শিল্পের অনন্য মাত্রা
শিল্পকর্ম :: কেইজড ফ্লাইট শিল্পী:: সাদাতউদ্দিন আহমেদ এমিল
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩১ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
যাত্রা তো কেবল পদচারণা নয়, যাত্রা মানে অন্তরকে নতুন আলোয় স্নান করানো। যেখানে শিল্পের ভাষা হয়ে ওঠে নীরবতা আর ক্যানভাসে জেগে ওঠে চুপ থাকা প্রশ্ন। ঠিক সেই রকম এক যাত্রার আমন্ত্রণ নিয়ে ফিরে এসেছে এজ গ্যালারির নতুন প্রদর্শনী ‘9+ONE: Interdimensional Journeys Part II’, যার উদ্বোধন হয় গত ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। এটি শুধু প্রদর্শনী নয়, যেন এক পরাপার্থিবতার আহ্বান। ৯ জন তরুণ শিল্পীর চোখে দেখা এক ভিন্ন বাস্তবতা। যেখানে কল্পনারা ছায়া ফেলে বাস্তবতার ঘাড়ে, আর শিল্পের ভাষা দর্শককে নিয়ে যায় অনুভবের অতল অন্ধকারে। এই ৯ জন শিল্পী হলেন– অসীম হালদার সাগর, ফয়জুর রহমান ফিরোজ, মো. আনিসুল হক, মুক্তি ভৌমিক, নুর মুনজেরিন রিমঝিম, সাদাত উদ্দিন আহমেদ আমিল, তরিকুল ইসলাম হীরক, তুলসী রানী দাস ও জিহান করিম।
২০২৩ সালে যখন এই প্রদর্শনী প্রথমবারের মতো দর্শকের সামনে হাজির হয়, তখন তা ছিল এক সাহসী প্রয়াস। ১৮ জন তরুণ শিল্পীর শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়েছিল এক বৈচিত্র্যময় জগৎ, যেখানে সংলাপ ছিল মূল সুর। সেই প্রদর্শনী শুধু আলোচনার কেন্দ্রেই আসেনি; বরং দর্শকদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়েছিল অন্য এক অভিজ্ঞতার দিকে।
ঠিক দুই বছর পর, সেই যাত্রা ফিরে এসেছে নতুন রূপে। দ্বিতীয় পর্বে এবার ৯ জন শিল্পী আছেন সম্মুখসারিতে, আর বাকি সেই ১৮ জন থেকে গড়ে উঠেছে এক নান্দনিক উপস্থিতি। যারা চোখের সামনে না থাকলেও থেকে যান স্মৃতিতে, সময়ের স্তরে, শিল্পচেতনার সুতোয় গাঁথা হয়ে।
এই প্রদর্শনীর প্রতিটি কাজ যেন একেকটি খোলা দরজা। যেখানে প্রবেশ করলে দর্শকের মনে হয় নিজেকে, মানুষটা সেই আগের মতো নেই। চিত্রকলা, স্কেচ, রিলিফ, সেরামিক আর ইনস্টলেশন– এই সমস্ত মাধ্যম মিলিয়ে এক অদ্ভুত সংলাপ রচনা হয়েছে, যা অনুভব করতে হয় হৃদয় দিয়ে। মুক্তি ভৌমিকের অ্যালুমিনিয়াম ও ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি করা কাজগুলোতে ফুটে উঠেছে মানবজীবনের অপেক্ষা, স্বাধীনতা, ইচ্ছার এক অদম্য বহিঃপ্রকাশ। যেখানে সব চেতনার ফলস্বরূপও কি একজন মানুষ স্বাধীনতা পায় কিনা, সে প্রশ্নই ছুড়ে দেয় দর্শকের দিকে।
কোনো শিল্পকর্মে দেখা যাবে সময়ের ওপর রেখাপাত করা– দর্শকের মনে হয়, অতীত আর ভবিষ্যৎ যেন পাশাপাশি হাঁটছে যেন তারা।
আবার কোনো ইনস্টলেশন এমন এক অলীক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে নিজের ছায়াকেই অপরিচিত মনে হয়। কেউ যেন দেখাচ্ছেন এক বহুসত্তার সম্ভাবনা, আবার কেউ জন্ম দিচ্ছেন এমন এক ঘর, যার প্রতিটি দেয়ালই চলমান। ঠিক এমনই কিছু কাজ দেখিয়েছেন নুর মুনজেরিন রিমঝিম। ইট-পাথরে তৈরি কংক্রিটের মধ্যেও ঢাবির চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন দিক বা রূপলাল হাউসের সৌন্দর্য, যা মানব-মনে দাগ কেটে থাকে বহুকাল। যান্ত্রিক কাঠিন্যের মধ্যে থেকেও আরেক কাঠিন্যের সামনে গিয়ে যে মানুষ স্বস্তি খুঁজে ফেরে, এ যেন তারই বহিঃপ্রকাশ জেলপেনে আঁকা ছবিগুলোতে।
এই সবকিছু মিলিয়ে যে অনুভব জন্ম নেয়, তাকে এক রেখায় দর্শক দেখতে পায় না। দেখতে হয় বিভিন্ন রেখার ভঙ্গিমায়। এখানে শুধু দেখার চেয়ে ভরসা রাখতে হয় অনুভবে। যেভাবে তুলসী রানী দাস মেটাফোর হিসেবে ক্যানভাসে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নারীকে দেখিয়েছেন; শাড়ি, গহনা, রং এবং ঐতিহ্যের এক মিশেল বন্ধনের মাধ্যমে। আজকের সময়ে যখন সবকিছু দ্রুত, সবকিছু সুনির্দিষ্ট, তখন এই প্রদর্শনী যেন ধীরতা আর অনিশ্চয়তার জন্য এক আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। বিজ্ঞানের জগতে যেসব বিষয় এখনও ধরা যায় না– স্ট্রিং থিওরি, মাল্টিভার্স বা বহুবিশ্বের সম্ভাবনা– সেই বিষয়গুলো শিল্পীরা এখানে তুলে এনেছেন নান্দনিক এক শিল্পের আয়নায়। তবে কোনো ব্যাখ্যার ভার নেননি এই শিল্পীরা; বরং তারা দর্শকদের দাঁড় করিয়েছেন এক অনুভবের মুখোমুখি। যেখানে ব্যাখ্যা নেই, আছে কল্পনা।
গ্যালারি ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রতিটি শিল্পকর্ম দর্শকের মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের আসল শক্তি তা-ই, যা আমাদের ভাবিয়ে তোলে, চুপ করিয়ে দেয়, আর একমুহূর্তের জন্য হলেও চেনা পৃথিবীটাকে অচেনা করে তোলে। এটি কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; বহুমাত্রিকতা, অচেনা অথচ আপন এক যাত্রা।
মূলত প্রদর্শনীটি যেন এক চক্রের মতো। শুরু যেখানেই হোক, শেষ সেখানে নয়; বরং প্রতিবার দর্শক নিজেই নতুন করে শুরু করে সেই যাত্রা। গ্যালারির কিউরেটররা তাদের সংবেদনশীল ভাবনায় ফিরিয়ে এনেছেন সেই প্রান্তরেখাকে, যেখানে দেখা ও অনুভবের পার্থক্য ঘোলাটে হয়ে যায়।
এই প্রদর্শনী একজন শিল্পমনা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে শিল্প শুধুই দেখার বস্তু নয়, এটি এক গভীর সংলাপ। যা গড়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে, দর্শকের চোখে, শিল্পীর মনের মধ্যে। পুরো গ্যালারিতে থাকা প্রতিটি কাজ দর্শককে এমন এক অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে শুধু মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি আর শিল্পের হাত ধরে হাঁটার ইচ্ছা রয়েছে।
৯ জন শিল্পীর মোট ৭৭টি শিল্পকর্ম নিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত এই প্রদর্শনী চলবে ৪ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
- বিষয় :
- দ্রোহী তারা
