ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্বাসন ও আশ্রয়

নির্বাসন ও আশ্রয়
×

নুরউদ্দিন ফারাহ [জন্ম: ২৪ নভেম্বর ১৯৪৫]

নুরউদ্দিন ফারাহ

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

লেখালেখির পাশাপাশি আরো একটি প্রসঙ্গ আমার নামের সঙ্গে প্রায় লোকচর্চায় আসে, তা হলো নানা দেশ থেকে বিভিন্ন সময় ‘নির্বাসিত’ হওয়া। সোমালিয়া, উগান্ডা কিংবা যুক্তরাষ্ট্র  নানা জায়গা থেকে নির্বাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে এই অভিজ্ঞতা আমার সাহিত্যকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে।
প্রথম কথা নির্বাসন শব্দটিকে  স্বীকার করি কিনা। যখনই আমাকে বলা হয় আপনি নির্বাসনে আছেন,  সেই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করি।  বলি, যতক্ষণ আফ্রিকায় বসবাস করছি, ততক্ষণ নিজেকে নির্বাসিত মনে করছি না। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ও দেশে থেকেছি– যেমন নাইজেরিয়া, গাম্বিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া; নিজেকে আফ্রিকার নাগরিক মনে করি। এমন কোনো আফ্রিকান দেশে থাকি যেখানে সাধারণ মানুষ আমাকে স্বাগত জানায়। অবশ্য সরকারের বিষয়টা আলাদা। সরকার খুব ততক্ষণই লেখককে স্বাগত জানায়। সমালোচকদের তারা পছন্দ করে না।  প্রায়ই যুক্তি দিই, যেহেতু  আফ্রিকাতেই বসবাস করেছি, তাই  নির্বাসনে নেই। ১৯৭৬ সালে যখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে  আর সোমালিয়ায় ফিরতে পারব না, তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আফ্রিকারই বিভিন্ন প্রান্তে বাস করব এবং আজও তা-ই করছি। যখনই কোনো দেশে নিজেকে হুমকির মুখে মনে হয়েছে, মাঝরাতে আমাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বন্ধুদের বলেছি আমার আসবাবপত্র বিক্রি করে দিতে, তারপর নিজে নিজের মতো এগিয়ে গেছি।  সব সময়ই  কোনো না কোনো দেশ আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকবে, যতক্ষণ না আপনি সেই দেশের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে কিছু বলছেন। সমালোচকরা বলেন আমার সমস্ত সাহিত্যকর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা এবং সমতার ভাবধারা। আমার উপন্যাস ‘ফ্রম আ ক্রুকেড রিব’-এ পিতৃতন্ত্র ও নারীবিদ্বেষের তীব্র সমালোচনা করেছিলাম। পাঠাকরা জানিয়েছেন তখনও আমার ব্যবহৃত অনেক শব্দ তাঁদের দৈনন্দিন পরিচিত শব্দভান্ডারের অংশ হয়ে ওঠেনি। অনেকেই জানতে চান সামাজিক ন্যায়বিচারের দিক থেকে আফ্রিকা বর্তমানে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, এবং আরও এগোতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
‘আফ্রিকা এই অবস্থায় আছে’—এমন একটি ঢালাও মন্তব্য করা আমার জন্য ঔদ্ধত্যপূর্ণ। কারণ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ আফ্রিকায় বহু বৈচিত্র্যময় দেশ রয়েছে। তবে  নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এমন খুব বেশি আফ্রিকান দেশ নেই যেখানে নারী, শিশু ও দরিদ্রদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার বা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সোমালিয়া বিগত ত্রিশ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। এর আগে যখন শান্তি ছিল, তখনও আমরা সোমালিরা নারীদের প্রতি খুব একটা সদয় ছিলাম না।কিছু প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই করা হয়েছিল, তবে তাঁদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে পরিবারের ভেতরে, যেখানে স্বৈরাচারী স্বামীর রাজত্ব চলে।  আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর থেকেই যুক্তি দিয়ে এসেছি, সোমালি সমাজ আসলে স্বৈরাচারী। সোমালি সমাজ একজন মানুষকে তার নিজের মতো চিন্তা করতে দেয় না। নিজের পছন্দের পোশাক পরতে দেয় না। আপনি কী পোশাক পরছেন বা কীভাবে হাঁটছেন—এমন সাধারণ বিষয়গুলোও যদি ক্রমাগত সমালোচিত ও হেয় করা হয়, তবে স্বাধীনভাবে দার্শনিক চিন্তা করা কিংবা নিজের মতামত প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেবল সোমালিরাই এমন নয় যাদের সমাজে এই সংকট আছে।  পৃথিবীর কোনো দেশই পুরোপুরি গণতান্ত্রিক নয়। আমেরিকা নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে, কিন্তু আমরা জানি যে কিছুদিন আগে পর্যন্ত রাজনীতিতে, জীবনযাত্রায় বা সামাজিক পরিসরে নারীদের কোনো স্থান ছিল না। যুক্তরাজ্যের প্রসঙ্গেও গল্পটি ভিন্ন কিছু নয়।। আফ্রিকা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দিকে চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এগোচ্ছি, তবে লক্ষ্য অর্জনে এখনো অনেক কিছু করা বাকি।

একেবারে শৈশব থেকেই  জানতাম যে আমাকে লেখক হতে হবে। সাহিত্যযাত্রায় আমার মায়ের প্রভাব ছিল অপরিসীম। দার্শনিক কোয়ামে অ্যান্থনি অপিয়ার সঙ্গে এক কথোপকথনেও  বলেছিলাম, আমার প্রতিটি সৃষ্টিই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। আমার মা এবং মায়ের বয়সী অন্য নারীদের প্রতি এই গভীর শ্রদ্ধাবোধের কারণটা স্পষ্ট। মা ১৯৯০ সালে মারা গেছেন। আমার মা ছিলেন একজন ‘আফ্রেই’। সোমালিয়ায় কবি বলতে আমরা আফ্রেইদেরই বুঝতাম। নানা ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে আফ্রেইরা তাৎক্ষণিক কবিতা বাঁধতেন। একজন আফ্রেই হিসেবে আমার মাও তাই করতেন। বিয়েবাড়ি হলে কনে বা বরের পরিবার আসত, তিনি সেই উপলক্ষ অনুযায়ী বর বা কনের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করতেন। সবসময় একটা কথা বলি—আমার মা যদি আমার মতো সময় পেতেন,  যে শিক্ষা ও স্বাধীনতা পেয়েছি তা যদি তিনি পেতেন, তবে হয়তো একজন বিখ্যাত কবি হতে পারতেন। তিনি দশটি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাদের মানুষ করেছেন, দিনরাত তাদের কথা ভেবেছেন। তাই ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ‘আ রুম অব ওয়ানস ওউন’-এ যেমন বলেছেন, ঠিক তেমনই আমার মায়ের নিজস্ব কোনো ঘর ছিল না। একটি সন্তান বড় হয়ে ওঠার পর তাঁকে আরেকটি সন্তানের দেখাশোনা করতে হতো।
আমরা সমাজের সেই নারীদের প্রতি অন্যায় করেছি, যাঁরা গোটা সমাজের বোঝা নিজের কাঁধে বহন করছেন। বিশেষ করে সোমালি গৃহযুদ্ধের পর থেকে আমরা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি— যেসব পরিবারে অন্তত একটি বা দুটি কন্যাসন্তান বা একজন নারী ছিলেন সেই পরিবারগুলোই টিকে গেছে। সোমালিরা যখন অন্য দেশে নির্বাসনে গেল, তখন দেখা গেল পুরুষরা ভেঙে পড়েছে। তারা তেমন কিছুই করতে পারছে না। তারা রান্না করতে জানে না, কীভাবে নিজের খেয়াল রাখতে হয় জানে না। কারণ সমাজ তাদের অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়ে নষ্ট করেছিল।
তাই বলব, অন্য আটদশটা নারীর যে সমস্যা ছিল, আমার মায়েরও একই কষ্ট ছিল। তবে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতার আসল কারণ হলো, তিনি আমার বাবার চেয়েও অনেক বেশি জ্ঞানী ছিলেন। তিনি সবসময় নিশ্চিত করতেন যেন অল্প বয়সে বা বিশের কোঠায় থাকা অবস্থায় সরকারের সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে না পড়ি। মায়ের বুদ্ধির কারণেই  একাধিকবার জেলে যাওয়া থেকে বেঁচে গেছি। একবার আমাকে গ্রেপ্তার করার একটা চেষ্টা হয়েছিল। তখন আমার মা গ্রিক পৌরাণিক চরিত্রের মতো সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আমার ছেলেকে গ্রেপ্তারের কোনো অধিকার তোমাদের নেই।” 
সোমালীয় কথাসাহিত্যিক। তাঁর সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ থেকে অনুলিখিত

আরও পড়ুন

×