তীর-ধনুকই ছিল সে যুগের মারণাস্ত্র, সে কালের কালাশ্নিকভ। একজন যোদ্ধা তার বুকের কাছে ধনুকের রশি যত বেশি জোরে টেনে আনতে পারত তার তীর তত জোরে ছুটত। তীর ছোড়ায় সুবিধে হয় বলে কাল্পনিক সেই নারী যোদ্ধারা নাকি বাম স্তন কেটে ফেলত। তাই গ্রিক ভাষায় তাদের বলা হতো ‘আ-মাজানো’ বা স্তনহীনা। কৃষ্ণসাগরের তীরে এক অজ্ঞাত স্থানে ছিল সেই নারী যোদ্ধাদের বসবাস। সে সমাজে ছিল শুধু নারী ও বালিকা। ছেলে সন্তানদের তারা মেরে ফেলত অথবা দূর গ্রামে দত্তক দিয়ে দিত। ইলিয়াড কাব্যে ইলিয়ন বা ট্রয় অবরোধ করে ১০ বছর ধরে যে যুদ্ধ চালানো হয়েছিল, তাতে অংশ নিয়েছিল দুজন আমাজন। তাদের নাম হিপোলিটা ও পেন্থেসিলিয়া। মহাবীর একিলির সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পেন্থেসিলিয়া মারা যায়। গ্রিক গাথার সেই স্তনহীনা নারী যোদ্ধার কথা অনেকটাই নিছক কল্পনা আর গালগল্প ছিল। কিন্তু আমাজন বনের নারী যোদ্ধার কথাটা মোটেই মিথ্যা নয়। এই বনে সেই যোদ্ধারা এখনও রয়ে গেছে এবং আমাদের মতো মানুষ দেখতে পেলে আজও তারা নির্দ্বিধায় বিষাক্ত তীর ছুড়তে শুরু করে। বনের ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখলেও তারা তীর ছুড়তে থাকে। সেই হেলিকপ্টার থেকে তোলা ছবি দেখেই আমরা আজ বনবাসী মানুষের উপস্থিতি জানতে পারি। অধিকাংশ বসতিতে নগ্নদেহী ও মুখে রং-মাখা নারী, পুরুষ ও শিশুকিশোর দেখা যায়। কোথাও গ্রিক গল্পের সেই পুরুষ-বিবর্জিত ও স্তনহীনা নারীদের কোনো বসতি আজও দেখা যায়নি।
আমাজন বনে আজও শতাধিক ‘বিচ্ছিন্ন’ বনবাসী জনগোষ্ঠী টিকে আছে। বিশ্বের বাকি মানুষ এদের সঙ্গে মেলামেশাটা এড়িয়ে চলে বলেই এরা বিশ্ব থেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে ঘোষিত। আমাজন বন বিশাল হলেও বনবাসী মানুষের সংখ্যা বেশি নয়। বনবাসী জনগোষ্ঠীর সেবায় নিবেদিত এনজিও ‘সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল’ বলেছে যে ‘বিচ্ছিন্ন’ মানুষের সংখ্যা দশ হাজারের মতো। গত শতকে আমাজন বনে ‘বিচ্ছিন্ন’ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। আমাদের মতো আধুনিক মানুষের সংস্পর্শে আসার পর তাদের পতন শুরু হয়। তাদের ধ্বংস করার জন্য আমাদের কষ্ট করে কোনো বিষাক্ত তীর ছুড়তে হয়নি। ইনফ্লুয়েঞ্জা, মিজেল, পোলিও, পক্সসহ যেসব ভাইরাস নিয়ে আমরা দিব্যি বেঁচে থাকি, তাতে সংক্রমিত হয়েই বনবাসী মানুষের বসতি দেখতে দেখতে উজাড় হয়ে যায়। বনবাসী মানুষের মাঝে ‘শিক্ষার আলো’ কিংবা ‘ধর্মের বাণী’ নিয়ে যাওয়ার নিরপরাধ প্রাথমিক প্রচেষ্টার ফলে অনেক জনগোষ্ঠীতে মহামারি শুরু হয়েছিল। তারপরই ব্রাজিল, পেরু ও কলম্বিয়াতে এই ‘বিচ্ছিন্ন’ বনবাসী থেকে আধুনিক মানুষকে দূরে রাখার শক্তিশালী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাজন বন রয়েছে এমন অপর চারটি দেশেও সমতুল্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই সব বনবাসী মানুষের এলাকায় আমার মতো কৌতূহলী বনচরের প্রবেশ করার তো কথাই ওঠে না; ধর্মযাজক, এনজিও-কর্মী কিংবা নৃতত্ত্বের কোনো নিবেদিত গবেষকেরও প্রবেশ নিষেধ। সাত বছর আগে আন্দামান দীপপুঞ্জের একটি দুঃখজনক ঘটনা মনে পড়ে। ‘ধর্মের বাণী’ নিয়ে ‘জন অ্যালেন চাউ’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের এক তরুণ এভাঞ্জেলিস্ট জেলে নৌকায় চড়ে গিয়েছিলেন ‘উত্তর-সেন্টিনেল দ্বীপে’ বসবাসকারী ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘোষিত বনবাসী মানুষের কাছে। বনবাসীরা তীর ছুড়ে তাঁকে বাধা দিলেও তিনি বাইবেল হাতে নিয়ে এগিয়ে যান। পরে জেলেরা দেখতে পায় যে দ্বীপের বালুকাবেলায় বনবাসীরা তাঁর মৃতদেহ পুঁতে ফেলছে। জন অ্যালেন চাউয়ের হঠকারী উদ্যোগকে নিন্দা এবং তাঁর মাধ্যমে সেন্টিনেলিজ মানুষের দেহে নতুন রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিল ‘সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল’।
আমাজন বন আমাদের সুন্দরবনের মতোই সুনসান। দুটো বনেই আছে অফুরান পানি আর গাছ এবং পশু-পাখি অগণন। পার্থক্য এই যে– সুন্দরবনের পানি নোনতা; আর আমাজনের পানি সুপেয়। সুপেয় পানি আছে বলেই অনুসন্ধিৎসু ফ্রান্সিস্কো ও তাঁর ৫০ জন নাবিক আমাজন নদীতে দেড় বছর বেঁচে ছিলেন। সুপেয় পানির আকাল আছে বলেই কিন্তু সুন্দরবন টিকে আছে; পানযোগ্য পানি থাকলে ওখানে গড়ে উঠত সুন্দরবন আবাসিক এলাকা ও ইকোপার্ক। সুন্দরবনের মতোই আমাজনের বৃক্ষকুল আজীবন পানিতে বাস করে; এবং সারাদিন পানিতে নিজের ছবি দেখতে ভালোবাসে। আমাজনের গাছগুলো মগডাল থেকে শিকড় নামিয়ে দিয়ে নদী থেকে পানি পান করে। এ এক চোখ জুড়ানো দৃশ্য।
ছয় মাস হলো আমাজন বন ছেড়ে জন্মভূমিতে ফিরে এসেছি। আমাজন বনে সবুজের সেই অফুরন্ত ঐশ্বর্য আমার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। আমাদের দেশে সুন্দরবন ছাড়াও পানিতে দাঁড়ানো কিছু বন আজও টিকে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। পাহাড়ে মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নয়নাভিরাম সেই বন ক্রমাগত নিগৃহীত হয়ে অবশেষে বিলুপ্ত হতে চলেছে। দেখে মনে হয় যেন মানুষের চোখে সবুজের চাহিদা কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। শুধু ইট, সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেই যেন আমাদের চলে।
- বিষয় :
- বৃক্ষরোপণ
