ইতিহাসের মাটিতে পুঁজিবাদের শিকড় সন্ধান
রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
পুঁজিবাদকে বর্তমান বিশ্বের একটি অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কেন? কী কারণে? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিতে বরেণ্য লেখক, প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই প্রবন্ধ সংকলন। যেখানে তিনি পুঁজিবাদের শিকড় চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে অনুসন্ধান করেছেন একটি পথের যা দেখাবে পুঁজিবাদের দুঃসাশন থেকে মুক্তির দিশা। এও জানিয়েছেন, দার্শনিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সমাজ-সংস্কারক– সবাই চেষ্টা করেন পথের বিষয়ে নিজেদের চিন্তা ও দুশ্চিন্তাকে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং আশা রাখেন নিজেদের ভাবনাগুলোকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়িত করার। ‘অবিরাম পথ খোঁজা’ বইয়ের ভূমিকায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্বীকার করেছেন, ‘মানুষের চলার যে বিরাম নেই যেমন সত্য, সংলগ্ন সত্য তেমনি এটাও যে মানুষকে পথচলার জন্য সঞ্চয় এবং পথের সন্ধানও অবিরাম গতিতেই করতে হয়েছে। বৃত্তের বন্ধনটা যদিও বাস্তবতা, তবু তাকে ভাঙা না হোক অন্তত ডিঙানোর চেষ্টা করে উপায় থাকে না। এ বইতে অত্যন্ত উঁচুমানের কিছু মানুষের চিন্তা, কয়েকটি ঘটনা, এবং সেসব মূল্যবান চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে।’
‘অবিরাম পথ খোঁজা’র প্রথম প্রবন্ধ ‘দর্শনের সুখানুসন্ধান’-এ সাধারণ মানুষের দুটি জিজ্ঞাসাকে তুলে আনা হয়েছে। যার প্রথমটি হলো ‘সুখ’ আর দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা হলো– ‘সুখের পথে পথে অন্তরায় কোথায় এবং সে অন্তরায় দূর করার উপায় কী? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আলোচনা শুরু প্লেটোর দর্শন দিয়ে। যেখানে প্রজ্ঞাবান ও প্রভাবশালী এই দার্শনিক একটি আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা প্রচার করেছেন। সে রাষ্ট্রের অনেক কিছুই কৌতুহলোদ্দীপক; কিন্তু সুখের প্রশ্নে সত্য হলো এটি, প্লেটো যদিও সবার সুখের কথাই বলেছেন, তবু তাঁর বিশেষ পক্ষপাত কতিপয়ের সুখের দিকে। এও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্লেটো ছিলেন অভিজাত শ্রেণির মানুষ। তিনি ও তাঁর শিক্ষক সক্রেটিস দুজনেই ছিলেন গণতন্ত্রবিরোধী। কেন? সে প্রশ্নের জবাবও উঠে এসেছে স্পার্টার সঙ্গে এথেন্সের ২৭ বছরব্যাপী চলা যুদ্ধে পরাজয় ইতিহাস টেনে এনে। যার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, স্পার্টার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র চেয়েছেন; যেখানে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকবে কিন্তু সামরিকতন্ত্র থাকবে না। একইভাবে টমাস মুর, উইলিয়াম টিন্ডেল, জন উইক্লিফ, এরিস্টটল, ফ্রান্সি বেকন ম্যাকিয়াভেলিসহ আরও কয়েকজনের দর্শন, রাষ্ট্রের গঠন ও শাসনতন্ত্র নিয়ে তাদের ভাবনা, উদারনীতি, পুঁজিবাদের যৌক্তিকতা এবং জ্ঞানের জগৎ নিয়ে আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। যার সমাপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘এখন আমরা আওয়াজ এবং তথ্য যত পাই, জ্ঞান তত পাই না। তা জ্ঞানেরও তো দিগ্বিদিক আছে, সেই জ্ঞান এখন খুব বেশি দরকার সুখকে, যা সর্বজনীন করার দিশা দেবে আর দেবে আনন্দ। তেমন আনন্দ যা বিনোদনের অধিক। তখন মানুষ আর প্রয়োজনের জগতে আটকে থাকবে না, পৌঁছে যাবে মুক্তির জগতে।’
দ্বিতীয় প্রবন্ধে লেখক আলোচনা করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাঙালিত্ব নিয়ে। তাঁর সাহিত্যের নানা দিক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে, মধুসূদন কেবল অসাম্প্রদায়িক নন, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সবকিছুর আগে মনেপ্রাণে তিনি বাঙালি। যিনি নিজ রচনার মধ্য দিয়ে বাঙালি সত্তার প্রকৃত অবয়ব তুলে ধরেছেন। দেখিয়েছেন পুঁজিবাদের অন্ধকার দিকগুলো।
অন্যদিকে ‘চীন দেশে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে সেই অতীত তুলে এনেছেন, যেখানে রবি ঠাকুরের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে দেখা গেছে চীনাদের। রবীন্দ্রনাথ অনুধাবন করেছিলেন, চীনাদের দৃঢ় মানসিকতা তাদের দেশকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাবে; তারপরও বিপ্লব সেখানে অনিবার্য। বিশ্বকবির এ ধারণা পরবর্তী সময়ে সত্যি বলে প্রমাণ হয়েছিল। অথচ তার আগে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার জগৎ কোনো চীনাদের কাছে গুরুত্ববহ হয়ে ওঠেনি। কারণ শুরু থেকে তাঁকে কবি হিসেবে দেখেছেন তারা।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক একদিকে তাঁর রচনার সুখ্যাতি যেমন করেছেন, তেমনি দেখিয়ে দিয়েছেন সামন্তবাদ তার কাহিনি ও চরিত্রগুলোয় কতটা প্রভাব ফেলেছে। একইভাবে সৈয়দ শামসুল হকের সাড়াজাগানো রচনা ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’র আলোচনার মাধ্যমে একদিকে যেমন পেটি বুর্জোয়াদের অংশকে দেখানো হয়েছে, তেমনি সংগ্রামী চরিত্র দিয়ে সব্যসাচী লেখক কীভাবে রাষ্ট্র ব্যবস্থার করুণ দিকটি উন্মোচন করেছেন, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘ভয় পেতে নেই’, ‘ট্রাম্প, সু চি এবং কাস্ত্রো’ এবং ‘পথ জানি কি’ প্রবন্ধগুলোয় সাম্প্রতিক বিশ্বের যে চিত্র তুলে ধরে, একটি সঠিক পথ খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, তা পাঠকমনে দারুণভাবে ছাপ ফেলে। এর বড় কারণ প্রবন্ধগুলো অনেকটা গল্পের আদলে তুলে আনার চেষ্টা ছিল। এটাই মূলত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখনীর শক্তি।
- বিষয় :
- গল্প