ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সময়ের নিশ্চলতা দেখে

সময়ের নিশ্চলতা দেখে
×

শিল্পকর্ম :: মনিরুল ইসলাম

মালেকা পারভীন

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি– বিকেলের এই রঙ– রঙের শূন্যতা
রোদের নরম রোম– ঢালু মাঠ– বিবর্ণ বাদামি পাখি– হলুদ বিচালি…’
–অঘ্রাণ, জীবনানন্দ দাশ 

১.
জানালার অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমে ঝুলে আছে এক তেরছা রোদ। সেই এক ফালি রোদকে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া অলৌকিক স্বর্ণমুদ্রা– আসল অথবা নকল। দেয়ালঘড়িতে বিকেলবেলা আটকে গেছে সাড়ে ৪টার কাঁটায়, যেন সেখান থেকে বের হবার কোনো উপায় জানা নেই তার। একে ঠিক দিন নয়, আবার রাত বলার মতো ঘন অন্ধকার জমে ওঠেনি এখনও। 
ঘরের ভেতরের আসবাবজুড়ে ভর করেছে এক ধরনের জ্যামিতিক শূন্যতা। টেবিলে পড়ে থাকা আধখাওয়া চায়ের কাপ, যার ওপর একটা পাতলা সর পড়েছে; কিংবা ঘরের এক কোণে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা পেডেস্টাল ফ্যান–সবকিছুই যেন তাদের উপযোগিতা হারিয়ে স্রেফ কিছু জড় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জড় বস্তুই তারা, আর তাদের ঘিরে থাকা জড়তার গ্রাস আচ্ছন্ন করেছে বিষাদগ্রস্ত বিকেলের আশপাশ।
নাগরিক খাঁচায় দাঁড়িয়ে আমার মনে ঢেউ তুলছে নানা বিচ্ছিন্ন ভাবনা– আমরা প্রত্যেকে একেকটি কাচের বোতলে বন্দি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আধুনিক মানুষ তার সমস্ত ব্যস্ততার আড়ালে যে একাকিত্বকে লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে, দিন শেষের নরম বিষণ্ন আলোয় তা নগ্ন হয়ে পড়ে। জীবনের সূক্ষ্ম ফাটলগুলো, যা এতক্ষণ কাজের চাপে ঢাকা ছিল, তা এই ম্লান আলোয় উন্মোচিত হয় অকরুণ নির্মমতায়। দিনের বিশেষ এই সময়ে সমস্ত কর্মব্যস্ততা ও সংসারের দায়কে বড় ক্লান্তিকর, নিরেট একঘেয়ে আর চরম অর্থহীনতার এক মহাকাব্য মনে হয়। 
মনে পড়ে, লর্ড টেনিসনের বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য লোটাস-ইটারস’-এর সেই স্তবক, যেখানে বিকেলের এই চিরন্তন স্থবিরতা আর সব কিছু ছেড়ে দেওয়ার এক গভীর অবশ আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে অব্যর্থ কাব্যময়তায় : 
‘A land where all things always seem’d the same!
And round about the keel with melancholy omens blown, 
The mild-eyed melancholy Lotos-eaters came.’

আমার অফিস ঘরের ভেতরেও এই সময়ে এক ধরনের লোটাস-ইটারস বা পদ্মখেকোদের মতো ম্লান বিষাদ আর অবরুদ্ধ বাতাস প্রবেশ করতে শুরু করে। মন চায় সমস্ত দায়িত্বের তরী তীরে ভিড়িয়ে এই অবশ অপরাহ্ণের স্রোতে ভেসে যেতে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি, সময় চলে যাচ্ছে এবং সেই চলে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আমার কোনো হাত নেই। নিরবচ্ছিন্ন সময় প্রবাহের সঙ্গে ভেসে যাওয়া ছাড়া আমাদের কিছুই করার নেই। 
জগতের সমস্ত উৎসবের, সকল আয়োজনের একটা শুরু আর একটা শেষ আছে। মানুষ যখন সিনেমা বা থিয়েটার দেখে একযোগে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হয়ে আসে, অথবা মেলা শেষে যখন স্টলের বাতিগুলো নিভে যায় একে একে–ঠিক সেই মুহূর্তের যে অখণ্ড নীরবতা, অফিস ছাড়ার কিছু সময় আগে বিকেল সাড়ে ৪টার এই আলো সেই নীরবতার এক বিমূর্ত মেটাফোর! 
২. 
বিকেলকেন্দ্রিক যে বিষণ্নতা বাঙালির মনকে অবধারিতভাবে আচ্ছন্ন করতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে, তার পেছনে চিরন্তন রবীন্দ্রসংগীতের অবদান নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সারা দিনমান যে কোনো লগ্নের মতো বিকেলবেলার দিনান্তেও তা সত্য। কবিগুরু যে নিজের মুখেই বলে গেছেন : ‘বিশেষ করে বাঙালিরা, শোকে-দুঃখে, সুখে-আনন্দে, আমার গান না গেয়ে তাঁদের উপায় নেই। যুগে যুগে এ গান তাঁদের গাইতেই হবে।’ 
আর তাই যখনই দিনের আলোর অবক্ষয় হতে শুরু করে, মনের অজান্তেই গুনগুন করে ওঠে সেই চিরচেনা সুর : ‘দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি...।’ কার জন্য আশা, কেনইবা এই আশা– এই প্রশ্নের কোনো উত্তর বিকেলের কাছে নেই। বিকেল কোনো উত্তর দিতে আসে না, সে কেবল মনের ভেতর উথালপাতাল করা এলোমেলো প্রশ্নগুলোকে আরও একটু, আরেকবার উস্কে দিয়ে যায়। 
রবীন্দ্রসংগীতে বিকেলবেলা বা গোধূলি লগ্নের অনুভূতি এক গভীর প্রশান্তি, ম্লান বিষাদ, আর অন্তিম মিলনের আকুলতায় ভরপুর। দিনের ব্যস্ততা ফুরিয়ে আসার এই ক্ষণে আলোর রং বদলে যায়; কবির মনে এক অজানা একাকিত্ব ও পরম সত্তার সান্নিধ্যের ব্যাকুলতা জেগে ওঠে। ‘আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদলসাঁঝে’র বিষণ্ন রাগে পড়ন্ত বেলায় জীবন ও সময় ফুরিয়ে আসার এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটে।
যখন ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে আধশোয়া আমার মন গেয়ে ওঠে, ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে… আমায় নিয়ে যাবি কে রে বেলাশেষের শেষ খেয়ায়’, তখন মনে হয় নিত্যদিনের চেনা সংসার, একঘেয়ে জীবন যাপনের গ্লানি, সবই মায়া। এক ধরনের অর্থহীন খাঁচা। যতই আধুনিকতার বুলি আওড়াই, দিন শেষের বিশেষ আলোয় আমি সেই আদিম, সেই একাকী মানুষটাই থেকে যাই। 
গানটির সুর ভাঁজতে ভাঁজতে মানবজীবনের শেষ লগ্ন, মৃত্যু-পরবর্তী শান্ত, অজানা জগৎ অথবা ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের বাসনা ইত্যাকার ভাবনায় উদ্বেল হয়ে ওঠে দার্শনিক মন। মানসপটে ভেসে ওঠে নদীর ঘাটে একা দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ মানুষ; ওপারের ডাক শোনার মাধ্যমে জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া চুকিয়ে পরম শান্তিতে বিলীন হওয়ার এক আকুল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে অপেক্ষমাণ। মৃত্যু আর তার কাছে কোনো ভয়ের বিষয় নয়, বরং সারাদিনের ক্লান্তির পর এক গভীর ও শান্তিময় ঘুমের মতো– যেখানে কোনো কোলাহল নেই।
গানের সুর ছাপিয়ে রান্নাঘর থেকে শোনা যায় প্রেশারকুকারের সিটি, পাশের ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসে শিশুর কান্নার আওয়াজ কিংবা রাস্তা দিয়ে ছুটে চলা রিকশার ঘণ্টার ধ্বনি। এই সমস্ত দৈনিক কোলাহলের ভেতরেও এক মহাজাগতিক একাকিত্বে চারপাশ ঢাকা পড়ে যায়। মনে পড়ে যায়, এমন কিছু মানুষের কথা, যাদের কেন্দ্র করে একসময় জীবন আবর্তিত হয়েছে, অথচ আজ বহুদিন তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। অন্য কোনো বিকেলের আলোয় তাদের অস্তিত্ব মিশে গেছে।
৩. 
বিকেলের এই বিষাদ কেবল রবীন্দ্রনাথে আটকে থাকে না, একসময় তা রূপ নেয় জীবনানন্দ দাশের ধূসর, ক্লান্ত ও বিপন্ন চেতনায়। বিকেলের এই ম্রিয়মাণ আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর এক আদিম অবসাদকে, যেখানে সমস্ত চেনা কোলাহল হঠাৎ করে নির্বাক হয়ে যায়। যখন আমি জানালার গ্রিল ধরে বাইরের ধূসর আকাশটার দিকে তাকাই, তখন জীবনানন্দের সেই অমোঘ লাইনের অন্তর্নিহিত অর্থ আমার হাড়ের মজ্জায় গিয়ে আঘাত করে। কবির মতো করে আমি ভাবতে থাকি : ‘সবাই চলিয়া গেছে আমাদের এই পৃথিবীর ঢের আগে, আমরা রহিয়া গেছি; আমাদের এই বিকেলের আলোর ফাটলে কী এক গভীর ছায়া নামিতেছে...।’
গভীর শূন্যতার বোধে আক্রান্ত হয় মন। 

মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর ও সার্থক জিনিসগুলো যেন অনেক আগেই কালান্তরে চলে গেছে, আর আমি একাই এই বিকেলের মৃতপ্রায় আলোর ফাটলে অবশিষ্টাংশ হিসেবে পড়ে আছি। বিকেলের এই আলোর আস্তরণ কোনো মসৃণ ক্যানভাস নয়, এটি একটি ফাটল। সময়ের ফাটল, চেতনার ফাটল। আর সেই ফাটল গলে যে গভীর ছায়া নেমে আসে, তা আমার মনের ভেতরের সমস্ত অপ্রাপ্তি আর পুরোনো ক্ষতকে এক অতিপ্রাকৃতিক অবয়ব দেয়।
জীবনানন্দ বিকেলের আলোকে জলের তরঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যা এক তীব্র একাকিত্বের অনুভূতি তৈরি করে : ‘এই জল ভালো লাগে; ...তেমনি ঝরিছে জল আমার ঠোঁটের পরে চোখের পাতায়– / ...অপরাহ্ণে রাঙা রোদে সবুজ আতায়/ রেখেছে নরম হাত যেন তার–…’
শহুরে ফ্ল্যাটের ব্যালকনি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ট্রাফিকের অবিরাম শব্দ শুনতে শুনতে যখন আমি ক্লান্ত অনুভব করি, তখন সেই শব্দগুলোও যেন এক ধূসর আলোর তরঙ্গে রূপান্তরিত হয়। সেই তরঙ্গ অবশ্য কোনো আশার বার্তা আনে না, তা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বারবার আমার বুকে এসে আছড়ে পড়ে আর হৃদয়ের গভীরে এক তীব্র অবশতার জন্ম দেয়। এই আলোয় পৃথিবীর সমস্ত আয়োজনকে এক অদ্ভুত অলীক কিছু বলে মনে হতে থাকে। 
বিকেলের এই ম্লানতা যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন জীবনানন্দের বর্ণনায় জগৎ এক পরাবাস্তব স্থবিরতায় থমকে দাঁড়ায়। এই অদ্ভুত অবশতাই দিন শেষের আসল চরিত্র। এটি এমন এক ক্লান্তি, যা ঘুম আনে না, কিন্তু সমস্ত চেতনাকে অসাড় করে দেয়। চোখের সামনে জগৎটা সচল থেকেও যেন মৃত। মাথার ওপরে ছড়িয়ে থাকা আকাশ কোনো বিশালতার প্রতীক নয়, বরং তা যেন এক বিশালাকার শিয়র, যেখানে আমার সমস্ত অপূর্ণ স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা আর চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলা সোনালি দিনগুলো মৃত পাখিদের মতো একে একে এসে ভিড় করে। এই মহাজাগতিক ক্লান্তির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে ভীষণ ক্ষুদ্র, তুচ্ছ এবং অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে থাকে।
৪. 
বিকেলের এই শেষ ভাগে এসে জীবনের গতিশীলতা হঠাৎ এক অদ্ভুত দেয়ালের মুখোমুখি হয়। দিনভরের সমস্ত তাগিদ, ফাইল গোছানো, ই-মেইলের উত্তর দেওয়া কিংবা বাজারের ফর্দ মেলানোর মতো অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে আচমকা ভীষণ হাস্যকর আর ক্লান্তিকর মনে হতে থাকে। মনে হয়, এই চেনা পৃথিবীর চাকাটা যেন কোনো এক অদৃশ্য ব্রেকের টানে হঠাৎ ঘড়ঘড় করে থেমে গেল। অথচ রাতের অন্ধকার এখনও নামেনি যে মানুষ ঘুমের আড়ালে নিজেকে লুকাবে। আলো আর অন্ধকারের মধ্যবর্তী এই ঝুলন্ত শূন্যতার মাঝে লুকিয়ে থাকে বিকেলের অবসাদভরা অবয়ব। 
এ সময়ই একজন সংবেদনশীল মানুষের মনে এক চরম সত্য উন্মোচিত হয় : দিনের এই যে ঢলে পড়া, এ আসলে মানবজীবনেরই শেষ সীমানার এক প্রচ্ছন্ন রূপক। আলোর এই লয় আমাদের অজান্তে মনে করিয়ে দেয় জীবনের সেই অনিবার্য গন্তব্যের কথা, যার নাম মৃত্যু। শৈশব আর যৌবনের প্রখর মধ্যাহ্ন যখন ফুরিয়ে আসে, তখন মানুষ এসে দাঁড়ায় এই অবশ অপরাহ্ণের দোরগোড়ায়। সমস্ত অর্জন, সমস্ত অহংকার, ব্যাংক ব্যালান্স কিংবা খ্যাতির মুকুট– সবকিছুকে তখন এই নিভে যাওয়া রোদের মতো ম্লান আর উপযোগিতাহীন মনে হয়। জীবনের এই অলক্ষ্য ক্ষয় ও অন্তিম ট্র্যাজেডিকে মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত অথচ শান্ত বিষাদ গ্রাস করে আমাদের। আমরা বুঝতে পারি, যতই কোলাহল করি না কেন, দিন শেষে প্রত্যেকে আমরা একাকী এবং আমাদের গন্তব্য সেই অখণ্ড নীরবতার দিকে– যা রাত নামার আগে জগৎকে অসাড় করে দেয়।
৫. 
বিকেলের এই ফ্যাকাশে আলো যখন শহরের বহুতল ভবনগুলোর কাচে ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়ে, তখন চারপাশের চেনা ল্যান্ডস্কেপটা একটা মূর্তিবৎ থিয়েটারের মতো দেখায়। ধোঁয়াশে আকাশ আর ট্রাফিকের একটানা ক্লান্তিকর হর্ন মিলে তৈরি করে এক নাগরিক একঘেয়েমি। টি. এস. এলিয়টের ‘The Love Song of J. Alfred Prufrock’-এর সেই বিখ্যাত লাইনগুলো যেন এই মুহূর্তের শহরের জন্যই লেখা হয়েছিল: 
‘Let us go then, you and I,
When the evening is spread out against the sky
Like a patient etherized upon a table;’ 

ক্লোরোফর্মে অবশ করা রোগীর মতো এই অসাড় বিকেল আমার সংবেদনশীলতাকে অবশ করে দেয়। আমি যখন বারান্দা থেকে নিচে তাকাই, দেখি চায়ের দোকানে স্টোভের ধোঁয়া উঠছে, বাস থেকে নামছে অফিসফেরত কিছু অবসন্ন শরীর– যাদের চোখের কোণে কোনো স্বপ্ন নেই, আছে কেবল আগামীকালকের রুটিন সামলানোর তাগিদ। কফি চামচের ঠকঠক শব্দে আমরা মেপে চলি আমাদের জীবনের পরিধি। এই নাগরিক অবসাদ আসলে এক ধরনের নীরব দহন, যেখানে মানুষ নিজের চেনা গণ্ডির ভেতরেই প্রবাসী হয়ে যায়, হয়ে পড়ে আগন্তুক।
৬. 
এই যান্ত্রিক শহরের আধুনিক স্থাপত্যের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। বহুতল ভবনগুলোর কাচ, ইস্পাত আর কংক্রিটের জ্যামিতিক নিখুঁত বিন্যাস বাইরে থেকে এক ধরনের চরম স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু দিন শেষের এই তির্যক আলো যখন সেই দেয়ালগুলোতে ঠিকরে পড়ে, তখন তার ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা নগ্ন হয়ে বেরিয়ে আসে। প্রতিটি চারকোনা ফ্ল্যাট যেন একেকটি আধুনিক কফিন, যার ভেতরে এক বা একাধিক মানুষ তাদের নিজস্ব বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বেঁচে আছে। এই কাঠামোগত জাঁকজমকের নিচে চাপা পড়ে আছে এক গভীর আত্মিক দারিদ্র্য।
আমরা যত উঁচুতে উঠছি, আমাদের ভেতরের শূন্যতার গভীরতাও তত যেন বাড়ছে। এই গোধূলির আলোয় কাচের দেয়ালগুলো প্রতিবিম্ব তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু তারা কোনো গভীরতাকে স্পর্শ করতে পারে না। মানুষের তৈরি এই যান্ত্রিক শহর আমাদের শরীরকে আশ্রয় দিলেও আমাদের মনকে এক অন্তহীন যাযাবর বৃত্তে নির্বাসিত করেছে। বিকেলের এই আলোয় সেই জ্যামিতিক অবয়বগুলো তাদের সমস্ত কৃত্রিম গাম্ভীর্য হারিয়ে স্রেফ কিছু প্রাণহীন কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, যা মানুষের অভ্যন্তরীণ নিঃসঙ্গতাকে আরও তীব্রভাবে বিদ্ধ করে।
৭. 
ডব্লিউ. বি. ইয়েটস তাঁর ‘The Lake Isle of Innisfree’ কবিতায় লিখেছিলেন: “And evening full of the linnet’s wings.” হাঁসফাঁস করা আমাদের এই কংক্রিটের অরণ্যে লিনেট পাখির ডানা নেই, আছে যান্ত্রিক কবুতরের ওড়াউড়ি আর এসির বাইরের ইউনিটের একটানা ঘড়ঘড় শব্দ। তবুও হৃদয়ের ভেতরের যে নির্জনতা, তা সেই ইননিসফ্রি দ্বীপের মতোই খাঁ খাঁ করে। জগতের সমস্ত ব্যস্ততা বিকেলবেলা এসে এক বিশাল মন খারাপের চেহারা নিয়ে হাজির হয়। মানুষ কেন এত ছুটছে? কেন এত সঞ্চয়? দিন শেষে তো সেই একই একাকিত্ব, যা জানালার গ্রিল গলে ঘরের মেঝেতে এসে ছায়ার দৈর্ঘ্য বাড়ায়।
বিকেলের শেষ রোদটুকু যখন পাশের বহুতলের কার্নিশ থেকে বিদায় নেয়, তখন এক ধরনের স্বস্তি আসে। কারণ, অন্ধকার স্পষ্ট। অন্ধকারের একটা নির্দিষ্ট চরিত্র আছে– সে কালো, সে গভীর। কিন্তু বিকেলের এই আলো-আঁধারির দোলাচল মানবমনকে ভীষণ আন্দোলিত করে। এটা এক ধরনের ট্রানজিশন বা রূপান্তর। দিন এবং রাতের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের চলমান জীবনপথে বিকেল পথের এক প্রান্ত। 
মন খারাপের বিকেল কোনো অসুখ নয়, এটি মানুষের ভেতরের সেই চিরন্তন বিষাদ–যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা এখনও অনুভব করতে পারি, জগতের আপাত অর্থহীনতার মাঝেও এক গভীর অর্থের সন্ধান করে চলতে পারি। আর তাই আবারও কবিগুরুর কাছে আশ্রয় খুঁজে ফিরি : ...এল আঁধার ঘিরে, পাখি এল নীড়ে,/ তরী এল তীরে/ শুধু আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো/ ওগো দুখজাগানিয়া।/… তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ/ ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া… 

আরও পড়ুন

×