‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানের শতবর্ষ
কাজী নজরুল ইসলাম
বিশ্বজিৎ ঘোষ
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলা কবিতা ও কাব্যগীতির অঙ্গনে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভার নাম কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। নবজাগ্রত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির চৈতন্যের সাগরমন্থন শেষে বাংলা সাহিত্যে তাঁর উজ্জ্বল আবির্ভাব। উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত অন্তর্দ্বন্দ্বময় সমাজপ্রবাহে কাজী নজরুল ইসলাম আবির্ভূত হন পরাক্রমশালী বিদ্রোহী ভূমিকায়। উনিশ শতকে বাঙালির সীমাবদ্ধ নবজাগরণকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন সচেতনভাবে; জনমূলসংলগ্নতা তাঁর কবিচৈতন্যে এনেছিল নতুন মাত্রা। নজরুল ইসলাম মূলত রোমান্টিক কবি। রোমান্টিসিজম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনায়। রোমান্টিক অনুভবে নজরুল প্রত্যাশা করেছেন সুষম সুন্দর কল্যাণময় সমাজ। তাই তিনি বিদ্রোহ করেছেন অন্যায় অসত্য আর অসুন্দরের বিরুদ্ধে; কবিতা ও গানে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, সামন্তপ্রথা শাস্ত্রাচার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। নজরুলের আশ্চর্য বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর সমস্ত জাতিকে লোকপুরাণের সোনার কাঠির স্পর্শে মুহূর্তেই উজ্জীবিত করেছে, করেছে সন্দীপিত। অত্যাচার, উৎপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী পুরুষ হিসেবে, স্বাধীনতার সপক্ষে মুক্তি আন্দোলনের তূর্যবাদক সেনানী হিসেবে, সর্বোপরি নিপীড়িত মানবতার কবি হিসেবে তিনি হয়েছেন নন্দিত, পেয়েছেন বরমাল্য।
কবিতার মতো সংগীতেও নজরুল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের বাণী, সাম্প্রদায়িক হানাহানির বিরুদ্ধে জানিয়েছেন মিলনের আহ্বান। এ প্রেক্ষাপটে ঠিক একশ বছর পূর্বে রচিত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানটির কথা বিশেষভাবে স্মরণীয়। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানটি লেখা হয়েছে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৬ জ্যৈষ্ঠ। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। গানটির পাদটীকায় উল্লেখ ছিল যে গানটি কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক সম্মিলনীতে গীত। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২২ মে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন-সংগীত রূপে কবি কর্তৃক গানটি গীত হয়েছিল। অভিন্ন বছরের আশ্বিন মাসে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানটি কবি-কৃত স্বরলিপিসহ মাসিক কালি-কলম সাময়িকীতে মুদ্রিত হয়।
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানের পাঠকৃতি অনুধাবনের জন্য এটি রচনার পরিপ্রেক্ষিত একবার দেখে নেওয়া যায়। ব্যক্ত হয়েছে যে, ১৯২৬ সালের মে মাসে কৃষ্ণনগরের কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে বসে এই সম্মেলন। ভারতীয় কংগ্রেসের এই প্রাদেশিক সম্মেলনে দক্ষিণপন্থি ও সাম্প্রদায়িক শক্তির চাপে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (১৮৭০-১৯২৫) ‘হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট’ বা ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ বাতিল করা হয়। ওই প্যাক্টে মুসলিম সমাজকে কতিপয় রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেসের উগ্রপন্থি হিন্দুদের চাপে সম্মেলনে চিত্তরঞ্জন দাশের ‘হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট’ বাতিল করা হয়। এর ফলে কংগ্রেসের হিন্দু ও মুসলমান সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ ও মনোমালিন্য দেখা দেয়। নজরুল তখন বাস করেন কৃষ্ণনগরে। ঘটনা শুনে তিনি তাৎক্ষণিক গানটি রচনা করে সম্মেলন-মঞ্চে হাজির হন এবং দিলীপ কুমার রায় ও তাঁর সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় নজরুল স্বকণ্ঠে গানটি পরিবেশন করেন।
সাম্প্রদায়িক শক্তির মনোমালিন্য ও হানাহানির প্রেক্ষাপটে রচিত নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গান একটি ঐতিহাসিক নির্মাণ। গানটির মাধ্যমে নজরুল সাম্প্রদায়িক শক্তিতে আঘাত করতে চেয়েছেন। দুই অপশক্তিকে থামাতে তিনি সেদিন উচ্চারণ করেছিলেন বহুশ্রুত প্রবাদপ্রতিম এই পঙ্ক্তিমালা:
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,
কাণ্ডারী। আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!
সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে নজরুল এখানে মানবতার অস্ত্রহাতে রুখে দাঁড়িয়েছেন। নজরুল হিন্দু-মুসলমান– উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মানবতাবোধ জাগরণের স্বপ্ন দেখেছেন এবং সে আকাঙ্ক্ষায় একের পর এক কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন সংগীত। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় সাম্যবাদী কাব্যের এই পঙ্ক্তিমালা: ‘মানুষেরে ঘৃণা করি’/ ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি’/ ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,/ যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।/ পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল!– মূর্খরা সব শোনো,/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ;– গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!/ আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ/ কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,– বিশ্বের সম্পদ,/ আমাদেরি এঁরা পিতা, পিতামহ– এই আমাদের মাঝে/ তাঁদেরি রক্ত কম-বেশি ক’রে প্রতি ধমনীতে রাজে!’ (‘মানুষ’/সাম্রবাদী)।
কেবল সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে নয়, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানটিতে নজরুল উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধেও তাঁর সাহসী অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। নজরুল ছিলেন ঔপনিবেশিক শক্তির ঘোর শত্রু।
ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কবিতা লিখে তিনি এক বছর কারাগারে দিন কাটিয়েছেন– তবু তিনি মাথা নত করেননি। তাঁর কবিতার বই একের পর এক বাজেয়াপ্ত হয়েছে, তবু ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর কলম স্তব্ধ হয়নি। বক্ষ্যমাণ কাব্যগীতিতেও দেখি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কলম হাতে তিনি দাঁড়িয়েছেন। এভাবে:
কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালির খুলে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙ্গিয়া পুনর্বার।
উদ্ধৃতাংশে স্পষ্ট যে, নজরুল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন এবং বাঙালির সম্মিলিত আত্মত্যাগের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে একদিন মুক্তি আসবে– পূর্বদিক থেকে আবার উঠবে স্বাধীনাতার লাল সূর্য। ব্যক্ত হয়েছে যে হিন্দু-মুসলমানের মনোমালিন্য ও হানাহানির প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে আলোচ্য গান। নজরুল উভয় পক্ষকে এক করার জন্য একটা সাধারণ শত্রুর কথা এখানে বলেছেন, যাতে নিজেদের মধ্যকার ভেদ ভুলে গিয়ে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে তারা অভেদসত্তায় সংহত হতে পারেন, ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে।
ঔপনিবেশিক শক্তি বা কলোনাইজারদের শোষণ দৌরাত্ম্য ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে উপনিবেশিত মানুষদের প্রতিরোধচেতনার প্রকাশ হিসেবে নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানের রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয়– সকল ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে উপনিবেশগুলোকে, উপনিবেশের মানুষগুলোকে। নেটিভদের স্বকীয়তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে চেয়েছে ঔপনিবেশিক শক্তি– স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে নেটিভদের দ্রোহী কণ্ঠস্বর। এ প্রেক্ষাপটেই বিশেষভাবে তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গান। উত্তর- ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে এই গানকে। উপনিবেশ বা উপেনিবেশ-উত্তর কালখণ্ডে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে উপনিবেশবাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধেই উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের আলোচ্য বিষয়। এডওয়ার্ড সাইদ যে ‘প্রতিরোধের সাহিত্যে’র কথা বলেছেন, বিল অ্যাশক্রফট উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের যে বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন, কিংবা এলিয়েকে বোহেমার নির্দেশ করেছেন উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অন্তর্গত যে দ্রোহীভাব– নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানে তার স্পষ্ট প্রকাশ দেখতে পাই। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে ভেদ ভুলে অখণ্ডসত্তায় দ্রোহী হয়ে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য নজরুল লিখেছেন:
কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর,
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙ্গিয়া পুনর্বার।
–এখানে স্পষ্ট যে ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য নজরুল স্বাধীনতার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য, প্রতিরোধের দেয়াল সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন শক্তির। তরুণ সমাজের কাছে তিনি এই শক্তির আধার খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। তরুণ জোয়ানরাই পারে প্রতিরোধের দেয়াল সৃষ্টি করতে। তাই নজরুল স্বাধীনতার জন্য প্রতিরোধের জন্য তরুণদের কাছে জানান এই আহ্বান:
‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার!
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ,
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।।
তরুণ সমাজের প্রতি নজরুলের বিশ্বাস ছিল অগাধ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তরুণরাই পারবে প্রতিরোধের দেয়াল তুলতে, তরুণরাই সক্ষম হবে প্রতিরোধ-সংস্কৃতির বাতাবরণ নির্মাণে। উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে নজরুলের সে-বিশ্বাসেরই ভাষিক বয়ান চিত্রিত হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গান, প্রকৃত অর্থেই এক ঐতিহাসিক সৃষ্টি। শতবর্ষ পরেও এই গানের প্রাসঙ্গিকতা আজও অমলিন। যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, যখনই উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠবে উগ্র– তখনই নজরুলের এই গান হবে প্রতিরোধের তীক্ষ্ম হাতিয়ার– ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!’ গানের এখানেই অব্যাহত প্রাসঙ্গিকতা।
- বিষয় :
- গল্প
- গান
- কাজী নজরুল ইসলাম