হীরালাল
অলংকরণ :: সাফায়েত সাগর
আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাখীমারা গ্রামের সবাই জানে হীরালাল ওরফে হিরকচাঁদ হাজরা একজন নপুংসক, কিন্তু সে কি সত্যিই নপুংসক ছিল বরাবর? প্রথম বউয়ের গর্ভে তো সতীশের জন্ম হলো। সতীশের মা কাজরী স্বামী হীরালালের মায়ের কারণে ঘরসংসার করল না। জাঁদরেল-বজ্জাত শাশুড়ি বটে হীরালালের মা! পরের বাড়ির ঝি কি আর অত সহ্য করবে। পান থেকে চুন খসলেই কী সে লঙ্কাকাণ্ড। সেই সঙ্গে হীরালালের মদের নেশায় সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসার অবস্থা। একদিন হীরালালই বলে, যেভাবেই হোক প্রতি রাতে নেশার টাকা আমার চাই... একরাত্রে তো লাখাইগঞ্জের পাট ব্যাপারী মজিদ খন্দকারের বখাটে ছেলে কামাইলাকে নিয়ে আসে। কাজেরিকে ওর সঙ্গে শুতে বলায় গোখরা সাপের মতো ফোঁস করে ওঠে। হীরালালের মা বোঝে ছেলে তার ভালো মক্কেল ঘরে এনেছে। অভাব নামের সেই বজ্জাত ছোঁয়াচে রোগবালাই পালিয়ে যাবে বউটার কল্যাণে। মনটা তার ভরে ওঠে আনন্দে, সুখের দিন শুরু হতে যাচ্ছে এবার। কাজেরির তর্জন-গর্জন আর ফোঁসফোঁসানি শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে চিৎকার দেয়, অমন মানুষের সঙ্গে শুবি-নে তো...
কাজরি এক রাত্রে বাপের দেশ লোহরশালী চলে যায়। সতীশকে ধরে-বেঁধে রেখে দেয় কালনাগিনি শাশুড়ি। বয়স ওর কতই-বা হবে তখন, বড়জোর তিন থেকে চার হবে। হিরক অর্থাৎ হীরালাল এখন আর আগের মতো নেই। অনেক বদলে গেছে, কালে-কালে অনেক শিখেছে, অনেক দেখেছে। সতীশ বড় হয়েছে, স্কুলে যায়, হীরালালের মা’টা কয়েক বছর আগে মরে গেছে। হাট-ঘাট করে সুস্থ-সুন্দর জীবন কাটায় হীরালাল। মাঝরাত্রে কখনও-সখনও ফেলে আসা বিদগ্ধ দিনগুলো বড় যন্ত্রণা দেয় তাকে, মাঝে বেশ কবার শ্বশুরবাড়ি গেছে কাজেরিকে ফিরিয়ে আনার জন্য, কিন্তু শালা-সম্বন্ধীরা দেখা অবধি করতে দিতে চায় না। মুখের ওপর বলে ওঠে, কাজেরি আর তোমার সংসার করবে না।
হীরালাল অনেক বুঝিয়ে বলেছে, আর কোনোদিন অমন হবে না, এমন সে বেশ ভালো হয়ে গেছে। উত্তরে স্পষ্ট জানিয়েছে, কয়লা যায় না ধুলে আর এল্লত যায় না ম’লে, ব্যর্থ হয়ে প্রতিবারই ফিরে এসেছে, নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়, কুয়াশায় আচ্ছন্ন চোখজোড়া কেমন বিবর্ণ আর তামাটে দেখায়, যেমন কর্ম তেমন ফল আর কি! তুলসীতলায় মাথা কোটে, পুরোনো প্রেম জাগ্রত হলে মনটা কেমন-কেমন করে ওঠে। হয়তো তখন চোখ দিয়ে ফোঁটা-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, বেপরোয়া শ্রাবণ মাসের পদ্মা নদীর মতো উথলে ওঠে গ্লানি আর যন্ত্রণাসিক্ত মরা প্রেম। কাজেরির স্মৃতি সতীশই এখন হীরালালের একমাত্র ভরসা। দ্বিতীয় সংসার করার কোনো ইচ্ছে নেই বলেই না আর ও’পথে পা বাড়ায়নি। নিষ্ঠুর পরিণতির জন্য সেই যে দায়ী, সে কথাও কোনোদিন ভুলে যায় না। অনুশোচনায় কান্না পায়, কিন্তু কান্নাও যেন কণ্ঠনালির মধ্যে আটকে যায়। একেই কি জীবন বলে?
মাঝে-মাঝে শেষ রাত্রের বিছানায় নিজেকে অন্যরকম ভাবে আবিষ্কার করে হীরালাল, ঘুম থেকে ওঠে বাইরে বের হয়ে আকাশ দেখে। সিল্কের মতো আকাশ যেন ভালোবাসার কতকগুলো অনাবিল শ্বেতশুভ্র বক অথবা কাশফুল, ওর বুক জুড়ে ভালোবাসা ছাড়া যেন-বা আর কিছু নেই। কান্নার গুমোট পাথর বুক থেকে নেমে গেলে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। তখন আলতো চুমু দেয় নদীর চলমান হাওয়া। দূরের নীল জমিনের মতো প্রকাণ্ড আকাশটাকে কাছে পেতে সাধ হয়। কাজেরিকে কাছে পেয়েও কোনোদিন মনের কথা বলতে পারেনি। মানুষ যে কখনও-সখনও মানুষ থেকে নেমে অমানুষে পরিণত হয়, তার জ্বলন্ত প্রমাণ আসলে যে নিজে। বুকের মধ্যে ভয়াবহ কষ্ট বোয়াল মাছের মতো খাবলায় দিবানিশি। কাজেরিকে সে কি কোনোদিন এতটুকু ভালোবেসেছিল? কাজেরি সংসার করতে পারেনি। তার সম্ভম ছিনিয়ে নিয়েছিল পিশাচ হীরালাল। লোহরশালী গ্রামের মানুষজন জানে পাখীমারা গ্রামের হীরালাল নামের একজন জানোয়ার ইতর শ্রেণির প্রাণী আছে। নিজের বউকে অন্যের হাতে স্বেচ্ছায় অর্পণ করতে যার বুক এতটুকু কাঁপে নাই। মানুষ কি এতটাই নিম্ন পর্যায়ে নামতে পারে কখনও?
আজ সে একেবারে অন্যরকম মানুষ, মনেপ্রাণে ভালোবাসে কাজেরিকে, কিন্তু কাজেরি তো সে কথা কখনও জানে না, হীরালাল শুনেছে কাজেরি আজও শাঁখা-সিঁদুর লোহার পলা পড়ে। তার মানে তাকে আজও স্বামী বলে স্বীকার করে। বিয়ে সে করবে না। অবশ্যই ওর দাদা-ভাইরা দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলেছে, অথচ কাজেরি সে ব্যাপারে একেবারে নীরব, বলে কি না, হিন্দু মেয়েদের বিয়ে তো ওই একবারই হয়। কাজেরির সব কথাই হীরালালের কাছে উড়ে আসে। সে মনে-মনে নতুন করে কাজেরিকে ভালোবাসে, কাজেরির পথের দিকে সন্ধান করে সেই পুরোনো ছায়া।
হাটঘাটের চেনা-পরিচিত মানুষজন হীরালালের দিকে আড়চোখে তাকায়। ওদের অমনভাবে তাকানো দেখে মাঝে-সাঝে হীরালালের শরীর জ্বলেপুড়ে যায়, ওদের বাক্যবাণে কানের মধ্যে সিসা ঢালার যন্ত্রণা অনুভব করে। কেউ-কেউ আবার একধাপ এগিয়ে এসে বলেই বসে, কি রে হীরা, তুই বাঁজাপুরুষ তা তো আগে বলতে হয়, তোর ডাগর বউটা...
হীরালাল থেমে যায় মুহূর্তে, কাছেপিঠে কোনো মুগুর বা বাঁশ অথবা চেলাকাঠ থাকলে মেরে একেবারে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে ফেলত। শত-শত মানুষের শত-শত ব্যঙ্গ কথাগুলো বড় বেশি কামড়ায় শরীরখানাকে।
বিকেলের দিকে বাঁশঝাড়ের কাছাকাছি বসে হীরালাল, শীতের নরম বাতাস খেলে যায়, বাঁশঝাড়ের ভেতর পাখিদের কিচিরমিচির। পাখীমারা গ্রামটা এককালে নাকি পাখিশূন্য ছিল। সে কারণে এমন একটা হতচ্ছাড়া নাম এঁটে দিয়েছে কেউ। হীরালালের চোখের কোণে অশ্রু জমে। দূরের আকাশের পাখিদের খেলা দেখতে-দেখতে সময় কাটায়। তালগাছের ঝুলন্ত বাবুই পাখিদের বাসাগুলো একেকটা ভালোবাসার ঘর। মাটি-খড় লতা-পাতা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কি সুনিপুণভাবে বাবুই পাখিরা এমন বাসা বানায়। ভালোবাসা আর আনন্দ গচ্ছিত থাকলে পাখিরাও শিল্পী হয়ে যায়। আর মানুষ?
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় এসে মেশে, সন্ধ্যার আগমনি বার্তা পেয়ে গেছে পাখিরা, আর তাই ঘরে ফেরার বার্তা পেয়ে তাড়া এখন তাদের পাখায়। কিচিরমিচির কলরবে ভরে যাচ্ছে চারদিকে। সূর্যটা রক্তিমাভা আলো ছড়িয়ে আকাশের পশ্চিম কোণে ডুবে যাওয়ার অপেক্ষায় সময় গুনছে। সূর্যটাকে এখন অনেকটা ডালিম ফুলের পাপড়ির মতো মনে হচ্ছে। সুন্দর হাসছে। এমন সুন্দর হাসি শুধু সদ্য-প্রসূতির ঠোঁটে লেপ্টে থাকে। গোধূলি ধূসর বেলায়, কার ভালো লাগে আর শূন্য ঘরে প্রত্যাবর্তন? দিনকে দিন হীরালালের মনে হয়, তার ঘরটা এক মহাশ্মশান বই তো কি! অন্ধকার থকথক করে আর অশ্লীল হাসি বাতাসে ঢেউ দেয়। বাতাসও যেন বৈরী। পাথরের মূর্তির মতো সে নিষ্প্রাণ একটা মানুষ। বুকে এক হিমালয় চিৎকার। মাথার ভেতর ছুটন্ত ট্রেনের হুইসেল। কতবার ভেবেছে এমন করে জ্বলেপুড়ে নিঃশেষ হওয়ার চেয়েও আবার খারাপ হয়ে যাবে ঠিক আগের মতো। এভাবে কি মানুষ কখনও বাঁচে? বাস্তবে জীবন যে কাকে বলে তাও কি হীরালাল জানে? পুথিবিদ্যা না হলে নাকি জীবন সম্পর্কে মানুষ একেবারে অজ্ঞ রয়ে যায়। হয়ত সে সারাজীবনই অজ্ঞই রয়ে গেল। জীবনকে নিয়ে ভাববার সময়ই-বা আর কতটুকু পেল জীবনে। আজকাল জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে কেমন হোঁচট খাচ্ছে পায়ে-পায়ে।
আজ পাখিরা ঘরে ফেরে, কিন্তু হীরালাল বসে থাকে অনড়। কি একটা ফুলের ঘ্রাণ মাতিয়ে রেখেছে চারদিক। পাতার মর্মর ধ্বনি বাতাসে। বাঁশের কচি পাতার শিরশির শব্দ কানে আসে। আকাশটাকে শামিয়ানা টাঙানো মনে হয় তার কাছে। চাঁদ উঠেছে কি? কিছুই আন্দাজ করা যাচ্ছে না, কুয়াশায় ডেকে আছে চারদিক। মশারির জালের আচ্ছাদন ছিন্নভিন্ন করে ঝিরঝিরিয়ে কুয়াশা নেমে যাচ্ছে গাছের শরীরে, পাতার বুকে, মাটির গায়ে।
হীরালাল মানুষ বলেই কি তাকে কুয়াশার চাদর ঢেকে নিচ্ছে না? বিড়ালের পায়ে অন্ধকার এসে ঢেকে ফেলে চারপাশ। অনেকটা সময় পার হয়ে যাচ্ছে, হীরালালের কাছে মনে হয় সে যেন যুগ-যুগান্তর থেকে মহাকাল কেটে গেছে। এতটা সময় ধরে আকাশের নিচে বসে-বসে পৃথিবীটাকে দেখছে। পৃথিবীর আলো-আঁধারি বাতাস প্রকৃতি প্রেম-ভালোবাসা তাকে কোনোভাবেই আকর্ষণ করতে পারছে না।
জামতৈলী হাটের কাদের গায়েনের মৃত্যু হলো কয়েক মাস আগে। মানুষটা সারাজীবন ওই একটা কথাই বলল, “পৃথিবীর এতটুকু সাধ্য নেই মানুষকে টেনে বেঁধে ধরে রাখে!” কী বাস্তব সুন্দর কথা। ওই কাদের গায়েনকে বড় বেশি মনে পড়ে আজ। গান গাইতে তার সত্যিই জুড়ি নেই সাতগাঁয়ে। এমন প্রাণকাড়া ছন্নছাড়া সুর তার গানে! সুর তো নয় যেন অন্য কোনো জগতের প্রেমের ইন্দ্রজাল। অমন সুর আর গানের বাণী সাজানো কি আর চাট্টিখানি কথা? বাউন্ডুলে ওই মানুষটা সুরের সাধনায় জীবনটাকে উৎসর্গ করেছে। ফলে সুর তার অস্তিত্বের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো। জীবনকে ভাঙা শত-বিভক্ত আয়নার মতো ভাবত সর্বদা। সেখানে মুখ দেখা ঠিকই কিন্তু সে মুখের আদল বড় বীভৎস দেখায়। নষ্ট আতাফলের কালো বিচির মতো। কাদের গায়েন মানুষটাও চিরকাল নিঃসঙ্গ থেকে গেল। সংসারের কথা বললে, সুস্পষ্ট বলত, “গায়েনদের ব্রহ্মচারী হতে হয়। জীবনের চরম স্বাদ তো ওই একাকী জীবনে। তা ছাড়া অন্ধকার কবরে মানুষকে একলা থাকতে হবে। তাই এখন থেকেই তৈরি হচ্ছি রে...”
মৃত্যুর পূর্বে মানুষটার গভীর চোখ দুটোতে কিসের এক মায়াবী ছায়া খেলছিল, হীরালাল খুব কাছে থেকে মানুষটাকে মরে যেতে দেখেছে। মৃত্যু যে অমন সুন্দর আর স্বচ্ছ নির্মল হয় কোনোদিন ভাবেনি। যাওয়ার সময় ঠোঁট দুটো শিরশিরিয়ে একটু নড়েছিল। কণ্ঠে হয়তো কোনো নতুন সুর খেলছিল। আর হাতের নরম আঙুল দিয়ে মনে-মনে ছুঁয়ে দিয়েছিল এক অদৃশ্য একতারা। বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে হীরালাল দেখেছে মানুষটার সুন্দর মৃত্যু। শুভ্র শাদা কাফনে সেজেছিল যেন বিয়ের দুলা। স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে মতো পালকির বেয়ারারা বুঝি তাকে নিয়ে যেতে থাকে। হীরালালের চোখ ফেটে অশ্রু ঝরেছিল। অমন মানুষ কি আর জন্মাবে কখনও? কেন মানুষ একবার চলে গেলে ফিরে আসে না? কাজেরির মতো অমন অভিমানে মানুষ কেন থাকে?
একদিন সতীশকে সঙ্গে নিয়ে লোহরশালী গ্রামের পথে হাঁটে হীরালাল। কাজেরিকে যদি তাকে ফিরিয়ে আনা যায় এই ভরসায়। আলপথ ধরে-ধরে, বাঁশঝাড়ের সীমানা পেরিয়ে পানের বরজের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে সময় সংক্ষিপ্ত করার জন্য। দূরের আসমানে পঙ্গপালের মতো জমাট বাঁধা মেঘের চাপচাপ আচ্ছাদন দেখতে পায়। ঝেপে বৃষ্টি হবে বোঝা যায়। তুলোর মতো বিচ্ছিন্ন কিছু মেঘ উড়ে যাচ্ছে কোথাও। তাবৎ আসমান মেঘেদের স্পর্শে কাতর এখন। দুপুর পেরিয়ে বিকেল গিয়ে সন্ধ্যা উঁকিঝুঁকি দিয়ে এখন রাত্রে এসে ঠেকেছে, পথ যেন-বা আর শেষ হতে চায় না। একটা পথের বাঁক শেষ হয় তো আরেক পথের সীমা এসে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মনটা একটু-একটু সংকুচিত হতে থাকে।
সতীশের আগ্রহ আগের মতো নেই এখন। তবে মা’কে দেখতে যাওয়ার আনন্দ একটু মিইয়ে গেলেও প্রাণশক্তি বা উদ্দামতা কমেনি। দীর্ঘ পথ হাঁটার পরিশ্রমের ছাপ দুচোখে।
একসময় লোহরশালী গ্রামে পৌঁছে যায় তারা। শ্বশুরবাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায়। একটু পরেই বৃষ্টি হবে আকাশের গোমর দেখে অনুমান করা যায়। সতীশ হনহনিয়ে বাড়ির একেবারে অন্দরে চলে যায়। হীরালালের মনে আশার সঞ্চার হয়। সন্তানের মুখ দেখে কাজেরি কি ফিরে আসবে তার সংসারে? ক্ষমা পাওয়ার কোনো যোগ্যতা কি হীরালালের নেই? শরীর বড় ক্লান্ত হয়ে আছে, তবু বুকের ঠিক মাঝামাঝি জবা ফুলের ভালোবাসা। সন্ধানী চোখ লক্ষ্য করে বাড়িটা কেমন নিস্তব্ধ আর শান্ত শিশুর মতো। রোগশয্যায় দিনাতিপাত করছে কি এই মস্ত বাড়ি? কোথায় একটা অসুখ দগদগে ঘা। মনটা আর থিতু থাকে না। চরকা-নাচনের মতো অনবরত ঘুরছে। উত্তেজনায় শরীরে কেমন একটা নেশার মতো টান পড়ে। বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে ঘনান্ধকার ধীর পায়ে নেমে এসে বিদঘুটে করে তুলেছে পরিবেশ। ধীরে-ধীরে কালীদাসের মেঘরমণী ঘিরে ফেলে সমগ্র আকাশ। অকস্মাৎ বাড়ির ভেতর থেকে সজল চোখে সতীশ বেরিয়ে আসে বার-বারান্দায়।
হীরালাল তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। সতীশের ম্লান মুখে কীসের কালো ছায়া? সতীশ ডাকল, “বাবা...”
কাজেরি নেই। আকাশের কোটি-কোটি তারকার মাঝে কাজেরি মুখ লুকিয়েছে। আর কোনো কষ্ট নেই তার। সতীশ নদীর স্রোতের মতো কথা বলে যায়। সব কথা কি শোনা যায়?
অনেকটা সময় পরে বাড়ি থেকে সতীশের এক মামা বাইরে এলো। কত কী যে বলল, হীরালালের কানে কিছুই তা গেল না। বদ্ধ কালা হীরালাল। সতীশের এক মামি ম্লান কালো মুখে বলল, “তোমাকে যে এতটা ভালোবাসত জানতাম না কোনোদিন...”
পড়শি এক মাসি অকস্মাৎ জানাল, “আহা সোনার প্রতিমাকে চিনতে পারলে না বাছা। স্বামীভক্তি অমন নারী এ’ কলি যুগে লাখে মেলে না।” আরেক বৃদ্ধ মহিলা বড় রকমের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “লাতিন আমার প্রায় বলত গো সতীশের বাবার একদিন ভুল ভাঙবে, তখন আমি ফিরে যাব দেখে নিও তোমরা!” সতীশের বড় মামি বেশ গম্ভীর প্রকৃতির, সে রূপধারী আর বিদ্যাধরী বলে একটু ডাঁটও রয়েছে। অনেকক্ষণ পরে সে মহিলা অন্দরমহল থেকে এসে বাইরের উঠোনের দিকে মুখ বাড়িয়ে বলল, “বেদ-মহাভারত রামায়ণে আমরা যে পঞ্চ সতী-সাধ্বী নারীকে দেখি, তাদের চেয়ে অনেক বেশি সতী-সাধ্বী ছিল কাজেরি। বিয়ের কথা উঠলেই হাউমাউ করে কেঁদে বলত, সাপে কাটা লখিন্দরকে নিয়ে বেহুলা ভেলায় চড়ে কৈলাসের সর্পপুরীতে গিয়েছিল এবং মৃত স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা করে এনেছিল নাচে-গানে মন-প্রাণ জয় করে...”
একটু থেমে যায় আচমকা, তারপর কিছুটা কৌতূহল সৃষ্টি করে প্রসন্ন হাসি ছড়িয়ে আবার বলল, কাজেরি ওদের চেয়ে কোনো অংশে কম সতী ছিল না। অহল্যা দেবরাজ ইন্দ্রকে দেহদান করেছিল। তারাদেবী সুগ্রীবের অঙ্কশায়িনী হয় স্বামী বালিরাজার মৃত্যুর পর। কুন্তী তো বিয়ের আগেই কুমারীত্ব খুইয়ে ফেলে। রাবণপত্নী মন্দোদরী দেবর বিভীষণের দেহলগ্না হয়। অথচ আমাদের কাজেরি আসলেই ছিল সতী নারীর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
কিছুক্ষণের মধ্যে সবার চোখে মেঘের ঘনঘটা লক্ষ্য করা যায়। অনেকটা সময় কেটে যায় একটু-একটু করে, একসময় সতীশের মেজো মামি ডুকরে কেঁদে ওঠে। কান্নাটা বড় বিদঘুটে আর হতচ্ছাড়া মনে হচ্ছিল। এমন কান্না দেখলে মেজাজ আপনা থেকেই বিগড়ে যায়। হীরালাল তবুও কিছুই বলতে পারে না।
কাজেরির চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকে গেছে। এখন এখানে আর কী কারণে দাঁড়িয়ে থাকা? এরপর আর কী কথাই-বা থাকতে পারে। ক্রমে শরীর নিস্তেজ হতে থাকে। সতীশের মামা বলল, “আমরা বিয়ের জন্য চাপ দিতাম, একদিন আমাদের কাজেরি কড়িবর্গায়...”
হীরালাল নদীর চরাচর ধরে আপন মনে হাঁটতে থাকে। বদ্ধ পাগল বা অন্ধেরা বড় ভাগ্যবান। পৃথিবীর অনেক কিছু তাদের হিসাবে থাকে না। নদীর ছোট ছোট ঢেউগুলো কূলে এসে আছড়ে আবার মিলিয়ে যায়। যেন সমস্ত প্রতিবাদ তার পৃথিবীর স্থলভাগের কাছে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সতীশ পেছন পেছন ছুটে আসতে থাকে।নদীকে মনে হয় সতীশের মতো। হীরালালের কানে নদীর কুলকুল ধ্বনি প্রবেশ করে না। সে শোনে সাগরের গর্জন, সে দেখে কাজেরির হাতছানি।
- বিষয় :
- গল্প