ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মৃতিগন্ধী শিউলিমালা

স্মৃতিগন্ধী শিউলিমালা
×

উম্মে ফারহানা

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০১১ সালের মার্চ মাসে আমি যখন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম গেলাম আমার এক বন্ধুর সঙ্গে, তখনও সেখানে শিউলিমালা নামের ছাত্রী হলটি ছিল না; মেয়েদের জন্য ছিল দোলনচাঁপা আর ছেলেদের জন্য অগ্নিবীণা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এখন আমার কর্মক্ষেত্র। যেসব বাসে করে ক্যাম্পাসে যাই সেগুলোর নাম ঝিঙেফুল, সাম্যবাদী, বাঁধনহারা। খেতে গেছি চক্রবাক ক্যাফেতে। অনুষ্ঠান দেখেছি ‘গাহি সাম্যের গান মঞ্চে’। একাডেমিক ভবনগুলোর সেভাবে কোনো নাম না থাকলেও অতিথি ভবনের নাম দেওয়া হয়েছে সেতুবন্ধ। ছেলেদের দ্বিতীয় হলটি এখন বিদ্রোহী। এখন মেয়েদের জন্য আরেকটি বড় আবাসিক ভবন হয়েছে– যার বর্তমান নাম ‘শিউলিমালা’। 
নজরুলের লেখার সঙ্গে বাংলাদেশের সবার পরিচয় হয়ে যায় অতি শৈশবেই, ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ কবিতার মাধ্যমে। এরপর একে একে প্রতিটা শ্রেণিতেই নজরুলের কোনো না কোনো লেখা আমাদের পাঠ্য ছিল। কিন্তু ‘শিউলিমালা’ নামের গল্পটি আমি আগে পড়িনি। বহু আগে বিটিভিতে নজরুলের জন্মদিন উপলক্ষে প্রদর্শিত হয়েছিল এই নামের একটি এক পর্বের নাটক। অত আগে দেখা নাটকের ঘটনাও কিছু মনে ছিল না। শুধু একটা দৃশ্য একটুখানি মনে পড়ে, একজন মানুষ শিউলি ফুলের একটি মালা নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। মূল গল্পটি পড়তে গিয়ে আমি বেশ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলাম; ইংরেজিতে যাকে বলে নস্টালজিক। 
সাহিত্য বিভাগে শিক্ষকতা করার বড় এক বালাই হচ্ছে যে কোনো আলোচনা বড় বেশি তাত্ত্বিক হয়ে যায়। শিউলিমালা গল্পটিকে ব্যবচ্ছেদ করতে গেলে আজহার নামের অবিবাহিত ব্যারিস্টারের বয়ানে একটি মিষ্টি প্রেমের কাহিনি গল্প হিসেবে কতটা সার্থক হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তর আলাপ করা যেতে পারে। গল্পের ভেতর ব্যবহৃত সংলাপগুলো কত সরেশ ছিল, কত মসৃণ গতিতে গল্পটি এগিয়েছে আর গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে পাঠকের আগ্রহ ধরে রেখেছে সেসব নিয়েও বিস্তর আলাপ করা যায়। সাহিত্যের শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় আমরা আসলে তা-ই করি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে ‘নজরুল স্টাডিজ’ নামের একটি কোর্স অবশ্যপাঠ্য। সেই কোর্সে এই গল্প আছে কিনা তা আমার জানা নেই; থাকলেও গল্পটি কীভাবে পড়ানো হয় সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। 
শিউলিমালা গল্পটি আমার কাছে নিখাদ একটি স্মৃতির আধার বলে মনে হয়েছে। শুধু এ জন্য নয় যে এটি বহু আগে লেখা, বলেছে এমন এক সময়ের কথা যে সময়কে আমরা দেখিনি কখনও। বরং এ জন্য যে কেন্দ্রীয় চরিত্র আজহার যেভাবে জীবনের একটা বিশেষ স্মৃতিকে ধরে রেখেছেন, যেভাবে শিউলি নামের নারীটিকে স্মরণ করে তাঁর প্রতি প্রেমকে জীবিত রেখেছেন তেমন হয়তো আমরা অনেকেই করতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি। প্রথম যৌবনের কিছু মুগ্ধতামিশ্রিত ভালো লাগা, এমন কিছু রোমান্স যা কখনও পরিণত প্রেমের সম্পর্কে পৌঁছায়নি অথচ হয়ে গেছে সম্পর্কের চেয়ে ঢের বেশি। সেসব ঘটনাকে জীবনে ধরে রাখা হয়ে ওঠে না সেভাবে। নজরুলের এ গল্পটি পড়ার পর পাঠকের মনে সেসব স্মৃতির দুই-এক টুকরো ভেসে আসবে নিশ্চিতভাবেই। 

নজরুলকে আমরা জানি বিদ্রোহী কবি হিসেবে। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি দুরন্ত আমি দুর্বার আমি ভেঙে করি সব চুরমার’ কিন্তু একই কবিতায় আবার বলেছেন, ‘আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুক্ষণ/আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাকন চুড়ির কন-কন।’ শিউলিমালা গল্পে আমরা নজরুলের বিভিন্ন স্বত্বার একটিকে খুব প্রাঞ্জলভাবে দেখি। যে নজরুল নিজেকে বলেছেন ‘তন্বী নয়নে বহ্নি’ কিংবা ‘ষোড়শীর হৃদে সরসিজ প্রেম উদ্দাম’– সেই নজরুলকে যেন খুঁজে পাওয়া যায়।  আজহারের সঙ্গে শিউলির প্রথম দেখা হওয়ার সময় তার পরণে কী ছিল তা কি মনে আছে? আমি মনে করিয়ে দিই, ছিল একটি গোধূলি রঙের শাড়ি।  আমাদের প্রচলিত জ্ঞানে গোধূলি রং বলে কোনো রং হয় না, গেরুয়া বা গৈরিক বরণ যদিও আছে। যেভাবে আজহার আর শিউলির গল্প এগোয় সেটি পড়তে পড়তে মনে হয় এই গল্পের লেখক কি আদৌ কোনো দাবানল-দাহ কিংবা ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুংকার? 
এ সময়ের পাঠকদের জন্য এরকম গল্প পড়ে তা অনুধাবন করা আদৌ সম্ভব হবে কিনা তা আমি অনুমান করতে পারি না। ইদানীং নর-নারীর সম্পর্কে প্রেমের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘সম্পর্ক’ ব্যাপারটিই। আজহারের জন্য একতরফা ছিল না সেই প্রেম, সে রকমভাবে কোনো বাধা না এলেও আজহার আর শিউলির মন দেওয়া-নেওয়া সম্পর্কে গড়ালো না। অথচ প্রেম রয়ে গেল। একালে ঘটে ঠিক উলটো। যুবক-যুবতীরা সম্পর্কিত হন, এই যুগের ভাষায় ‘রিলেশনশিপে’ থাকেন। সেই সম্পর্কের মেলা ধরন আছে– হয় তা ক্যাজুয়াল, নইলে সিরিয়াস, কখনও সিচুয়েশনশিপ, কখনও ফ্রেন্ডস উইদ বেনিফিট, কখনও কমিটেড, কখনও কমপ্লিকেটেড। সম্পর্কটি কী রকম তা নিয়ে সবাই যতটা সচেতন সম্পর্ক যে অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, সেই অনুভূতিটি নিয়ে অত কথা হয় না। যেন অনুভূতি নয়, সম্পর্কটিই সবচেয়ে জরুরি। আজহার বা শিউলির মতো কোনো সম্পর্কই হলো না অথচ মনে রয়ে গেল শুধু কিছু মুহূর্তের স্মৃতি, এও কি সম্ভব এই যুগে?  সম্ভবত না। 
যুগের আবর্তনে নারী-পুরুষের মধ্যকার রসায়ন বিভিন্ন বিবর্তনের মধ্যে গেছে। সামাজিক রীতিনীতি আর মূল্যবোধের পরিবর্তনের জন্যই হোক আর প্রযুক্তির ভয়ানক ঊর্ধ্বগতির কারণেই হোক, আজকালের ছেলেমেয়েদের মেলামেশা এবং বন্ধুত্ব আর প্রেমের ধরন-ধারণ একেবারেই আলাদা।  শিউলিমালা গল্পের চরিত্রদের কিংবা তাদের কোমল অনুভূতিকে অনুভব করতে পারা এই প্রজন্মের জেন-জিদের জন্য কিছুটা কঠিন হলেও আমাদের মতো মিলেনিয়ালদের জন্য ততটা নয়। কেননা আমরাও বড় হয়ে উঠেছিলাম যখন কিছুটা রোমান্টিসিজম অবশিষ্ট ছিল, তাই ‘ও যেন স্পর্শাতুর কামিনী ফুল– আমি যেন ভীরু ভোরের হাওয়া– যত ভালোবাসা, তত ভয়! ও বুঝি ছুঁলেই ধুলায় ঝরে পড়বে’ ধরনের অনুভূতি আমাদের কাছে কিছুটা হলেও অনুভবযোগ্য। বর্তমান যুগের পাঠক এমন কোমলতার সঙ্গে পরিচিত কিনা তা আসলে আমি ঠিক জানি না। 
শিউলিমালাকে একটি নিছক প্রেমের গল্প হিসেবে পড়লেও আরও কিছু উপাদান চোখে পড়ে, যেখানে নজরুলকে ভিন্নভাবে দেখা যায়। গণমানুষের কথা বলা, বঞ্চিত-নিপীড়িতের পক্ষে দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠানের নিকুচি করে শাসকের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বিদ্রোহীর রণ তূর্য হাতে নেওয়া কবি এখানে বলেছেন এক এলিট শ্রেণির কথা; যেখানে নায়িকা দাবা খেলে, নায়ক বিলেতফেরত। গল্পের শুরুতেই চরিত্রেরা আলাপে মাতেন গ্র্যান্ডমাস্টারদের নিয়ে। অনেকটা ইউরোসেন্ট্রিক কিংবা অ্যাংলোফাইল কলোনাইজড বাঙালি সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায় যেন। 
শিউলিমালা নামটির মধ্যেই অদ্ভূত এক মাদকতা আছে। শরতে যে শিউলি ফোটে তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর আর ক্ষণস্থায়ী। নায়িকার নামকে ব্যবহার করেই দুই নর-নারীর মধ্যকার কোমল আর সংবেদনশীল এক হৃদয়ঘটিত আদান-প্রদানের গল্প বলেছেন নজরুল। একে ভালোবাসা হিসেবে স্বীকার করে নিতে বাধেনি নায়কের, যদিও সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও সুদূর পরাহত ছিল। আজকের যুগে সম্পর্ক হয়, ভাঙে, কখনও জোড়া লাগে, কখনও নতুন কারও সঙ্গে নতুন কোনো সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে যায়। সেই সম্পর্কগুলোয় ভালোবাসা থাকে কিনা তাও আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই গল্পে সেই সময়কে দেখা যায় যখন ভালোবাসাও খুব প্রাকৃতিক আর অনায়াস ছিল, সম্পর্ক অনিশ্চিত হলেও অনুভূতি ছিল মোহময়। এই গল্প কৈশোরের স্মৃতির মতো কোমলতা এনে দেয় পাঠকের মনে। তাকে নিয়ে যায় এক পুরোনো দিনে, যে দিন আর কখনোই ফিরে  পাওয়া যাবে না। 

আরও পড়ুন

×