নজরুলের আলেয়া, আলেয়ার নজরুল
সুমন মজুমদার
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পতঙ্গ যেমন গনগনে আলোর মায়ায় ছুটে গিয়ে প্রতারিত হয়, তেমনি নর আর নারীতে বিভক্ত মানুষের মনও হয়তো কখনও অলীক প্রেমের পেছনে ছুটে জীবনকে নিঃশেষ অথবা জটিল করে তোলে। ধূমকেতুর কবি কাজী নজরুল ইসলামের গীতিনাট্য ‘আলেয়া’ পড়ার এটাই আমার সহজ উপলব্ধি।
তবে চলো শুরু করি প্রভুর নামে। সাক্ষী রাখি দশদিক, নত হই কবির চরণে। প্রথমে বন্দনা করি নজরুল কাব্যগুণ। তারপরে বন্দনা কবির সুর সংগীত ধুন। তারপরে সালাম রইল লেখনী কলমে। বিদ্রোহ আর প্রেম পৌঁছাক সবার মরমে।
বলা হয়, নাটক তো শুধু একটি স্ক্রিপ্ট নয়, একইসঙ্গে মঞ্চ সম্ভাবনার ইঙ্গিতবহও। ফলে নাট্যকারের টেক্সটের সঙ্গে নির্দেশকের মুনশিয়ানা, অভিনেতার অভিনয় আর দর্শকের মিথস্ক্রিয়া মিলেই তৈরি হয় এক একটি দারুণ নাটক। এটা একান্তই আমার মত, নাটক যতটা না আরাম করে পড়া, তার চেয়ে বেশি দেখা এবং উপলব্ধির। এ অভিজ্ঞতা থেকেই গীতিনাট্য বা গীতিআলেখ্যর কথা এলে দুই চোখ যেন দুই দিকপালের দিকে তাকিয়ে রয়। তাঁর একজন রবীন্দ্রনাথ, অন্যজন নজরুল।
রবীন্দ্রনাথের চণ্ডালিকা, শ্যামা, চিত্রাঙ্গদা বা অন্য গীতিনাট্যগুলো পড়ে বা দেখে যে অনুভূতি জন্মায়, নজরুলের গীতিআলেখ্যগুলো পড়া বা দেখার অভিজ্ঞতা বলা যায় একেবারে ভিন্ন। কবিতার বিদ্রোহী ঝাঁজাল নজরুলকে যেন ‘আলেয়া’ বা ‘মধুমালা’তে চেনাই দুষ্কর। সেখানে বরং তীব্র প্রেমিক নজরুলই বেশি উপস্থিত; যা তাঁর বিদ্রোহী সত্তার ভক্তদের বিশৃঙ্খলা মনে হতেই পারে। তবু মানুষ মাত্রই যেহেতু প্রেমাসক্ত, তাই জীবনানন্দের ভাষাতেই একে হয়তো বর্ণনা করা সম্ভব– আমি তারে পারি না এড়াতে, সে আমার হাত রাখে হাতে, সব কাজ তুচ্ছ হয়, পণ্ড মনে হয়, সব চিন্তা, প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয়। আলেয়াকে বলা যায়, নজরুলের তীব্র রোমান্টিক আবেগ, ভাগ্যের নির্মমতা এবং সুরের মায়াবী মোহে প্লাবিত এক নাট্যপ্রয়াস। রূপকধর্মী নাটকটিতে গান্ধার রাজ্যের সম্রাট মীনকেতু, অপর রাজ্যের তেজস্বিনী জয়ন্তী, চন্দ্রীকা বা উগ্রাদিত্যের মতো চরিত্রগুলো শুধু প্রেমের দ্বন্দ্বেই দ্বন্দ্বিত নয়, একইসঙ্গে তারা সূক্ষ্মভাবে রাজনৈতিকও। আলেয়ার নজরুল যেন প্রেমে মজেই প্রেমের পরিণতি দেখিয়েছেন। জয়ন্তী, মীনকেতু ও চন্দ্রিকার ত্রিভুজ সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি যেন বলছেন, তীব্র আবেগ ও অধিকারবোধ যখন অন্ধ হয়ে যায়, তখন তা কেবল ধ্বংসই বয়ে আনে। আবার শক্তির মোহে রাজপরিবারের দ্বন্দ্ব ও মন্ত্রদাতা কৃষ্ণা চরিত্রের কূটকৌশল মানুষের ভেতরের লোভ আর ক্ষমতার লালসাকে ফুটিয়ে তোলে চমৎকার।
আলেয়া যেমন রাতের অন্ধকারে পথিককে বিভ্রান্ত করে ভুল পথে নিয়ে যায়, নাটকের চরিত্রগুলোও তেমনি অধরা রূপ ও ভালোবাসার পেছনে ছুটে শেষ পর্যন্ত চরম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়। প্রাপ্তির সঙ্গে অপ্রাপ্তির এই চিরকালীন দ্বন্দ্বে মরীচিকার মতো ধরা দেয় ভালোবাসা, যা নাটকের নামকরণকেও সার্থক করে তোলে।
বলা হয়, প্রত্যেক লেখকের ব্যক্তি জীবন, আনন্দ-বেদনা, পারিপার্শ্বিকতা ও মননশীলতার প্রতিফলন ঘটে তার প্রতিটি সৃষ্টিতে। সে হিসেবে আলেয়াতে প্রেমিক নজরুলের ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েনও কি অলক্ষ্যে ফুটে উঠল কিনা তা নিয়ে গবেষণা চলতে পারে। তবে কেবলই এক জিজ্ঞাসু পাঠক দর্শকের দৃষ্টিতে এমনি অনুমান করি, নজরুলের প্রেমজীবন যেহেতু তীব্র আবেগ আর একইসঙ্গে গভীর বিচ্ছেদের বেদনায় ভরা, এই নাটকেও তার খানিকটা হলেও ছায়া পড়েছে। কারণ সৈয়দা খাতুন বা নার্গিসের সঙ্গে তাঁর প্রেম পরিণয়-বিয়ে এবং মাত্র একদিন পরেই সেই বাঁধন ছিন্ন করে চলে আসা নজরুলের জীবনের অন্যতম বড় মনস্তাত্ত্বিক আঘাত। পরবর্তী সময়ে প্রমীলার সঙ্গে বিয়ে হলেও সমাজ ও পরিস্থিতির চাপ নজরুলকে ক্রমাগত পীড়িত করেছে।
আলেয়া নাটকে অধরা ভালোবাসার যে দ্বন্দ্ব, পাওয়ার তীব্র আকুতি অথচ শেষ পর্যন্ত প্রাপ্তির শূন্যতা, তা নজরুলের নিজের জীবনের অসমাপ্ত প্রেম ও বিচ্ছেদের বেদনার প্রতিফলন হলেও হতে পারে। যদিও তা নজরুল গবেষকরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে অনুমান বিজ্ঞের গবেষণার সঙ্গে মিলে গেলে অনুমানকারীর মনে যে আমোদ লাগে, মূলত সেটার জন্যই আমি লালায়িত।
আলেয়া গীতিনাট্যের সঙ্গে কবির ব্যক্তিজীবনের আরেকটি যোগসূত্রও অনুমান করা যায় কিনা কে জানে। জানা যায়, ১৯৩১ সালে যখন নজরুল ‘মরুতৃষা’ নামে (পরে নাম পাল্টে হয় আলেয়া) এ নাটকটি লেখেন এবং তা প্রকাশিত হয়, তখনও ছেলে বুলবুলকে হারানোর দগদগে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ফলে নাটকে মৃত্যু, বিচ্ছেদ এবং জগতের সব প্রাপ্তির ক্ষণস্থায়িত্বের যে করুণ সুর বাজছে, তা কি অতৃপ্ত প্রেমিকের মতো এক সন্তানহারা বাবার গভীর আর্তনাদ ও বৈরাগ্য রূপকেও প্রকাশ করে?
যাই হোক, নাট্যভাব রেখে এবার আসি আলেয়ার সংগীতে। যেহেতু নাটকটি মঞ্চে দেখারও সৌভাগ্য হয়েছে, তাই এর গানগুলো যে সংগীতপ্রিয়দের কাছে সুপানপাত্রের পেয়ালা তা বলা বাহুল্য। সুরের জাদুকর নজরুল এ ক্ষেত্রেও জাদুমন্ত্রের বিস্তার এমনভাবে করেছেন, যা উপেক্ষা করা ঘোর অসুরের পক্ষেও কঠিন। কি নেই আলেয়ার সংগীতে, ধ্রুপদি রাগ থেকে বাংলা লোকসুর, কীর্তন, বাউল এবং গজল; সব মিলে যেন এক অভূতপূর্ব সংগীতায়োজন।
অবশ্য নজরুলের এই সুরের বহুমুখিতা কেবল যে ‘আলেয়া’ নাটকেই সীমাবদ্ধ তা নয়। আমার তো মনে হয়, সঞ্চিতার কবিতাগুলোও অদ্ভুত অলক্ষ্য গীতল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার যে অপ্রতিরোধ্য গতি, ‘আলেয়া’র সুরের মোচড়ে তার দেখা মেলে এক ভিন্ন ও কোমল লিরিক রূপের ভেতর দিয়ে। এখানে সুর কেবল বিনোদন নয়, বরং সুরই হয়ে ওঠে নাটকের মূল চালিকাশক্তি। একইসঙ্গে সংলাপেরও যেন পরিপূরক হয়ে ওঠে গান। গীতিনাট্যটির গানগুলো কেবল বিরতির বিনোদন নয়; গানই এখানে নাটকের মূল আখ্যানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। সূচনা সংগীত– ‘নামিল বাদল, রুম ঝুম ঝুম’ থেকে ‘জাগো যুবতী আসে যুবরাজ, অশোকরাঙা বসনে সাজ, আসন পাতা বনে অঞ্চল আধো, বন্দনা গীতি ভাষা বাধো বাধো’ কিংবা ‘ঝরা ফুল দলে কে অতিথি, সাঁঝের বেলা এলে কাননবীথি’ গানগুলো যেন এক একটি হীরকখণ্ড। তাই গীতিনাট্য হিসেবে ‘আলেয়া’ যে কেবল নজরুলের নাট্যরীতির নিদর্শন তা নয়, এটি তার সুর-সাধনার এক অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্ব বলেও নতমস্তকে স্বীকার করে নেই। মঞ্চের আলো নিভে গেলে কিংবা নাটকের শেষ পাতাটি উল্টানো হলে প্রেক্ষাগৃহ বা ঘরের কোণে যে নৈঃশব্দ্য নেমে আসে, সেখানেও যেন বাজতে থাকে আলেয়ার সুর।
- বিষয় :
- নজরুল উৎসব