কিংবদন্তির শহীদ কাদরী: সময়বিমুখ পাঠক
শহীদ কাদরী [১৪ আগস্ট ১৯৪২–২৮ আগস্ট ২০১৬]
শিহাব সরকার
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৃহত্তর বাংলায় এবং বাংলাদেশের কবিতার নিরিখে আমরা শহীদ কাদরীকে কিংবদন্তিতুল্য কবি হিসেবে অভিহিত করে আসছি। আয়রনি এই, তাঁর বোদ্ধা পাঠক কমে আসছে ক্রমশ। সেটা বৃহত্তর বাংলা এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা– উভয় ভূখণ্ডের পাঠকের নিরিখে। এই প্রবাদপ্রতিম কবি কি কোনো নিজস্ব দুরূহ বাকভঙ্গি ব্যবহার করেছেন কবিতায়? বা তাঁর কবিতা কি ঠাসা থাকে সাধারণ পাঠকের অজানা পুরাণে বা পৌরাণিক চরিত্রে?
না। একবিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশে দেখছি শহীদ কাদরীর সঙ্গে কবিতামগ্ন পাঠকের এক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। শহীদ কাদরীর বাকভঙ্গি আর তাদের টানে না। কবিতায় তিনি বারবার নতুন পাঠককে একবিংশ বা বিংশ শতাব্দীর যে সন্ধিক্ষণের কথা বলেছেন– সেই দুঃসময়ের চিত্র দেখতে কি অনীহা পাঠকের? কেউ কেউ তাই বিশ্বাস করে। সোজা কথায়, শহীদ কাদরী এবং তাঁর এককালের বিশাল পাঠকের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে চলেছে। কারণ একটাই। অধিকাংশ পাঠক সময়বিমুখ। তারা রূঢ় সত্যভাষণ শুনতে চান না।
ব্যক্তি শহীদ কাদরীর এমন এক চৌম্বক শক্তি আছে, যার টান অপ্রতিরোধ্য, বিশেষ করে সেসব মানুষের পক্ষে, যারা সাহিত্য ও সুকুমার শিল্পের প্রতি অনুরক্ত। শহীদ ভাই নিজে ছিলেন অসম্ভব আড্ডাপ্রিয়, বুদ্ধিদীপ্ত কথায়-হাসি-ঠাট্টায়-ব্যঙ্গকৌতুকে এবং জ্ঞানের দ্যুতিচ্ছটায় উজ্জীবিত করে রাখতেন তাঁর চারপাশের মানুষকে। ফলে যারা অনেক পার্থিব জরুরি কাজের চেয়ে শুধু আড্ডায় সময় পার করে দিতে চান, শহীদ ভাই তাদেরও টানেন সমান শক্তিতে।
আমার সৌভাগ্য, সত্তর দশকের শুরুতেই আমি শহীদ ভাইয়ের আকর্ষণ কোথায় ধরতে পেরেছিলাম। দুই দশকের অধিক সময় ধরে তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। কিন্তু আমার একান্ত কবিতাভাবনার মুহূর্তগুলোতে, সাহিত্যের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা নিয়ে স্মৃতিচারণের মুহূর্তগুলোতে তাঁর প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি টের পাই। আমার একধরনের অহংকার হয় এই ভেবে যে, আমি যখন নিতান্তই এক তরুণ কবি, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সেই টালমাটাল দিনগুলোতে শহীদ ভাইয়ের বিশেষ মনোযোগ কাড়তে পেরেছিলাম। আমার জীবনের অনেকগুলো মুহূর্ত কেটেছে তাঁর সঙ্গে আড্ডায়। বনেদি রেস্তোরাঁ রেক্স উঠে গেলে আমরা বসতে শুরু করি নিউমার্কেটের লিবার্টিতে। একই সঙ্গে সিকদার আমিনুল হকের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়, মাঝে মাঝে বুড়ো ভাই– বিপ্লবের র্যাঙ্কিন স্ট্রিটের অগোছালো ঘরটিতে। সত্তরের মাঝামাঝি সময়ে শহীদ ভাই লুম্বাগোতে আক্রান্ত হলেন। চিকিৎসা তিন মাস স্রেফ কাঠের তক্তায় টানটান হয়ে শুয়ে থাকা। ঐ সময়টা ঢাকার কবিদের প্রায় দ্বিতীয় ঠিকানা হয়ে গিয়েছিল পুরানা পল্টনে শহীদ ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ির দক্ষিণদিকের পুকুর-লাগোয়া ঘরটি। সকাল ১০টা-১১টায় শুরু হতো আড্ডা, ভাঙত দুপুর রাতে। কে না গেছে শহীদ ভাইয়ের সেই আড্ডায়?
কবি ও ব্যক্তি শহীদ কাদরী তখন বাংলাদেশের কবিতার জগতে জীবন্ত কিংবদন্তি। বরাবরই কম লেখেন কাদরী ভাই, সত্তরের মধ্যপর্বেও তাঁর মাত্র একখানা বই ‘উত্তরাধিকার’।– তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কবিতায় তাঁর সে সময়ের একক এবং প্রবল প্রতাপ আজ কল্পনাই করা যায় না। এটা এমনিতেই হয়নি। অগাধ ছিল সাহিত্য এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পড়াশোনা, প্রখর ছিল শিল্পবোধ, ছিল কবিতার ভালো-মন্দ বিচারের ঈর্ষণীয় ক্ষমতা। তিনি অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন, কিন্তু শহীদ ভাই যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে নাম ধরে ধরে বলতে পারতেন, বাংলাদেশে অমুক অমুক কবি, অমুক আধা-কবি বা অমুক আদপেই কবি নন। পরবর্তীকালে তাঁর কথাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ফলে গেছে। তরুণ এবং প্রবীণ, উভয় বয়সের কবিকে ব্যগ্র থাকতে দেখেছি তাদের কবিতা সম্পর্কে শহীদ ভাইয়ের মন্তব্য শোনার জন্য।
১৪ আগস্ট, ২০০২-এ ষাট বছর পূর্ণ করেন শহীদ কাদরী। এ বয়সে অনেক শিল্পী পূর্ণোদ্যমে নতুন কাজে হাত দেন। আমার ধারণা, শারীরিক কারণে বা ব্যক্তিগত বিষাদে বিপর্যস্ত
শহীদ ভাই কিছুটা নমিত হয়ে এলেও তাঁর ভিতরকার প্রবল তারুণ্য এবং সজীবতা আগের মতোই অটুট ছিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এই তো সেদিন, ঢাকার এক দৈনিকের সাহিত্য পাতায় একদল বাংলাদেশি তরুণ লেখকের সঙ্গে তাদের নিউইয়র্কের বাসায় সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ আড্ডা এবং কথোপকথনের ওপর চমৎকার একটি লেখা পড়লাম। ঐ লেখায় জানতে পেরেছি, তিনি নতুন কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করছেন। আমার বিশ্বাস ছিল, ষাট বছর পূর্তির পর শহীদ ভাই ফের প্রবলভাবে উপস্থিত হবেন বাংলাদেশের কবিতায়। আমাদের কবিতায় তাঁর স্থানটি শূন্য পড়ে রইল।
১৯৯১-এর অক্টোবর মাসের এক সকাল। যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মে ফ্লাওয়ার হলে আমার আটতলার রুমে হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। নিজের হাতে বানানো নাশতা খেয়ে সবে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়েছি। রিসিভার ধরে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপার থেকে বহু-চেনা, ভরাট গলাটি ভেসে এলো, ‘শিহাব, আমি শহীদ কাদরী।’ পনেরো বছর পর শহীদ ভাইয়ের গলা শুনছি। আবেগ এবং উত্তেজনা ধরে রাখতে পারি না। ‘শহীদ ভাই কেমন আছেন? আমেরিকা এসেই আপনার অফিসে ফোন করেছি... নাম্বার দিয়ে রেখেছিলাম... আমি আইওয়া ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে এসেছি... অনেক দিন থাকব। আপনি কেমন আছেন?’ একনাগাড়ে বলে ফেললাম।
কথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।
আমার কথার তোড় কিছুটা সামলে শহীদ ভাই শুরু করলেন তাঁর কথা। প্রায় এক ঘণ্টার আলাপ। শহীদ ভাই তাঁর কাছের মানুষদের খবর নিলেন। বিশেষ করে জানতে চাইলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হক এবং আমাদের সবার প্রিয় বুড়ো ভাই (মোশাররাফ রসুল) প্রমুখের কথা। আমি জানতাম তিনি বোস্টনের কাছে স্যালেম নামক একটি ছোট শহরে আমেরিকান স্ত্রীর সঙ্গে থাকেন। লেখা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। প্রচণ্ড পরিশ্রমের চাকরি করেন। তবু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাঁর জীবনযাপন, লেখালিখি সম্পর্কে জানতে চাইছিলাম। প্রচণ্ড হতাশা এবং ক্লান্তি ফুটে উঠল তাঁর কণ্ঠস্বরে। জানতে চাই, দেশে ফিরবেন কবে? পনেরো বছর ধরে স্বেচ্ছা-নির্বাসিত কবি বললেন, ‘দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু আমি যে এখানে বাঁধা। ইচ্ছে করলেই ফিরতে পারব না।’ আন্দাজ করি তাঁর দুরারোগ্য ব্যাধিতে শয্যাশায়ী স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করছেন। আমার কানে এখনও বাজে জন্মভূমিতে ফেরার জন্য ব্যাকুল শহীদ কাদরীর গলা, ‘দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু আমি যে এখানে বাঁধা।’ শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে এই কথোপকথন নিয়ে আমার একটি কবিতা আছে আমার ‘ব্যাবিলন এক্সপ্রেস’ বইয়ে।
এ ঘটনা তখন থেকে এগারো বছর আগের। শহীদ কাদরীর এই আমেরিকান স্ত্রী গত হয়েছেন সম্প্রতি। যে সময়ের কথা বলছি, তখন শহীদ ভাই মুক্ত বিহঙ্গ। মন চাইলেই বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারতেন। তাঁর সান্নিধ্যে আবার সরগরম হয়ে উঠত ঢাকার কবিতার জগৎ। নিজের কবিতার ব্যাপারেও নতুন করে হয়তো চিন্তাভাবনা করতেন। ৭৪ বছর বয়সে আমাদের পঞ্চাশ দশকের এই প্রধান কবি যদি স্বেচ্ছা-নির্বাসনের ধূসরতা ছিন্ন করতে চাইতেন, এবং স্বদেশে ফিরে আসতেন, আমরা মোটেই অবাক হতাম না।
এ কথা বলতেই হয়, শহীদ কাদরী তাঁর আমেরিকা-বাসের ওই সময়ে বারবার বলতেন যে, একটা বড় দুঃসময়ের অন্ধকার গ্রাস করতে যাচ্ছে এই উপমহাদেশকে। এবং তার আশপাশের এলাকাকে। পুরো বিশ্বও বাদ যাবে না এই ভয়াবহ সময়ের থাবা থেকে। আমি ওই সময়ের ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি।
মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকে কবি কিডনিজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে হুইলচেয়ারে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু হয় নিউইয়র্কে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রাণপ্রাচুর্যে টগবগে। তাঁর বাসার নিচতলা খোলা জায়গায় সাপ্তাহিক কবিতা পাঠের আয়োজন করতেন।
- বিষয় :
- গল্প