ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

করি না কাহারে কুর্নিশ

করি না কাহারে কুর্নিশ
×

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সময়ের প্রবহমানতায় আমরা প্রতিবার নতুন জনমকে উপলব্ধি করি, যখন সেই ধেয়ে চলা সময়ে কোনো কবি, দার্শনিক আমাদের কানে ধ্বনি তোলে মুক্তির, স্বাধীনতার। নির্ভীকচিত্তে সে যখন আমাদের এক মন্ত্রে উজ্জ্বীবিত করে ডাক দিয়ে বলে–গাও মানব প্রেমের জয়গান। আমরা তখন শিখে যাই সামনে এগোনোর শপথই মানবজীবনের মূল স্তরে পৌঁছুনোর অপার আনন্দ। 
আমাদের এই বাংলায়, আমাদের এই ভূমিতেও একদিন এসেছিলেন সেই মহামানব–বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যাঁর কবিতায়, গানে বিমোহিত হয়েছি বহুবার, কিন্তু কখনো মনে হয়নি তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল, হয়েছিল কথা। কিন্তু আজ তাঁর লেখা প্রবন্ধ ধূমকেতু’র পথ পাঠ করতে করতে মনে হলো–যেনো সরাসরি কথা শুনছি। তাঁর সামনে বসে আছি! 
এই বোধ এক বিস্ময়! তিনি তো নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন মাত্র ৪৩ বছর বয়সে। হারিয়ে ফেলেন বাকশক্তি। সেই থেকে কবি নীরব। তাঁর নীরব হবার ৮৪ বছর পর আজ যখন পাঠ করছি তাঁকে, তাঁর এই অবিস্মরণীয় লেখা; তখন প্রতিবার করে মনে হলো তাঁর এক নতুন জনম। সেই নব-জনমে আমাকেও তিনি সাথে রেখেছেন, বানিয়েছেন তাঁর বোধের সহযাত্রী। বলছেন–“স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। ”
মনে হলো টগবগ করে ফুটে উঠছে আমার ধমনীতে রক্ত। টাইমমেশিনে করে বহুদূর চলে গিয়ে মনে হলো দেখতে পাচ্ছি আমার তরুণ পিতা মোহম্মদ আজিজুর রহমানকে ইসলামিয়া কলেজ গেট পেরিয়ে তিনি কলকাতার রাজপথে। শত কণ্ঠের সাথে মিলিয়ে জোর লাগিয়ে দিচ্ছেন হাঁক–“বৃটিশ, তুমি ভারত ছাড়ো।” দেখতে পাচ্ছি, অগ্নিযুগের স্বদেশি বিপ্লবী আমার পিতামহ মওলানা আকিমুদ্দিন সরকারকে। তিনি রাতের গভীর অন্ধকার চিরে ছুটছেন ঠাকুরগাঁয়ের পথে পথে। বুকে তাঁর যেনো নজরুলের অমোঘ বাণী–‘‘পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।’’ 
এই ধ্বনি তো আসলেই আজও দরকার এই যুবক বাংলাদেশে! 
আজ যেনো নতুন করে আবার জানা কাজী নজরুল ইসলামকে। তাঁর ‘ধূমকেতু’র পথ শুধু একটি রাজনৈতিক প্রবন্ধ নয়; এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, সত্যনিষ্ঠা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার এক অসাধারণ ঘোষণা। শত বছর পরেও এর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আহ্বানে নয়, বরং মানুষকে নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার যে শিক্ষা নজরুল দিয়েছেন, সেখানে। 
নজরুলের কাছে স্বাধীনতা কেবল বিদেশি শাসনের অবসান নয়। স্বাধীনতা মানে নিজের বিচারবোধের স্বাধীনতা, নিজের বিবেকের স্বাধীনতা, সত্যকে সত্য বলার সাহস। নজরুলের বিদ্রোহ কাউকে অন্ধভাবে অস্বীকার করার বিদ্রোহ নয়। তাঁর বিদ্রোহের কেন্দ্রে রয়েছে বিবেক। তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে যেমন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি নিজের চিন্তার স্বাধীনতাকেও সমান মর্যাদা দিয়েছেন। এখানেই ‘ধূমকেতু’র পথের সবচেয়ে আধুনিক শিক্ষা।

তিনি বলছেন, ‘‘আমি যতটুকু বুঝতে পারি, তার বেশি বুঝবার ভান করে যেন কারুর শ্রদ্ধা না প্রশংসা পাওয়ার লোভ না করি। তা সে মহাত্মা গান্ধিরই মতো হোক আর মহাকবি রবীন্দ্রনাথেরই মতো হোক কিংবা ঋষি অরবিন্দেরই মতো হোক, আমি সত্যিকার প্রাণ থেকে যতটুকু সাড়া পাই রবীন্দ্র, অরবিন্দ বা গান্ধির বাণীর আহ্বানে, ঠিক ততটুকু মানব। তাঁদের বাণীর আহ্বান যদি আমার প্রাণে প্রতিধ্বনি না তোলে, তবে তাঁদের মানব না। এবং এই ‘মানি না’ কথাটা সকলের কাছে মাথা উঁচু করে স্বীকার করতে হবে।”
নজরুল মহাত্মা গান্ধি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা ঋষি অরবিন্দকে শ্রদ্ধা করেছেন; কিন্তু সেই শ্রদ্ধাকে কখনো অন্ধ আনুগত্যে পরিণত করেননি। তিনি রবীন্দ্রনাথকে ছোট করেননি, গান্ধিকে অস্বীকার করার জন্য অস্বীকার করেননি, অরবিন্দের প্রতি অসম্মান দেখাননি। বরং তিনি তাঁদের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধারই দাবি তুলেছেন। কারণ, তাঁর কাছে কাউকে না বুঝেও তাঁর ভক্ত সেজে থাকা আসলে সেই মানুষটিরই অপমান। তাঁর ভাষায়, “যাঁকে আমি ঠিক বুঝতে পারছি নে, তাঁকে বুঝবার ভান করলে তাঁকে অপমানই করা হয়।”
এই বক্তব্য আজকের এই বাংলাদেশের সময়ের জন্যও অসাধারণ প্রাসঙ্গিক। আমাদের সমাজে ব্যক্তি, মত, দল কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য অনেক সময় যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়। মানুষ নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে অসঙ্গত কোনো সত্যকে স্বীকার করতে সংকোচ বোধ করে। আবার কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মতের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত দেখাতে গিয়ে নিজের প্রকৃত উপলব্ধিকেও গোপন করে। নজরুল এই আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধেই সবচেয়ে কঠিন আঘাতটি করেছেন।
তাঁর কাছে অন্ধভক্তি শ্রদ্ধা নয়। সত্যিকারের শ্রদ্ধা হলো প্রয়োজন হলে মাথা উঁচু করে বলা–আমি বুঝিনি, আমি একমত নই, কিংবা আপনার এই মতটি আমার কাছে ভুল মনে হচ্ছে। তিনি এমন মানুষ চেয়েছেন, যে নিজের বিবেককে বিক্রি করবে না। লোকের প্রশংসার জন্য নিজের সত্যকে বিসর্জন দেবে না। কারণ তাঁর কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি বাহ্যিক ক্ষমতা নয়, অন্তরের সত্যের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা। 
এই কারণেই তাঁর দেশপ্রেমও ছিল অসাধারণভাবে মানবিক। তিনি স্বাধীনতা চেয়েছেন শুধু একটি ভূখণ্ডের জন্য নয়, মানুষের মর্যাদার জন্য। তিনি চেয়েছেন এমন মানুষ, যে ভয়কে অতিক্রম করে সত্য বলতে পারে, যে অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াবে না, যে নিজের আত্মমর্যাদাকে কোনো পদ, প্রশংসা বা সামাজিক স্বীকৃতির কাছে বন্ধক রাখবে না।
তিনি বলছেন গমগম কণ্ঠে। বলছেন, “যখন ফাঁকি দিয়ে লোকের কাছ থেকে বাহবা নিয়ে ঘরে ফিরি, তখন আমার ওই বাহবা অর্জনের ফাঁকির কথা মনে হয়ে প্রাণে যেন কেমন এক অসোয়াস্তি কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। ওই অসোয়াস্তিই হচ্ছে অনুশোচনা বা অনুতাপ। যাকে সদাসর্বদা তার কৃতকর্মের বা হঠকারিতার জন্য এই রকম অনুশোচনা বা অনুতাপের তুষানলে দগ্ধ হতে হয়, সে ক্রমেই ভীরু, কাপুরুষ হয়ে যেতে থাকে, সে তখন বাক-সর্বস্ব হয়ে ওঠে ফোঁপরা ঢেঁকির মতো।”
নজরুলের ভেতর বাস করা এই মহৎ হৃদয়টিই একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক এবং মানবপ্রেমিক। তাঁর দেশপ্রেম ঘৃণার ওপর দাঁড়ানো নয়; তাঁর স্বাধীনতা অন্যের স্বাধীনতা অস্বীকার করে অর্জিত নয়। তাঁর বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়, মানুষকে উন্নততর করে তোলা। তাই ‘ধূমকেতু’র পথ পড়তে গিয়ে আজও মনে হয়, নজরুল যেন কেবল তাঁর সময়ের মানুষদের উদ্দেশে লেখেননি। তিনি ভবিষ্যতের মানুষের কাছেও একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন–তুমি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে ভাবতে পারো? এখানে এসে আজ আমারও তো একই প্রশ্ন অন্তরে গুঞ্জরিত! 
তাঁর বোধে ছিল,–তুমি যেনো কোনো মহান মানুষকেও প্রশ্ন করতে পারো, যাঁকে তুমি শ্রদ্ধা করো। তুমি যেনো নিজের দলের ভুলকে ভুল বলতে পারো। তুমি যেনো জনপ্রিয় মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের বিবেকের কথা বলতে পারো। আর সবচেয়ে বড় কথা, তুমি নিজের কাছেও মিথ্যা না বলার সাহস রাখো। 
আসলে মানুষের মুক্তি শুরু হয় নিজের ভেতরের ভীরুতা, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং প্রশংসার লোভকে জয় করার মধ্য দিয়ে। এটিই  ধূমকেতু’র পথ–এর মর্মকথা। 
এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু সত্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রয়োজন এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার দায়–এসব বদলায়নি। সেজন্যে বলার সময় এখন,–নজরুলের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাই শুধু তাঁর বিদ্রোহী কবিতা নয়। তাঁর উত্তরাধিকার হলো মাথা উঁচু করে চিন্তা করার অধিকার, আর সেই পুরোনো অথচ চিরনতুন ঘোষণা– “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।” 

আরও পড়ুন

×