ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৃষ্টিসুখের উল্লাস

অবিস্মরণীয় ‘বিদ্রোহী’

অবিস্মরণীয় ‘বিদ্রোহী’
×

কাজী নজরুল ইসলাম [১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬, ২৪ মে ১৮৯৯–১২ ভাদ্র ১৩৮৩, ২৭ আগস্ট ১৯৭৬] -প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

মারুফ রায়হান

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

পীড়নপিষ্ট, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত অবমানিত বিহ্বল বিপন্ন মানবগোত্রের সম্মিলিত শিল্পসম্মত মানবিক ইশতেহার বিদ্রোহী কবিতা। জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই একটি কবিতা পাঠের ও শ্রবণের সুবাদে কবিকথিত স্বপ্নমথিত ‘বাংলাদেশ’ নামের সবুজ একটি দেশের সকল প্রান্তে সব শ্রেণিপেশার মানুষ কবিকে তাদের হৃদয়াসনে চির-অধিষ্ঠিত করেছে। 
বিদ্রোহী কবিতায় বিচিত্র বিবিধ ব্যঞ্জনা, ছন্দের সানন্দ সপ্রাণতা, মধ্যমিলের ম্যাজিক, অন্ত্যমিলের অন্তরদোলানো মিউজিক, অনুপ্রাসের অনুরণন– সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব শিহরণ, আদ্যোপান্ত ঝঙ্কার। এমনটি না হলে কবিগুরু কি আর কবিকণ্ঠে কবিতাটি শুনে তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিতেন! 
১৯২১ সালের ডিসেম্বর, ক্রিসমাসের রাত। কলকাতার ৩/৪সি, তালতলা লেনের একটি বাড়িতে বসে কাঠ পেন্সিলে এই কালজয়ী কবিতা লেখেন সদ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধফেরত বাইশ বছরের যুবক নজরুল। খুব সম্ভবত বিদ্রোহী কবিতা প্রসঙ্গে যত লেখালেখি হয়েছে, বাংলা ভাষার অন্য কোনো কবিতা নিয়ে তার এক-দশমাংশও হয়নি। বহুল প্রচারিত একটি বিষয়ের উল্লেখ করছি আজকের নবীন পাঠকের জন্য।
‘এ কবিতায় হিন্দু-মুসলমান দুজনেরই এত পুরাণ প্রসঙ্গ ঢুকেছে যে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি একে রাজদ্রোহ বলে চিহ্নিত করতে পারল না। কখনও ঈশান-বিষাণের ওঙ্কার বাজছে, কখনওবা ইস্রাফিলের শিঙ্গা থেকে উঠছে ঝঙ্কার। কখনওবা হাতে নিয়েছে মহাদেবের ডমরু-ত্রিশূল, কখনওবা অর্ফিয়াসের বাঁশি। কখনও বাসুকীর ফণা জাপটে ধরেছে। কখনওবা জিব্রাইলের আগুনের পাখা, কখনও চড়েছে তাজি বোরাক (পক্ষীরাজ ঘোড়া),-কে কখনওবা উচ্চৈঃশ্রবায়। একে রাজদ্রোহ বলতে গেলে ধর্মের ওপরে হাত দেওয়া হবে।’– জৈষ্ঠ্যের ঝড়, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত 
২.
বিদ্রোহী কবিতা একা একা পড়বার নয়, নয় কানে কানে কাউকে শোনানোরও। এ হলো লোকসমাজের কবিতা। এক নবজাগরণের উচ্চকিত উত্তুঙ্গ উৎসবের। শুধু কি বঙ্গসমাজের? কবিতা কালের পরিচয়বাহী হয়েও হতে পারে কালোত্তীর্ণ। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে উঠতে পারে সমগ্র গ্রহের। যদিও বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাতে এ কবিতার অনুবাদ দুরূহ। না, অসম্ভব বললেই যথার্থ হবে। বাংলা যার মাতৃভাষা, কবিতা যাকে স্পর্শ করে পরমপ্রিয় স্বজনের ওষ্ঠস্পর্শের মতোই, বাংলায় যিনি স্বপ্ন দেখেন এবং বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন, বাঙালি সমাজেই বসবাস করেন– এমন যে কেউ, যদি তিনি হোন অক্ষরজ্ঞানবঞ্চিতও, তবু তাকে এ কবিতার সঠিক পাঠ (শব্দের ওজন ও মাত্রা এবং ছন্দ ও পর্ববিভাজন বুঝে) এক উদ্দীপিত সাহসী, প্রতিবাদী দ্রোহী সত্তায় রূপান্তর ঘটাবে, ক্ষণকালের জন্যে হলেও। শিল্পশাখার সবচেয়ে শুদ্ধ সংবেদী কবিতা নামের মাধ্যমটিরই যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত স্বকীয় শক্তি রয়েছে, যা ইতিহাসের জননায়কের আহ্বানের মতোই অর্থপূর্ণতায় সমর্পিত করে, সম্পূর্ণ সমর্থন জোগায়, তারই প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত এ কবিতা। 

বিদ্রোহী কবিতা নিজেকে নিজে কিংবা সম্মুখস্থ স্বজাতিকে শোনাতে শোনাতে নিজেকে উন্মাদই তো মনে হবে; তুরীয়ানন্দে, মুক্ত জীবনের আনন্দে, বাধা না মানা এক মোহন পরম উন্মাদ। কবিতায় অবশ্য মাত্র দুবার উচ্চারিত হয়েছে– আমি উন্মাদ আমি উন্মাদ। উন্মাদ বিনা প্রচল পঙ্কিল আগ্রাসী স্বৈরস্বভাবী শাসন-শোষণের অত্যাচারী সিংহাসনে কী উপায়ে শব্দের চাবুক চালানো সম্ভব! মানবের সুন্দরতম স্বাধীন সত্তার প্রতিপক্ষ তো কেবল কোনো সাম্রাজ্যবাদী কুটিল নিষ্ঠুর রাষ্ট্রের ধ্বজাধারী নয়, কখনওবা স্বয়ং ঈশ্বরও বটেন; কবির ভাষায় শোক-তাপ হানা খেয়ালি বিধাতা। বাংলার বীর (কিংবা স্বয়ং কবি) তাই ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভগবান-বুকে কবি-কথিত বীর তাই এঁকে দেন পদচিহ্ন।
বিদ্রোহী কবিতার বহুসঞ্চারী বয়ানের উপসংহার-বার্তা হিসেবে এই দুটি চরণকে চিহ্নিত করলে ভুল হবে না। 
আমি     বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি     খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
মুক্ত প্রবহমান মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা এ কবিতায় আশ্চর্য অভিনব কিছু অন্ত্যমিল আমরা সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করি, যা বাংলা কবিতাবিশ্বে অনন্য হয়ে আছে। এ কবিতায় (যেমন, শির/ জয়শ্রীর, আইন/ মাইন, হিন্দোল/ তিন দোল, মন যা/ ঝঞ্ঝা, দুর্মদ/ মদ, সৈনিক/ গৈরিক, বহ্নি/ ধন্যি, সত্য/ মর্ত্য, প্রভৃতি) তবু উদ্ধৃত অংশে চিহ্নের সঙ্গে সহজাত স্বতঃস্ফূর্ত সহজ সংকলিত ‘ছিন্ন’ শব্দটির প্রয়োগ না করে তিনি করেছেন ‘ভিন্ন’ শব্দ, যা নিশ্চিতরূপেই ভিন্নতা ও ঋজুতা এনেছে উপসংহারে। বীর কর্তৃক ভগবানের বক্ষ ছিন্নভিন্ন করার চিত্রকল্পই পাঠকের বোধে অনুরণন তোলে।   
চির-বিদ্রোহী বীরের এই বিবৃতিটিও পাঠককে স্মরণে রাখতে বলি:
 আমি   রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
  ভয়ে    সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
  আমি   বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
বিদ্রোহ-বাহী বীরের রোষে সাতটি নরকের আগুন কেঁপে নিভে নিভে যায়– এমন অত্যাশ্চর্য চিত্রকল্পটি নজরুলই প্রথম কবিতাজগতে উপস্থাপন করলেন।
৩.
করাচিফেরত হাবিলদার নজরুল কলকাতায় এলেন, যেন ভিন্ন মানুষ। কিন্তু বিদ্রোহী, কামাল পাশা, ভাঙার গান-এর মতো কবিতা লিখতে লিখতে পুরো মানুষটাই যেন আবার বদলে গেলেন, স্বরূপে ফিরলেন। তাঁর কবিতায় ঘটে গেল আশ্চর্য রূপান্তর। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কে আগে পত্রিকায় প্রকাশ করবেন, এ নিয়ে মজার বিবরণ পেয়েছিলাম বিনোদ ঘোষালের তিন খণ্ডে লেখা নজরুলের জীবননির্ভর উপন্যাস ‘কে বাজায় বাঁশি’-তে। সংক্ষেপে জানাই: ইতিহাসে লেখা আছে ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি, বিজলী পত্রিকায় কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। অথচ এটি মোসলেম ভারত পত্রিকায় ছাপানোর জন্য সম্পাদক আফজালুল হক কবির কাছ থেকে নিয়ে যান রচনার পরের দিনই। সে সময়ে মোসলেম ভারত পত্রিকাতেই নজরুলের বেশির ভাগ লেখা ছাপা হতো। তাহলে কীভাবে সেটি গেল বিজলীর দপ্তরে! বিদ্রোহী লেখার ক’দিন বাদে বিজলীর অন্যতম সম্পাদক নলিনীকান্ত সরকার নজরুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। বিদ্রোহী কবিতাটি তাঁকে পড়ে শোনাতে চান কবি। প্রখ্যাত নাট্যকার ক্ষিরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের সঙ্গে কবির আলাপ ছিল না। তিনি জানতেন কবির সঙ্গে নলিনীবাবুর খাতির রয়েছে, তাই একদিন তাঁর বাসায় নিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তাঁকে। নলিনী দেখলেন এটাই সুযোগ। তিনি কবিকে বললেন, চলো ওখানে গিয়ে দুজনে শুনব তোমার কবিতা। 
এরপর সে-বাড়িতে কবিকণ্ঠে বিদ্রোহীর পাঠ শুনে সেটি ছাপানোর আকুলতা প্রকাশ করলেন নলিনী। কবি জানিয়ে দিলেন কবিতাটি মোসলেম ভারতে ছাপা হচ্ছে। চতুর নলিনীকান্ত তৎক্ষণাৎ কবির কাছ থেকে হাতে লেখা কবিতার কপিটি চেয়ে নিয়ে মোসলেম ভারত পত্রিকার কার্যালয়ে যান কবিকে সঙ্গে করেই। আফজাল সাহেবকে অনুরোধ করেন বিদ্রোহী কবিতা তাঁকে ছেড়ে দিতে। সেটি সম্ভব নয় বলে আফজাল ছাপানো ফর্মার কপি দেখান নলিনীকে। এরপর গল্প জমে ওঠে। একফাঁকে চতুর নলিনী ছাপানো ওই ফর্মা থেকে আসন্ন মোসলেম ভারত সংখ্যার কজন লেখক ও তাদের লেখার শিরোনাম টুকে নেন। এরপর বিজলীর কার্যালয়ে গিয়ে প্রকাশিতব্য মোসলেম ভারত পত্রিকার আলোচনা লেখেন এবং নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে পুরো কবিতাটিই ছাপিয়ে দেন। এই ছলচাতুরির কারণে একদিকে যেমন বিদ্রোহী কবিতা প্রথম প্রকাশের দাবিদার হলো বিজলী, তেমনি দু’দফায় মোট ২৯ হাজার কপি ছাপানোর সুবাদে বিপুল ব্যবসায়িক মুনাফাও অর্জিত হলো। মুজাফফর আহমদের অভিমত, সে সময় কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ বিদ্রোহী পড়েছিল। এক অবিস্মরণীয় ঘটনা বটে!
৪.
এখনও পৃথিবীতে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদ পুঁজিবাদ বর্ণবাদ– উত্তরাধুনিক রূপেই বিদ্যমান এসব, আছে ত্রাস গুমখুন, আছে বাকস্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরা। তাই এশিয়ায় আফ্রিকায় ইউরোপ আমেরিকায়, আমরা চাইছি নতুন দিনের নজরুল, দ্রোহের নতুন কবিতা। অবশ্যই শত বছর আগের বিদ্রোহ কবিতাটিই সেটির ভিত্তি রচনায় প্রেরণা জোগাবে। এমনভাবে ভাবতে পারার জন্য কাজী নজরুলই আমাদের আহ্বান করছেন যেন।  
ইতি টানার আগে বলি, এ কবিতা আর কিছু নয়, আরাধ্য কাঙ্ক্ষিত বীরেরই চিত্রায়ণ। বীরকে আহ্বান করছেন কবিই। যদিও শেষ পঙ্‌ক্তিতে ‘একা’ বীরের কথা বলা হলেও, এই বীর শুধু কবি নজরুলের বিদ্রোহী-বীর সত্তাই নয়, এটি কবির স্বদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী মুক্তসত্তার মানবের অন্তর্গত বীরেরই দর্পিত-স্পর্ধিত অনন্য উদ্ভাসন। প্রতিটি কবিতার জন্মের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট, কবিহৃদয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের অভিঘাত এবং গভীর অনুভূতির সম্মন্ধ থাকে। পরাধীন দেশে পশ্চাদপদ সমাজে বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন নির্যাতনের বাস্তবতায় বিদ্রোহী কবিতার জন্ম হয়েছে বটে, কিন্তু আজ শত বছর পেরিয়ে আমরা স্পষ্টত অনুভব করে উঠতে পারছি যে, কবিতাটি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন ও সর্বকালীন। এটি নিষ্পিষ্ট আহত মানবের সুপ্ত বীরসত্তারই সুতীব্র অমোঘ উচ্চারণ। কবিতাটিকে এখন আর কেবল বাঙালির অনিবার্য উপলব্ধি হিসেবে দেখলে চলে না, এটির অন্তর্নিহিত ভাষ্য ও বার্তা পৃথিবীর যে কোনো ভাষার প্রকৃত মানুষের আত্মস্বর হয়ে ওঠার দাবি রাখে।
বাংলা সাহিত্যে নজরুল হলেন প্রকৃত সব্যসাচী; তাঁর ‘বিদ্রোহী’ এক অবিনাশী অনিরুদ্ধ কবিতাশক্তিরই উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। 

আরও পড়ুন

×