ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মন খারাপ করা বিকেল

বিষণ্ন ধূসর আলো

বিষণ্ন ধূসর আলো
×

প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

সেলিম জাহান

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

এটা আমার হয়েই থাকে– বিকেল এলেই আমার মন খারাপ করে। বিশেষ করে বিকেল যখন শেষ বিকেলের দিকে যায়। কী এক ধূসর বিষণ্ণতা ছুঁয়ে যায় আমাকে– সেই যখন খুব ছোট ছিলাম তখন থেকেই। যে কোনো সময়ে– শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, বসন্ত; পৃথিবীর যে কোনো জায়গায়– মস্কো, ঢাকা, বরিশাল, প্যারিস, মন্ট্রিল, লন্ডন, নিউইয়র্কে। নিজে একা থাকলে কিংবা শত লোকের মাঝে। কোনো ব্যাখ্যা নেই তার– তবু এ সময়ে কেমন যেন একটা হাহাকার উঠে আসে চেতনায়– আনমনা হয়ে যাই আমি। 
কোনো কোনো বিকেলে মনে পড়ে যায় মস্কোয় দেখা সেই ‘শেষ বিকেলের মেয়েটির’ সুকুমার মুখখানি, যার বাংলাদেশি ভালোবাসার মানুষটি তাকে প্রবঞ্চিত করেছিল। সেই কবে আমার শিশুকালে আমার পিতামহী কোনো এক শেষ বিকেলে ‘কনে দেখা আলো’ দেখিয়েছিলেন আমাকে। বহুকাল আগে গত হওয়া আমার সেই প্রয়াত পিতামহীর মুখখানি যেন আবছা দেখতে পাই। ‘আজ তারা কই সব’, ‘কোথায় গিয়েছে তারা?’ মন কেমন যেন উদাস হয়ে আসে– কোন এক আর্তির জলধারা বয়ে চলে আমার হৃদয়ের কূলে-উপকূলে। 
বিকেলের রং যখন ফিকে হয়ে আসে, আমি এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসি। দেখতে পাই, রাস্তার ওপারের ‍চিরল পাতার গাছটির নিচে ছোপ ছোপ অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকে বেড়ালের মতো। শনৈ শনৈ বেড়ে উঠেছে গাছটি। তাকালে মনে হয়, যেন বলছে, ‘কী ভালো আছো তো’? সেই গাছের মগডালে পাখির বাসা চোখে পড়ে। ঘরে ফেরা ক্লান্ত পদের মানুষদের দেখি, আমার সামনের টেবিলটির কাচে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের ছবি, মুখোমুখি নীলচে শূন্য চেয়ারটিতে চুপ করে থাকে ছায়া– যেন ‘এলায়ে পড়েছে ছবি’। ‘কনে দেখা রোদ’ এসে পড়ে বারান্দায়, শার্সিতে, টেবিলটার ওপরে। ডিমের হাল্কা কুসুমের মতো নরম হলদেটে রোদ– তার মৃদু উত্তাপ পাই। 
আকাশের দিকে তাকাই। মনে হয় সারা আকাশে আগুন লেগে গেছে– ‘নামে সন্ধ্যা তন্দ্রালসা, সোনার আঁচল খসা’। মেঘের রঙের সঙ্গে রোদ গুলে কত রকম যে রং ধরে মেঘমালা– কোনোটা আগুন রঙা, কোনোটা গোলাপি, কোনোটা হলদেটে, কোনোটা ধূসর-লালে মাখামাখি। কখনও কখনও মেঘমালারা কাছে এসে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসায়, কখনও কখনও তারা অভিমানে দূরে সরে যায়। কখনও কখনও দেখি, মেঘমালার মাঝ দিয়ে একটা জানালা তৈরি হয়েছে– তার ফাঁক দিয়ে তাকাই, কিছু একটা দেখার চেষ্টা করি। কী, তা নিজেও জানি না। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামে। মেঘের অত রং কে যেন রবার ঘষে তুলে ফেলে নরম হাতে।
কোনো কোনো শেষ বিকেলের ধূসরতায় বহুদিন আগে আমার হারিয়ে যাওয়া মা’কে মনে পড়ে, পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকের কথা। বাবা তখন ব্রজমোহন কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক। তত্ত্বাবধায়কের ছড়ানো বিরাট বাড়ির বাসিন্দা তখন আমরা। আমার মা শক্ত টাইফয়েডে পড়লেন। প্রথম তিন-চার মাস ধরাই যাচ্ছিল না, তাঁর অসুখটা কী। জ্বর আসে-যায়, অনেকটা ঐ বানরের তৈলাক্ত বাঁশের ওঠানামার মতো। আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন সারাদিন। দেখি বাবা তাঁর মাথায় জল ঢালছেন। 
আমার বয়স সাতের মতো, আমার বোনের চার। মায়ের কাজের সহকারী রেনুর মা মাসিমা আমাদের দুজনকে স্নান করান, খাওয়ান, শোয়ান। তাঁর মেয়ে রেনুদি মাকে সাহায্য করেন। ছাত্রাবাসের কর্মচারী মান্নান ভাই বাইরের কাজ সারেন। আমি আর স্কুলে যাই না। মায়ের কাছাকাছি ঘুরঘুর করি। 
একদিন শেষ বিকেলের দিকে মায়ের পাশে বসে আছি। মায়ের শিয়রের লম্বা মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত জানালা। তাকিয়ে দেখি বাইরে সিমেন্টের উঠোনে মরা রোদ এসে পড়েছে। চাতালের ওপারে জলপাই গাছের তেলতেলে পাতাদের চকচকে আভা ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিক। একটু দূরের কাঁঠাল গাছটায় একটা শালিক চুপচাপ বসে আমারই দিকে তার টানা চোখ মেলে ধরেছে। দেখি চারদিকে সন্ধ্যার ছায়া নামছে। বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। 
হঠাৎ শুনি মা আমার নাম ধরে ডাকছেন। আমি আস্তে আস্তে তাঁর শিয়রে গিয়ে দাঁড়াই। দুর্বল হাতে আমার হাত ধরেন তিনি– টের পাই তাঁর হাতের উত্তাপ। টেনে বসান আমাকে তিনি তাঁর পাশে। তাকাই তাঁর দিকে। দু’চোখ বোজা তাঁর– রোগাক্রান্ত পান্ডুর মুখ। নিঃশ্বাস নিচ্ছেন খুব ধীরলয়ে। একসময়ে চোখ খোলেন তিনি। জলধারা নেমেছে চোখে। তাঁর হাত আমার গালে রাখেন, তারপর ভাঙা গলায় বলেন, ‘আমি বোধহয় আর বাঁচব না’। 
আমি ফুঁপিয়ে উঠি। শক্ত করে তাঁর হাত ধরি। কেঁপে কেঁপে উঠি বলা চলে। ততক্ষণে মা হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে, সাত বছরের একটি শিশুকে মৃত্যুর কথাটা বলা ঠিক হয়নি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন। ম্লান হাসেন, গাল টিপে দেন আমার, তারপর আশ্বস্ত করেন আমাকে, ‘কিচ্ছু হবে না। যাও, খেলতে যাও’। আমি আস্তে আস্তে উঠি, জামার আস্তিনের উল্টো পিঠে চোখ মুছি, তারপর দরজা পেরোই। পেছনে তাকিয়ে দেখি, ক্লান্ত হয়ে তিনি আবার চোখ বুজেছেন।
আমি পায়ে পায়ে বাইরে আসি। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে আর একটু গাঢ় হয়ে। সিমেন্টের উঠোনে এসে দাঁড়াই। জলপাই গাছে আঁধার ঝুলে ঝুলে আছে। কাঁঠাল গাছে যেসব পাখির রাত্রিবাসের কথা, তারা হুটোপুটি ঝগড়াঝাঁটিতে ব্যস্ত। মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক সবুজ টিয়ে টিঁটিঁ করে উড়ে গেল। আমি যেন শুনতে পেলাম– ‘বাঁচব না, বাঁচব না।’
আমার জীবনের একটা বড় সময় আমি কাটিয়েছি হাসপাতালে– জীবনসাথির ২০ বছরব্যাপী কর্কট রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের কালে। বহু লড়াই জিতেছি, কিন্তু শেষ যুদ্ধে হেরেছি। 

সেইসব লড়াইকালে বহু বিকেল-সন্ধ্যা আমার কেটেছে হাসপাতালে। হাসপাতালের বিবর্ণ বাতি,  ডাক্তার-নার্সদের নিঃশব্দ পায়ে চলাফেরা, কেমন যেন এক ফিসফিসানি নিস্তব্ধতা আমাকে বিষণ্ণ করে দিত। বিকেল এলেই আমি চারপাশে যেন এক মৃত্যুর গন্ধ পেতাম। আমি ওর রোগক্লিষ্ট পান্ডুর চোখ বোজা ক্লান্ত মুখের দিকে তাকাতাম। মনে হতো, চারপাশে যেন শুনছি, ‘যাই তবে, যাই’! 
কখনও কখনও অস্থির হয়ে আমি কেবিনের বারান্দায় এসে দাঁড়াতাম। দেখতাম, বিকেল মরে গিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। চোখ যেত রাস্তার ওপারের দুটো বাতির দিকে। আসলে তেমন কিছুই নয়, মাত্র দুটো বাতি– হলদে, বিবর্ণ, বুড়ো মানুষের ঘোলাটে চোখের মতো দুটো বিজলি বাতি। একটি বহু পুরোনো বাড়ির জানালা থেকে যেন তাকিয়ে আছে। দু’পাল্লার জানালার দুটো ফাঁক দিয়ে যেন ইশারা করছে আমাকে। মাঝে মাঝে বাতি দুটোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে যে জন্ডিসের পীতাভ চোখ নিয়ে একটি কালো বেড়াল যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে। কখনও কিন্তু ও ঘরের গবাক্ষ পথ কখনও খুলতে দেখিনি, পর্দাবিহীন ওই জানালা দিয়ে ঘরের অন্য কিচ্ছু দেখা যায় না, দেখিনি কাউকে কোনোদিন ওই জানালায় কিংবা ঘরে। বোঝা যায় না ওখানে কেউ কখনও ছিল কিনা, শুধু দুটো বাতি নিয়ে ঐ জানালাটি স্থির হয়ে আছে কত দিবস, কত রজনী!
হতে পারে, ও ঘরে কিছুই নেই, কেউ নেই। যারা ছিল, অনেক আগে চলে গেছে। ঐ ঘরে অপঘাতে কোনো মৃত্যুর পরে কেউ আর আসেনি। হয়তো যাওয়ার সময়ে বাতি নেভাতে ভুলে গেছে। ঘরের দরজায় ঝুলছে বড় তালা। বহুকাল ঐ মরচে ধরা তালা খুলে ঐ ঘরে কেউ ঢোকেনি, কেউ বারও হয়নি। ‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতার মতো কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে, ‘ভেতরে কেউ আছো কি?’ ঘরের সামনে দাঁড়ালে ভেতরে হাওয়ার হুহু শব্দ শোনা যায়। ভালো করে কান পাতলে মনে হয়, ওটা হাওয়া নয়, মৃদু কান্নার শব্দ। ঐ ঘরে নিস্তব্ধতাও যেন নিশ্চুপ হয়ে আছে।  
বহুদূর থেকে যেন শুনতে পাই, ‘বৃহৎ বাড়ির মধ্যে কেবল একটি ঘর বন্ধ। তাহার তালাতে মরিচা ধরিয়াছে, তাহার চাবি কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। সন্ধ্যাবেলা সে ঘরে আলো জ্বলে না, দিনের বেলা সে ঘরে লোক থাকে না। সে ঘর খুলিতে ভয় হয়, অন্ধকারে সে ঘরের সমুখ দিয়া চলতে গা ছম্ছম্ করে। দুইখানি দরজা ঝাঁপিয়া ঘর মাঝখানে দাঁড়াইয়া আছে। এ ঘর বিধবা। একজন কে ছিল, সে গেছে। সেই হইতে এ ঘরের দ্বার রুদ্ধ। সেই অবধি এখানে কেউ আসেও না, এখান হইতে কেউ যায় না। সেই অবধি এখানে মৃত্যুরও মৃত্যু হইয়াছে’। 
এইসব ভাবতে ভাবতে চায়ের পেয়ালা নামিয়ে রাখি বারান্দার টেবিলে। চোখ তুলে বাইরে তাকিয়ে দেখি বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে  –অনেকটা ঐ ‘যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে’। চোখ ফিরিয়ে ঘরের ভেতরে তাকাই। জানি, সে ওখানে নেই, তবু কেমন যেন একটা প্রত্যাশার চোখে তাকাই, হয়তো দেখব ওকে। মনে পড়ে যায় সেই শেষ বিকেলের কথা– যে বিকেলে ওর শেষকৃত্য শেষে ঘরে ফিরে এসেছিলাম। চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললে মনে হলো, না, ও নেই। আর কোনোদিন এ ঘরে আর আসবে না, কোনোদিন আর ওকে দেখব না। কোনোদিনই না। ঘরের জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের রোদ এলায়ে রয়েছিল মেঝেজুড়ে। অত আলোর মাঝেও ঘরজুড়ে নৈঃশব্দ্যরা যেন ঘাপটি মেরে ছিল কালো বেড়ালের মতো। সে নৈঃশব্দ্য এত ভারী যে, তাকে যেন ছুরি দিয়ে কাটা যাবে। 
মনে পড়ে গিয়েছিল, রুদ্রের সেই লাইন, ‘চলে গেলেও আমার কিছু থেকে যাবে আমার না থাকা জুড়ে’। নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলাম, এই যে আজ থেকে এই পৃথিবীতে ওর না থাকা, এই ঘরে ওর অনুপস্থিতি, তারপরেও কি রয়ে যাবে? ওর অনুপস্থিতির রেশ, ওর স্মৃতির সুরভি, নাকি ওর কোনো এক অস্তিত্বের চিহ্ন? ঠিক ধরতে পারছিলাম না, কিন্তু কেন যেন অনুভব করতে পারছিলাম ঐ পড়ন্ত বিকেলে। বুঝতে পারছিলাম, ওর অনুপস্থিতির মানে হবে একটা শূন্যতা, একটা রিক্ততা, একটা হাহাকার। এবং সেই সঙ্গে একটি নিস্তব্ধতা, একটি নৈঃশব্দ্য। আসলে নৈঃশব্দ্যের যেমন একটি ধ্বনি আছে, অনুপস্থিতিরও তেমন একটি নৈঃশব্দ্য আছে। 
কালো বেড়ালের মতো ছায়া ছায়া আঁধার নেমে আসতে থাকে অতি ধীরে। সেই ধূসর আবছায়ায় তৈরি হয় কোনো এক অজানা রহস্য। ঠিক সে সময়েই এক ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে’। সেই আধো-আঁধারে টের পাই ছায়া ছায়া ও হাল্কা পায়ে বারান্দায় এলো। বসল আমার মুখোমুখি টেবিলের উল্টো দিকের নীলচে চেয়ারটাতে– ওটাই ওর জায়গা ছিল। আমি ওর হাত ধরি। বারান্দার ধূসর চাদরের মতো আবছায়া কালো হয়ে আসে। অতি ধীরে নরম ছোঁয়ায় সে হাত ছাড়িয়ে নেয়, চেয়ার ছেড়ে ওঠে। তার ছায়া পড়ে টেবিলের কাচে। ধীর পায়ে এগিয়ে আসে আমার চেয়ারের দিকে। আমার চেয়ারের পেছনে এক হাত রেখে অন্য হাত রাখে আমার মাথায়। আমি চোখ বুজে সেই আবেশটুকু নেই। জিজ্ঞেস করি, ‘যাচ্ছ?’ মৃদু কণ্ঠের জবাব পাই মনের ভেতরে, ‘যেতে তো হবেই’। 
আমি চোখ মেলি, তাকাই এদিক-ওদিক। সেই দুলে ওঠা মায়াবী পর্দাটি কেটে গেছে। কেউ কোথাও নেই। হুহু করে হাওয়া আসে যেন কোনো দিক থেকে। গাছের পাতার হুটোপুটি শোনা যায়। আমিও শূন্য চায়ের পেয়ালাটি তুলে উঠে পড়ি– তৈরি হতে হবে আগামীকালের জন্য। পা বাড়াই অন্ধকারে ঢাকা শূন্য ঘরের দিকে। ধূসর সেই বিষণ্ণ মন খারাপ করা বিকেলে শেষবারের মতো বারান্দার দিকে তাকাই–  ‘কিছু কি ফেলে গেলাম’? 

আরও পড়ুন

×