ক্যানভাসে নারীর অস্তিত্ব
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারীকে দেখার অভ্যস্ত চোখে যেন হঠাৎ একটু ধাক্কা লাগে। কোথাও মুখ নেই, অথচ আছে শরীরের ইঙ্গিত; কোথাও শরীরও নেই, আছে শুধু শাড়ির ভাঁজ, রং, অলংকার আর চলনের রেখা। কোথাও আবার ধাতু, কাঠ কিংবা পাথরের বিমূর্ত অবয়ব দাঁড়িয়ে রয়েছে এক ধরনের নীরব আত্মবিশ্বাস নিয়ে। এই বিচিত্র সব দৃশ্যের ভেতর দিয়ে নারীকে শুধু নারী হিসেবে নয়, বরং একটি বিস্তৃত ভূখণ্ড হিসেবে পড়ার আহ্বান নিয়ে চলছে শিল্পপ্রদর্শনী ‘লবঙ্গলতিকা (Lobongolotika: Cartographies of the Feminine)
২৩ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ দলীয় প্রদর্শনীতে নারীত্বকে প্রচলিত সৌন্দর্য, বেদনা কিংবা আত্মত্যাগের একমাত্র ফ্রেমে আটকে রাখা হয়নি। বরং রং, বুনন, অবয়ব, পোশাক, অলংকার ও ভাঙাচোরা গড়নের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে নারীসত্তার বহুমাত্রিকতা।
লবঙ্গলতিকা নামটির মধ্যেও রয়েছে প্রদর্শনীর ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, নামটি ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের মিষ্টান্নের সঙ্গে সম্পর্কিত; যার কোমল, সূক্ষ্ম ভাঁজকে শক্ত করে ধরে রাখে লবঙ্গের তীক্ষ্ণ স্পর্শ। সেই কোমলতা ও দৃঢ়তার দ্বৈততাকেই এখানে নারীত্বের রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য একটি বিশেষ চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির। এখানে নারীকে কেবল কষ্ট পাওয়া, সহ্য করা কিংবা বিসর্জন দেওয়া এক সত্তা হিসেবে দেখানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা আছে। আয়োজকদের ভাষায়, এটি ক্ষতচিহ্নের তালিকা নয়; নিজের ইচ্ছা, আনন্দ, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার উদযাপন।
প্রদর্শনীর কয়েকটি কাজের ছবির দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একটি কাজে দেখা যায় কালো, সাদা, ধূসর ও গাঢ় নীল কাপড়ের স্তরের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে রঙিন নকশা। কাপড়গুলো যেন একে অন্যের ওপর ঢলে পড়েছে, আবার কোথাও তৈরি করেছে শরীরের অস্পষ্ট অবয়ব। সাদা কাপড়ের কোমলতা আর কালোর ভারী উপস্থিতির পাশাপাশি হলুদ, লাল ও নীলের উজ্জ্বল ছাপ ছবিটিকে দিয়েছে তীব্র বৈপরীত্য। এখানে নারীর মুখ বা প্রচলিত কোনো প্রতিকৃতি নেই। পোশাকের স্তর, ভাঁজ ও বিন্যাসই হয়ে উঠেছে শরীরের বিকল্প ভাষা। কাপড় যেন শরীরকে আড়ালও করছে, আবার সেই আড়াল দিয়েই শরীরের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
অন্য একটি শিল্পকর্মে বেগুনি, ফিরোজা, সবুজ ও নীল কাপড়ের বিস্তৃত বিন্যাসের মধ্যে একটি কালচে অবয়ব চোখে পড়ে। চারপাশের উজ্জ্বল রঙের বিপরীতে সেই অবয়বটি যেন নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকা কোনো চরিত্র। পোশাকের ভাঁজগুলো কোথাও নদীর ঢেউয়ের মতো, কোথাও আবার মেঘের মতো স্তরে স্তরে জমেছে। কাজটি একই সঙ্গে অলংকারময় এবং রহস্যময়; যেন নারীকে দৃশ্যমান করার বদলে তাঁর চারপাশের জগৎটিকেই দৃশ্যমান করে তুলেছে।
এই প্রদর্শনীতে অবশ্য কাপড় ও রঙের পাশাপাশি ভাস্কর্যও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছে। ‘Solitude’ কাজটিতে একটি দীর্ঘ, স্তরবিন্যস্ত স্থাপত্যসদৃশ অবয়বের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছোট মানবমূর্তি। কাজটির বিন্যাসে একাকিত্বের অনুভূতি তৈরি হয়। বিশাল কাঠামোর পাশে মানুষের ক্ষুদ্র উপস্থিতি যেন ব্যক্তিসত্তার নিঃসঙ্গতা এবং নিজের ভেতরের আশ্রয়ের প্রশ্নটিকে সামনে আনে।
শিল্পী আইভি জামানের ‘Thinker 1’ ভাস্কর্যে আবার অন্য রকম ভাষা ফুটে ওঠে। কাঠের মতো বাদামি টেক্সচারের একটি সরল, বিমূর্ত অবয়ব। বৃত্তাকার বহিরেখার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ রেখা। মানবদেহের প্রচলিত অনুকরণ নেই, নেই মুখাবয়বের বিস্তারিত নির্মাণ। তবু নামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে অবয়বটির মধ্যে চিন্তা, স্থিরতা ও আত্মসংলাপের একটি বিমূর্ত প্রতীক খুঁজে পাওয়া যায়।
‘Three Girls’ কাজটি আবার রং ও অলংকারের এক উচ্ছল সমাবেশ। ছবিতে তিন নারীর শরীরের অংশবিশেষ দেখা যায়; বিশেষ করে হাত, চুড়ি, আংটি, শাড়ির নকশা ও কাপড়ের রং দৃশ্যটিকে প্রাণবন্ত করেছে। মুখের পরিবর্তে হাত ও পোশাকই এখানে চরিত্রগুলোর পরিচয় বহন করছে। লাল, হলুদ, নীল ও সবুজের পাশাপাশি নানা অলংকারের ব্যবহার কাজটিকে দিয়েছে উৎসবমুখর আবহ।
এখানেই নারীত্বের মানচিত্র ধারণাটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানচিত্র যেমন কোনো ভূখণ্ডের একটিমাত্র ছবি নয়। তার নদী আছে, পাহাড় আছে, জনপদ আছে, অনাবিষ্কৃত অঞ্চল আছে; তেমনি নারীত্বও একটি একরৈখিক পরিচয় নয়। কখনও তা কোমল, কখনও দৃঢ়; কখনও অন্তর্মুখী, কখনও উচ্ছল; কখনও নিঃসঙ্গ, কখনও সম্মিলিত।
প্রদর্শনীটির কিউরেটোরিয়াল বক্তব্যে নারীত্বকে প্রচলিত লিঙ্গপরিচয়ের সীমার বাইরেও একটি সৃজনশীল ও বহুমাত্রিক শক্তি হিসেবে ভাবার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ‘নারী’ এই শিল্পমাধ্যমগুলোতে শুধু নারীর জৈবিক বা সামাজিক পরিচয়ের সমার্থক নয়; এটি হয়ে উঠেছে ফর্ম, টেক্সচার, বুদ্ধি, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র।
২৩ শিল্পীর অংশগ্রহণে সেই ক্ষেত্রটিই নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের তালিকায় রয়েছেন বিপাশা হায়াত, মাকসুদা ইকবাল নিপা, শেখ ফারহানা পারভীন তুম্পা, ফরিদা জামান, মুক্তি ভৌমিক, সিগমা হক আংকান, ইসরাত জাহান প্রমা, নার্গিস পলি, সীমা মণ্ডল, আইভি জামান, নূর মুনজেরিন রিমঝিম, সুবর্ণা মোরশেদা, কানক চাঁপা চাকমা, রোকেয়া সুলতানা, সুরিয়া রহমান, কুহু প্লামন্ডন, শাকিরুন নাহার কানন, তানজিম জাহান লাজ, লেখ নেছা খাতুন, শারমিন আক্তার লিনা, তারানা হালিম, তুলসী রানী দাস ও ভিনিতা করিম। তাঁদের কাজের ভেতর দিয়ে তাই একটি প্রশ্নও ফিরে আসে–নারীকে আমরা আসলে কীভাবে দেখি?
শতাব্দীর পর শতাব্দী শিল্পে নারী কখনও মা, কখনও প্রেমিকা, কখনও ত্যাগের প্রতীক। তাঁর কান্না সহজে শিল্পের বিষয় হয়েছে, তাঁর অপেক্ষা হয়েছে রোমান্টিক, তাঁর সহনশীলতা হয়েছে মহিমান্বিত। কিন্তু তাঁর আনন্দ, তাঁর ইচ্ছা, তাঁর স্বাধীনতা, তাঁর নিজের মতো করে পৃথিবীকে দেখার অধিকার-এসব কি সমানভাবে শিল্পের বিষয় হয়েছে?
লবঙ্গলতিকা শিল্প প্রদর্শনীটি সেই প্রশ্নের জায়গাটিতেই দাঁড়ায়। এখানে ভঙ্গুর নারীর জন্য জায়গা নেই–এমন ঘোষণা করলেও প্রদর্শনীটি আসলে ভঙ্গুরতাকে অস্বীকার করে না। তাকে নারীর একমাত্র পরিচয় হতে দেয় না। কাপড়ের ভাঁজে যেমন কোমলতা আছে, তেমনি তার নিচে আছে দৃঢ় কাঠামো। উজ্জ্বল রঙের আড়ালে আছে অন্ধকার। বিমূর্ত শরীরের ভেতরে আছে চিন্তার স্পন্দন। আর নীরব ভাস্কর্যের ভেতরেও আছে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
শেষ পর্যন্ত এই প্রদর্শনী নারীর কোনো ‘চূড়ান্ত ছবি’ আঁকে না। অনেকগুলো অসম্পূর্ণ রেখা, রং, শরীর, বস্ত্র, আকৃতি ও অনুভূতি পাশাপাশি রেখে বলে–মানচিত্র এখনও আঁকা হচ্ছে।
প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে গত ১৪ আগস্ট। চলবে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজ গ্যালারিতে। দর্শনার্থীদের জন্য গ্যালারি উন্মুক্ত থাকবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
- বিষয় :
- গল্প