ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনুসারী ও মুছে ফেলা স্মৃতি

অনুসারী ও মুছে ফেলা স্মৃতি
×

শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক

হাইকেল হাশমী

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনুসারী
আমি ফেসবুকে একজন ভদ্রমহিলাকে অনুসরণ করি, যিনি “রহস্যময়ী” নামে পরিচিত। তাঁর পোস্টগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয়—বুদ্ধিদীপ্ত, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং অর্থবহ। তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বিশাল; প্রায় বিশ লাখের বেশি মানুষ তাঁর পেজ অনুসরণ করে। প্রতিদিনই তিনি নতুন নতুন বিষয়বস্তু নিয়ে পোস্ট করেন। মাঝেমধ্যে আমি তাঁর পোস্টের প্রশংসা করে মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠাই, আর তিনি সবসময়ই আন্তরিকভাবে উত্তর দেন। গত কয়েক দিন ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার সমাধান নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেমন সময় দিতে পারিনি। আজ কিছুটা অবসর পেয়ে ফেসবুকে লগ-ইন করলাম। অনেক কিছুই দেখার ছিল। আমি “রহস্যময়ী”-এর সর্বশেষ পোস্ট খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, তাঁর শেষ পোস্টটি প্রায় এক মাস আগের। বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করল যেহেতু তিনি প্রায় প্রত্যেক দিন পোস্ট দেন। তাই সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে একটি মেসেজ পাঠালাম। তাঁর উত্তর দেওয়ার অভ্যাস জানতাম, তাই উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। আমার ধারণা সত্যি হলো। এক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর উত্তর পেলাম- “জনাব, আপনার ম্যাসেজের জন্য ধন্যবাদ। আমার দাদী তিন সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। তাঁর খোঁজখবর নেওয়া জন্য একমাত্র মানুষ আপনি যিনি ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।”
মুহূর্তেই আমার ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ন হয়ে গেল। বিশ লক্ষ অনুসারী আর তার অনুপস্থিতির কারণ জানতে একটিও প্রশ্ন নেই। জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিঃসঙ্গতা, এটাই—আধুনিক জীবনের এক নীরব অভিশাপ।
মুছে ফেলা স্মৃতি
সারা রাত ঘুমাতে পারি না শুধু তন্দ্রাঘোরে ডুবে যাই আর ডুবতে ডুবতে নিদ্রাহীনতার নদী থেকে ভেসে উঠি। কেন যে ঘুম আসে না তা আমার জানা আছে। একজন সত্তর বছর বয়সের মানুষের ঘুম তো এমনি কমে যায় কিন্তু আমার সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। ঘুম তো ঠিকই পায় কিন্তু ঘুমাতে গেলে পুরান স্মৃতিগুলো মগজের ভিতরে সারিবদ্ধভাবে ঢুকে পড়ে আর কিছু না করতে পারলেও ঘুমকে তছনছ করে দেয়। এই সাত দশকের কতই না স্মৃতি আছে, ভালোবাসার স্মৃতি, প্রতারণার স্মৃতি, মিলন আর বিচ্ছেদের স্মৃতি, জীবনের স্মৃতি, মরণের স্মৃতি। মধুর স্মৃতিগুলো কম বিরক্ত করে কিন্তু তিক্ততায় ভরা স্মৃতিগুলো বড্ড জ্বালায়। এই স্মৃতির থেকে নিস্তার নেই আর ঘুমের সাথে সাক্ষাৎ নেই। এমন অবস্থায় না পেরে একজন  স্নায়ুবিশেষজ্ঞের কাছে গেলাম। ডাক্তার অনেক ভদ্র এবং অমায়িক ছিলেন। আমার সমস্যার কথা শুনে  মুচকি হেসে বললেন, “এই সমস্যা এখন তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে বিশেষ করে বৃদ্ধ লোকদের মাঝে কিন্তু চিন্তার কিছু নেই চিকিৎসা আছে”। আমি চিকিৎসা সম্বন্ধে জানতে চাইলে উনি বললেন, “চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক উন্নতি করেছে এখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আমরা AI-এর সাহায্যে ব্রেইনের কোন কোষে আপনার যে স্মৃতি আপনাকে বিরক্ত করছে তা মুছে দেয়া যায় ফলে ওই স্মৃতি আপনাকে আর বিরক্ত করবে না”। আমি জানতে চাইলাম এটাতে সম্পুর্ণ স্মৃতিতে কোন প্রভাব পড়বে কি না? তিনি বললেন, “না, আপনার অন্যান্য স্মৃতি অটুট থাকবে”। আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে এই প্রক্রিয়া করাতে মনস্থির করলাম এবং ডাক্তারকে লিখিতভাবে যেই স্মৃতিগুলি মুছতে হবে তার বিস্তারিত তালিকা দিলাম। এক শনিবারে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে বলা হল। অপরেশন বলি বা প্রসিডিউর বলি আমি কিছুই টেরপাইনি। তারা আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। 

আরও পড়ুন

×