বাংলা ছন্দ মুক্তির জীবনানন্দীয় সূত্র
আবদুল মান্নান সৈয়দ
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মুখ্য অবলম্বন তাঁর, জীবনানন্দ দাশের, অক্ষরবৃত্ত ছন্দ; তত্রাচ অপরাপর ছন্দেও-যে তিনি কবিতা রচনা করেননি, তা নয়।
কবিজীবনের লগ্নপ্রাথমে, “ঝরা পালক”-এর বেশ কএকটি কবিতায়, মাত্রা-বৃত্ত ছন্দ প্রযুক্ত-বিশেষত অভিনন্দন- বা তর্পণ-সূচক কবিতায়। বস্তুত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত-নজরুল ইসলাম উক্ত রীতির যে সুপ্রচুর প্রয়োগ করেন তাদের কাব্যে, জীবনানন্দে ফলেছে তারই উত্তর-ফসল। আত্মকণ্ঠ আবিষ্কারের পরে তিনি প্রায় আর এই ছন্দের অনুবৃত্তি করেননি। একমাত্র ব্যতিক্রম “শ্রেষ্ঠ কবিতা” গ্রন্থভুক্ত ‘লোকেন বোসের জর্নাল’; -এবং এই কবিতায় জীবনানন্দীয় আবহ অনুপস্থিত।
তিনি কাব্যজীবনের উপান্ত্যকালে, যখন কবি একটি আলাদা আয়তনে প্রবেশাকাঙ্ক্ষী, তদানীন্তন কবিতাকতিপয়ে স্বরবৃত্তের প্রয়োগ দ্রষ্টব্য। তাঁর শেষতম কবিতাগ্রন্থ “বেলা অবেলা কালবেলা”-র দশটি কবিতা ও “শ্রেষ্ঠ কবিতা”-গ্রন্থভুক্ত ‘তোমাকে ভালোবেসে’ ও ‘অনন্দা’ কবিতাদ্বয় এই পর্যায়ী। লক্ষণীয়: ‘তোমাকে ভালোবেসে’-র মতো নিপট প্রেমকবিতা স্বরবৃত্তে কবি লেখেননি আর; ‘তোমাকে’ নাম্নী প্রেমকবিতায় বা অন্যান্য স্বরবৃত্তিক কবিতাগুচ্ছেও তাঁর কবিতার জটিলগভীর লোকচক্রটিকেই তিনি প্রবেশ ও মূল্য দিতে চেয়েছিলেন।
গদ্যে রচিত কবিতার প্রসঙ্গটিও এখানে চুকিয়ে দেওয়া ভালো। গদ্যকবিতা লিখতে শুরু করেন তিনি কবিজীবনের মধ্যপর্বে: “বনলতা সেন” কাব্যগ্রন্থেই প্রথম গদ্যকবিতার সূচনা, তৎপরবর্তী কাব্য “মহাপৃথিবী”-তেও ছোটোবড়ো বাক্যের ঢেউ তুলে পৌঁছেছে একেবারে অন্তপার্বণীর “বেলা অবেলা কালবেলা”-র ‘আমাকে একটি কথা দাও’ ও ‘সময়ের তীরে’।
অনন্তর প্রধান প্রসঙ্গপ্রবেশ।
প্রথম কবিতাগ্রন্থ “ঝরা পালক” থেকে শেষ কবিতাগ্রহ “বেলা অবেলা কালবেলা” পর্যন্ত অক্ষরবৃত্তের একচ্ছত্র শাসন চলেছে। কিন্তু “ঝরা পালক”-এ জীবনানন্দীয় বিশিষ্টতা ফলবান হ’য়ে ওঠেনি; এবং তাই যে-অক্ষরবৃত্ত আলম্বন তাঁর, তার ভিতরেও জ্বলে ওঠেনি কোনো নূতন সাহস, কারণ: ছন্দের সাহস কবিতারই অন্তর্গত সার্বিক সাহসেরই আর-একটি বাহ। তাই “ধূসর পাণ্ডুলিপি”-তে যখন জীবনানন্দের আত্মতা জেগে উঠেছিল, তখন তাঁর ছন্দব্যবহারেও তা দীপ্তিমতী হ’য়ে উঠেছে। তাঁর আত্মতার রূপমুদ্রা-অনন্তর-এই “ধূসর পাণ্ডুলিপি” থেকে অন্তকাব্য অবধি বিসারী; এবং ছন্দেও।
পংক্তিস্বাধীন তথা অসমান অক্ষরবৃত্তে জীবনানন্দের প্রিয়তা। অক্ষরবৃত্তকে খুব নিয়মের প্রপীড়নের মধ্যে না-নিয়ে গিয়ে তিনি তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
যে-রোমান্টিক উচ্ছ্বাস তাঁকে বক্তব্যের সংযমন থেকে পংক্তিবিন্যাসের সংযমন থেকে শিকার ক’রে নিয়ে গিয়েছিলো একরকম এলায়িত প্রসারিত ক্রমায়ত গীতল উন্মুক্তিতে, তাই তাঁকে তাঁর নিজের মতো অক্ষরবৃত্তের একটি রূপ নির্মাণে সাহায্য করেছিলো। এই মনোভাব থেকেই “ধূসর পাণ্ডুলিপি”-ভুক্ত ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতায় বাইশ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে (‘আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষসন্ধ্যায়’) হঠাৎ ব্যতিক্রম সেধেছে ছাব্বিশ মাত্রার তিনটি পংক্তি: ১. ‘যত নীল আকাশেরা র’য়ে গেছে খুঁজে ফেরে আরো নীল আকাশের তল’; ২. ‘পৃথিবীর কঙ্কাবতী ভেসে গিয়ে সেইখানে পায় ফ্লান ধূপের শরীর’; ৩. ‘ধূসর মৃত্যুর মুখ; একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিলো-সোনা ছিলো যাহা’। এই মনোভাবের ফলেই “রূপসী বাংলা”-র কবিতাগুচ্ছ সনেট না-হ’য়ে চতুর্দশপদী কবিতাতে রূপান্তরিত হয়েছে। [১] বাইশ মাত্রার পংক্তিশরীর, এখানে, মাঝে-মাঝে সম্প্রসারিত হ’য়ে গেছে; যেমন: ‘যখন মৃত্যুর আগে শুয়ে র’বো-অন্ধকার নক্ষত্রের নিচে’ এই বাইশ মাত্রা ষষ্টকের একটি পংক্তিতে স্ফারিত হ’য়ে গেছে ছাব্বিশ মাত্রায়: ‘ভোমরা উড়িছে শুনি-গুবরে পোকার ক্ষীণ গুমরানি ভাসিছে বাতাসে’। এ রকম ব্যতিক্রমের উপর্যুপরি সম্মুখীন হই এই কাব্যে; স্ফারিত কখনো, যেমন:
[১] রবীন্দ্রনাথও সনেট না-লিখে চতুর্দশপদী কবিতাই লিখেছিলেন একদিন। যদি আমি ঝ’রে যাই’, ‘যে-শালিখ ম’রে যায়’, ‘তোমার বুকের থেকে’, ‘একদিন পৃথিবীর পথে’, ‘ঘাসের বুকের থেকে’ কবিতানিচয়; কখনো সংকুচিত, যেমন: ‘তবু তাহা ভুল জানি’, ‘একদিন পৃথিবীর পথে’ কবিতামালা। শেষ পর্যন্ত বাইশ মাত্রার পংক্তিও তাঁর কাছে সংকুচিত ও রুদ্ধশ্বাস বোধ হওয়ায় আরম্ভ করেন লিখতে দীর্ঘ ছাব্বিশ মাত্রার মুক্তি-লাইন। বস্তুত, “রূপসী বাংলা”-ও নির্দিষ্ট ও অতিনিরূপিত ছন্দস্তবকবিন্যাসের বই নয়: বরং-মনে হয়-অক্ষরবৃত্তের যে-ছোটোবড়ো চালে জীবনানন্দ স্বস্তি বোধ করতেন অধিকতর, এখানে তারই আর-একটি আয়তন রচিত।
আবদুল মান্নান সৈয়দ রচিত ‘শুদ্ধতম কবি’ [১৯৭৩] গ্রন্থ থেকে
- বিষয় :
- গল্প