আপনি জাগাও আনন্দ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপ্রকাশিত ছড়া
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [৮ মে ১৮৬১–৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮–২২ শ্রাবণ ১৩৪৮] - প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছড়া নিয়ে কিছুদিন ধরে আমি গবেষণা করছি। এ কাজে আমি রবীন্দ্রনাথের ছড়ার পাণ্ডুলিপি দেখার জন্য কয়েকবার শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে যাই। সেখানকার অধ্যক্ষ ও কর্মীদের সহযোগিতায় আমি কবির বেশ কিছু পাণ্ডুলিপিতে ছড়া অনুসন্ধানের সুযোগ পাই।
রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত ১৯৩৯ সালের একটি ডায়েরির পাতায় ‘নরেশ দেখালে বটে...’ প্রথম চরণধৃত একটি ছড়া আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। এর ফাইল নম্বর ১৬০। এর আগে ডায়েরিটিতে রবীন্দ্রগ্রন্থ ‘ছড়া’র ৩ নম্বর রচনা এবং উল্লিখিত লেখাটির পরে ‘ছড়া’র ১, ১০ ও ৬ নম্বর রচনার পাণ্ডুলিপি আছে। ওই চারটি রচনা যথাক্রমে ৯ মার্চ ১৯৪০, ১৫ মে ১৯৪০, ৭ মার্চ ১৯৪০ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালে রচিত। অনুমান করা যায়, নরেশ সম্পর্কিত আট পঙ্ক্তির এই রচনাটি ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের কোনো সময়ে রচিত হয়ে থাকতে পারে।
আমাদের অনুসন্ধানে মনে হয়েছে যে এই রচনাটি কবির রচনাবলির ৩৩ খণ্ডের কোনো খণ্ডে এখন পর্যন্ত স্থান পায়নি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্র পাণ্ডুলিপির কম্পিউটার কম্পোজকৃত যে কপি করেছে, পরে তা এই কপিতে অবশ্য স্থান পেয়েছে। এটিকে সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অপ্রকাশিত ছড়া হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
আমাদের দ্বিতীয়বার অনুসন্ধানের সময় রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত একটি রুলটানা এক্সারসাইজ খাতায় এই রচনটির পূর্ণরূপ খুঁজে পেয়েছি। ওই খাতার ৫৪, ৫৫ ও ৫৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ছড়াটি কবির নয়, অন্যের হস্তলেখায় লিপিবদ্ধ রয়েছে।
খাতার ৫৪ পৃষ্ঠার শিরোদেশে ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখা রয়েছে– ‘নরেশের কাছ থেকে সবজির ঝুড়ি উপহার পেয়ে তার প্রতিদানে’। রচনাটি পড়ে মনে হয় যে ফিরতি উপহার হিসেবে নরেশকে কবি কিছু স্বরচিত কাব্য ও নাটকের গ্রন্থ পাঠিয়েছিলেন। রচনাটি মোট ৪০ পঙ্ক্তির–
নরেশ দেখালে বটে
জোর তব কব্জির,–
বড়ো বড়ো ঝুড়িগুলো
ফলমূল সবজির–
পৌঁছিয়ে দিলে দ্বারে–
ব্যাপারটা সোজা নয়
যে-সে নেবে কাঁধে তুলে’
–এমন সে বোঝা নয়।
ক্ষোভ এই, লোভ বেশি,
ক্ষুধার বহর কম;
ভরা গ্রাসে চর্বণে
রাখিতে পারিনে দম।
তাই মনে ভাবলেম
দিতে হবে পাল্লা,–
কাব্য বোঝাই তরী
আমি যার মাল্লা।
দোষ তার যত থাক
ভার তার মন্দ কী?
কোনো কবি জমিয়েছে
এতগুলো ছন্দ কি?
নিশ্চয় জানি তাই
স্যালাডের ভোজনে
সমান সমান হবে
লেখাগুলো ওজনে।
পাঠালেম এতদিনে
যে ক’টা যা বাঁচিল
কাব্য নাটক ঘেঁটে
সঞ্চয় যা ছিল।
সংখ্যায় উভয়ের
একদাম গৌরবে
আলু মুলো পটলের
সঙ্গেই দৌড়ুবে,
তবু যদি জিত হয়
সবজির ঝুড়িটার
হার হয় ভারতীয়
পদ্মের কুঁড়িটার,–
মনে জেনো ফেরাব না
তুলে নেব আদরে,–
ভাঁড়ারে তো পাবে ঠাঁই
পেটে যাহা না ধরে।।
যদি প্রকৃতপক্ষেই এটি এতদিন অপ্রকাশিত বা অমুদ্রিত থাকে, তাহলে পাঠকের কাছে রবীন্দ্ররচনায় এটি একটি নতুন সংযোজন।
নরেশের পরিচয় আমাদের নিশ্চিতভাবে জানা নেই। তবে তিনি পরবর্তী সময়ের খ্যাতনামা কবি, তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক এবং শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ নরেশ গুহ হতে পারেন। তিনি ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারি/মার্চ মাসে কলকাতা থেকে পায়ে হেঁটে শান্তিনিকেতনে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানাতে। কবিসহ শান্তিনিকেতনের বাসিন্দারা এতে আপ্লুত হয়েছিলেন। সে-সময়ে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ থাকায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ বারণ ছিল। নরেশ সুধাকান্তসহ সেবকদের ফাঁকি দিয়ে কবির সঙ্গে দেখা করেন। পরদিন তিনি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি গ্রুপ ছবিও তোলেন নিজের ক্যামেরায়।
- বিষয় :
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
