আধুনিক দুই কবি
জীবনানন্দ দাশের বিষাদাচ্ছন্ন ডায়েরি: ১৯৪৭-৪৮
জীবনানন্দ দাশ [১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯–২২ অক্টোবর ১৯৫৪]; : প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
ভাষান্তর ও ভূমিকা: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
কোন সালের ঘটনা সঠিক মনে পড়ে না, ২০০৬ কিংবা ২০০৭। ব্রাসেলস থেকে বাংলাদেশ এসেছি মুম্বাই হয়ে। ফিরতি যাত্রায় কলকাতায় ৪-৫ দিনের অবস্থান। রবীন্দ্র সদনে কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছিল। মঞ্চে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় উপবিষ্ট। একটি ফাঁকা চেয়ার খুঁজতে খুঁজতে মাঝ বরাবর কবি ভূমেন্দ্র গুহের চেহারা নজরে এলো। সারির প্রথম চেয়ারে উপবিষ্ট। হাতে ক্যামেরা ছিল; চট করে একটা ছবি তুলে কাছাকাছি বসে গেলাম। অনুষ্ঠান শেষ হলো। সেখান থেকে ভূমেন্দ্রদার সঙ্গে তাঁর বাসায়। সেদিন জীবনানন্দ দাশের লিটার্যারি নোটস লেখার মোটা খাতা এবং ৫৬টি এক্সারসাইজ খাতার দর্শন পাওয়া গেল; স্পর্শ করা গেল। সে এক অপার্থিব রোমাঞ্চকর অনুভূতি!
বেশির ভাগ খাতা দুষ্পাঠ্য ইংরেজিতে লেখা। একটি খাতার প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ‘হিস্ট্রি অব দি কনফ্লিক্ট বিটউইন সায়েন্স অ্যান্ড রিলিজিয়ন’। কোহিনূর মার্কা শাদা মলাটের খাতার ভেতর দেখা গেল একটি প্রবন্ধের খসড়া। বিষয়: শিক্ষা ও সাহিত্য। একটি খাতার ভেতর পাওয়া গেল ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার কর্মখালি বিজ্ঞাপন– পিন দিয়ে গাঁথা। ‘সোয়ান’ মার্কা নীল রঙের শক্ত মলাটের খাতাটি ১৯৩৬ সালের লিট্যারেরি নোটস। এক নজর দেখে তৃপ্ত হলাম। ১৯৩২-এর মোটা খাতাটিরও দেখা পাওয়া গেল। ডায়েরি নয়, লিট্যারেরি নোটস। আরেকটি খাতায় ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র ‘একক’-এর সম্পাদক শুদ্ধসত্ব বসুকে লেখা চিঠির অনুলিপি।
একটি খাতায় চোখ আটকে গেল। মনে হলো, পড়তে পারছি। খাতার প্রথম পৃষ্ঠায় লিটের্যারি নোটস লেখা থাকলেও মনে হলো এটি ডায়েরির মতো। ৭৯ চিহ্নিত পাতায় পাওয়া গেল দৈনিক স্বরাজ পত্রিকার কর্মাধ্যক্ষ রমেশচন্দ্র বসুর জীবনানন্দকে বলা সেই অকাতর গালমন্দ: ‘জার্নালিজম তো জানেন না আপনি ... জার্নালিজমের কী জানেন! কিছু জানেন না। আমার কথার ওপর কথা বলবেন না। এটা সাহিত্য না– এটা প্রফেসরি না– সাহিত্যিকরা প্রস্টিটিউট, কমিউনিস্টরা চোর’ ইত্যাদি। ৮১ চিহ্নিত পৃষ্ঠায় দৈনিক স্বরাজের পরিকল্পনা নিয়ে কিছু লেখা। ৮৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘রমেশের দু গালে দু চড় কশিয়ে ১৫ আগস্ট-এর ঢের আগেই চলে আসা উচিৎ ছিল।’ আক্ষেপে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘স্বরাজ জীবনানন্দ সংখ্যা বের করবে না একদিন?’
সাহস সঞ্চয় করে বলে ফেললাম, ভূমেন্দ্রদা, দুপুর তিনটে বাজে– আপনি বরং বিছানাটায় একটু গড়িয়ে নিন; আমি এই টেবিলে বসে চেষ্টা করে দেখি এই বাহাদুর মার্কা ডায়েরির খাতা থেকে কিছু উদ্ধার করতে পারি কিনা।
এক গাল হেসে ভূমেন্দ্রদা বললেন, পারবেন স্যার? সে তো খুব ভালো কথা। চেষ্টা করুন।
কেন যে ‘স্যার’ বলতে ভোলোবাসতেন সে এক রহস্য।
সেদিন বাহাদুর মার্কা খাতা থেকে প্রায় ২০-২৫ পৃষ্ঠা থেকে টুকে আনা গেল। ভূমেন্দ্রদা সম্মতি দিলেন পরের দিন আবার কিছু কাজ করার। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ছোট ভাই অশোকানন্দকে বহু চিঠি লিখেছেন, বিভিন্ন খাতায় ছড়ানো; কিন্তু সে সব এত দুষ্পাঠ্য যে পড়া যায় না। অন্য খাতাগুলোর অবস্থা প্রায় একই রকম, প্যাঁচানো জড়ানো বর্ণমালা।
কেবল ১৯৪৭-৪৮ সালের খাতার লেখা বোধগম্য। এটা লিটের্যারি নোটস লেখার খাতা নয়। প্রায় পুরো বাক্যে লেখা দিনলিপি। তবে তারিখ এবং সময় অনুপস্থিত।
জীবনানন্দ দাশ ১৯৪৬ সালের শেষভাগে কলকাতায় চলে যান এবং ১৯৪৭-এর জানুয়ারি থেকে দৈনিক স্বরাজ পত্রিকার চাকরি গ্রহণ করেন। এই খাতাটিতে ১৯৪৭ সালের কথা যেমন আছে, তেমনি আছে ১৯৪৮ সালের কথা। ১২-১৪ বছর আগে আবার ভূমেন্দ্র গুহর বাসায় গিয়ে খুঁজে পেতে এ খাতাটি বের করে পাতাগুলোর ফটো তোলার সুযোগ হয়েছিল। ফলে আগের নেয়া নোট এবং ফটো মিলিয়ে একটি টেক্সট তৈরি করা গেল, যা কমবেশি শুদ্ধ বললে বেশি দাবি করা হয় না। এসব বিষয় নিয়ে ৮-১০ বছর আগে সংক্ষেপে কোথাও কিছু লিখেছি। কিছু অংশ প্রকাশও করেছি। কলকাতায় জীবনানন্দ দাশের শেষ আট বছরের যন্ত্রণাময় জীবনযাপনের কথা লিখতে গিয়েও এই ডায়েরির খাতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছে বলে মনে পড়ে।
আজ জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে ডায়েরি থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি কিছু অংশ। সাথে পাঠকের বুঝবার সুবিধার্থে কিছু টিকা টিপ্পনী। উল্লেখ্য, এই ডায়েরি থেকে নেয়া যেত (ক) দৈনিক স্বরাজের কর্মকালে গল্প-নিবন্ধের ইলাস্ট্রেটর তথা শিল্পীদের নিয়ে জীবনানন্দের পর্যবেক্ষণ ও ভাবনা, (খ) নজরুলকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে দৈনিক স্বরাজ থেকে চাকুরি যাওয়ার ঘটনা, (গ) কফি হাউসের আড্ডা, (ঘ) অনুজপ্রতিম তরুণ কবি প্রভাকর সেনকে নিয়ে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও ভাবনা, (ঙ) অজিত দত্ত ও প্রেমেন মিত্রের কথা, (চ) স্বরাজ ত্যাগের অব্যবহিত পর পূর্ব পাকিস্তানে, বরিশাল শহরে অবস্থিত নিজ বাড়িতে গমনের তিক্ত অভিজ্ঞতা, (ছ) নিজ জীবনের অচরিতার্থতা ও বিষাদময়তা নিয়ে জীবনানন্দের পর্যবেক্ষণ ও ভাবনা। মনে হয়েছে, সাধারণ পাঠকদের জন্য শেষোক্তটি আকর্ষণীয় হবে।
জীবনানন্দ লিখেছেন: কয়েক বছরের মধ্যে সারা বিশ্বের অবস্থা এবং বৈশ্বিক পটভূমি কত না পাল্টে গেছে। এমনকি কয়েক বছর আগেও আমার একমাত্র ভাবনা ছিল অর্থোপার্জন এবং সম্পদ বাড়ানো... কিন্তু এখন আমি প্রথমত যৌবন ও স্বাস্থ্য ধরে রাখার কথা ভাবি– ভাবি ঘড়িকে থামিয়ে দিতে; আমার বার্ধক্যকে স্থগিত করে রাখতে, যদিও তা স্থগিত করা যায় না। বয়স দ্রুত চলছে তার অপুনরুদ্ধারযোগ্য পথে– প্রায়ই আমি আমার বয়সটা কত মনে করার চেষ্টা করি ৪৭/৪৮ নাকি ৪৯? সত্তর হতে ২০-২১ বছর। ইত্যবসরে আমাকে কয়েকটি উপন্যাস লিখে ফেলতে হবে এবং আরও আরও কাজ সেরে ফেলতে হবে, সম্ভব হলে বয়স ষাট হওয়ার আগেই; ১৯৪৭ সালে জীবনানন্দের বয়স ৪৮ হওয়ার কথা। ১৯৪৯ সালে ষাট।
উপন্যাস লেখা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। এ ডায়েরির এক জায়গায় লিখেছেন: তলস্তয়ের মতো মহাকাব্যিক ছাঁচের উপন্যাস লেখার ভাবনা বাদ দেয়াই কি আমার জন্য সমীচীন হবে?– ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কীটস, মিল্টন, দান্তে কেবল কবিতাই লিখেছেন।– কিন্তু গ্যেটে, তলস্তয় এবং শেকসপিয়র আমাকে লোভানী দেয়। আমি জানি না সাহিত্যের কোন্ শাখাটি আমার জন্য সঠিক হবে– উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টা হয়তো মাঠে মারা যাবে এবং আমার সাহিত্যিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে–
কিন্তু ১৯৪৮ সালের মধ্যেই চার-চারটি উপন্যাস লিখে ফেলেছেন তিনি: ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে শুরু করেন ‘জলপাইহাটি’; রচনা শেষ করেন পরের মাসে। তারপর শুরু করেন ‘সুতীর্থ’। জুন মাসে শেষ হয় সুতীর্থ রচনা। একই মাসে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের জুন মাসে লিখে ফেলেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘মাল্যবান’। জুলাই-আগস্ট মাসে লেখেন ‘বাসমতীর উপন্যাস’। এরপর তিনি আর কোনো গল্প-উপন্যাস লেখেননি।
কলকাতায় নিজের সামাজিক অবস্থান নিয়ে লিখেছেন: ৯-১০ই ফাল্গুনেও ফাল্গুনের ‘পূর্ব্বাশা’ আমার হাতে এলো না এবং আমাকে ওদের অফিসে গিয়ে নিয়ে আসতে হলো– কত না গর্দভের মতো উত্তেজিত হয়ে মাঝেমধ্যে আমি কাজ করি– এমনকি নীরেন চক্রবর্তী ডাকযোগে পেয়ে গেল কিন্তু এত দিনেও আমাকে ‘পূর্ব্বাশা’ পাঠানো হলো না?– পরিকল্পিত এবং ভাবনার কথা– কয়েকদিন আগে অনিল চক্রবর্তী ‘স্বরাজ’ অফিসে এসেছিল, আমার সঙ্গে দেখা করেনি এবং অজিত দত্ত ডাকলে সাড়া না-দিয়ে অনিল অন্য দিকে চলে গেল– সে তো আমাকে ‘পূর্ব্বাশা’ দিয়ে যেতে পারতো।– বলা বাহুল্য, এখানে ফাল্গুন মানে ১৯৪৮-এর জানুয়ারি।
অজিত দত্তের বিয়েতে আমন্ত্রণ না পাওয়া নিয়েও ক্ষোভ অবারিত করেছেন জীবনানন্দ এ ডায়েরিতে। লিখেছেন: প্রেমেন (মিত্র) অজিতের (দত্ত) বিয়ের ঘটক ছিলেন (আমার মনে আছে সেই দিনগুলোতে পত্রিকায় অজিতের বিয়ের খবর ছাপা হয়েছিল এবং বুদ্ধদেবের বিয়ের খবরও পত্রিকায় এসেছিল– যদিও আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, যেখানে প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল: আমি পত্রিকায় নামের তালিকা পড়েছিলাম– আমি তখন সিটি কলেজের চাকরি থেকে বরখাস্ত, এমনকি রামযশ কলেজের চাকরি থেকেও চ্যুত এবং কলকাতায় এক অজ্ঞাত, অবহেলিত জীবন কাটাচ্ছিলাম: যেন আমি ‘প্রগতি’ এর কবিতাগুলো একেবারেই লিখিনি।– স্মরণযোগ্য যে জীবনানন্দ ঢাকায় অনুষ্ঠিত তাঁর বিয়েতে (মার্চ ১৯৩০) কবি বুদ্ধদেব বসুকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন এবং তিনিও এসেছিলেন।
দাম্পত্য জীবন সফল হয়নি জীবনানন্দ দাশের। তাই ট্রামে-বাসে কফিখানায়, অফিসে নারীদের পর্যবেক্ষণ করতেন। এক দিন কফি হাউসের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে লিখেছেন: কফি হাউসে আমরা দু-কাপ কফি খাই, আর কিছু নয়– বিশাল এবং প্রশস্ত ঘর– খুঁটিগুলো, মানুষজন– সে সময় কোনো মহিলা আমার চোখে পড়েনি–আতোয়ার আমাকে দেখেছিল কিন্তু আমি তাকে দেখিনি–অত্যন্ত বাধ্য এবং দক্ষ বেয়ারারা– রাতের কফি হাউসের জীবনটা কতখানি দারুণ এবং উপভোগ্য; মহিলারা হয়তো আরও একটু আগে আসেন–আমি যদি কোনো মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে আসতাম: তেমন কেউ আছে কি?–হাউসের কোনো কোণ থেকেই চেনা কোনো মানুষ আমাকে ডেকে অভ্যর্থনা জানায় না, অথচ অনেক সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিবান মানুষ যে সেখানে নিশ্চিতভাবেই আছেন–
আতোয়ার বলতে চতুরঙ্গ পত্রিকার সম্পাদক আতোয়ার রহমানের কথা বুঝিয়েছেন। চতুরঙ্গ জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতা ছেপেছিল। এ সময় কফি হাউস ছিল কলেজ স্ট্রিটের অ্যালবার্ট হলে।
এক অস্থির রাতে সেই সব নারীদের কথা তার মনে পড়েছিল যাদের তিনি পছন্দ করতেন, কামনা করতেন। তিনি লিখেছেন: হেরোডিয়াসের কন্যাদের সঙ্গে সম্পর্ক কত না নিষ্ফল এবং অর্থহীন এবং জেওয়াই (Jy)-এর কথা ভেবে হস্তমৈথুন (সেপ্টেম্বর কি অক্টোবরের এক রাত্রিতে আমার সোফার ওপরে বসে স্টাইনবেক পড়তে পড়তে ইত্যাদি যখন অন্য সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল) আজ জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটে কত না অপচয় বলে মনে হয় ইত্যাদি।
জেওয়াই (Jy) কেন স্বামী (বা ছেলেকে) সঙ্গে না-নিয়ে আসে না? (– ‘উদ্দেশ্যমূলক ও চিন্তনীয়’ [D & R]–) এবং আমার প্রতি তার সেই পুরোনো শীতলতা দেখিয়ে পাগলের মতো সে বারবার ভি-এর (ভেবুল) কথা শুধাতেই থাকে। Jy এর কথা ভেবে হস্তমৈথুন কেবল আমাকে বার্ধক্য এনে দিয়েছে।
এই সূত্রে হেরোডিয়াসের কন্যাদের কথা একটু বলে নিতে হয়। বাইবেলের উপাখ্যান অনুযায়ী হেরোডিয়াস ছিলেন জুডিয়ার রানি, যিনি তাঁর কন্যা সালোমেকে দিয়ে প্ররোচিত করে সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্টের শিরচ্ছেদ করিয়েছিলেন। বিশ্বসাহিত্যে (বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের প্রিয় কবি ইয়েটসের A Prayer for My Daughter কবিতায়) ‘হেরোডিয়াসের কন্যারা’ একাধারে তীব্র যৌন-আবেদন এবং ধ্বংসাত্মক ও প্রবঞ্চনাময় নারীত্বের প্রতীক। জীবনানন্দ তাঁর জীবনের সেই সব নারীদের নির্দেশ করে যাদের প্রতি তিনি তীব্র শারীরিক আকর্ষণ বোধ করতেন, কিন্তু যাদের কাছ থেকে তিনি কেবল অবহেলা, শীতলতা বা প্রবঞ্চনাই পেয়েছেন। জীবনানন্দ দাশ এখানে বিশেষ করে তাঁর যৌবনের প্রেমিকা শোভনা দাশ (ঘরোয়া নাম বেবী। ডায়েরিতে Y, By) এবং জ্যোতির্ময়ী দেবীর (ডায়েরিতে Jy) কথা উল্লেখ করেছেন। তৎকালীন কলকাতার উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক মহলের এক রহস্যময়ী নারী ছিলেন জ্যোতির্ময়ী দেবী। তাঁর সঙ্গে জীবনানন্দের এক ধরনের অনুচ্চারিত, তীব্র ও টানাপোড়েনমূলক মানসিক-শারীরিক আকর্ষণের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ডায়েরিতে তাঁর প্রতি জীবনানন্দের ক্ষোভ ও আকর্ষণের প্রকাশ বারবার ঘটেছে।
শোভনা ও জ্যোতির্ময় প্রসঙ্গে বলেছেন: এমন যদি কোনো নারীকে পেতাম যার কাছে নিয়মিত যাওয়া যায় এবং সময় কাটানো যায়, তবে ওদের আমি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতাম: কিন্তু কোথায় সেই নারী? বাসের ভিড়ে এদের আমি অনেক দেখি কিন্তু যোগাযোগ করব কীভাবে?
সে রাতে স্টাইনবেকের কোন উপন্যাসটি পড়ছিলেন জীবনানন্দ? জন স্টাইনবেক ১৯৪০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন। জীবনানন্দ সম্ভবত ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত তাঁর নোবেলজয়ী মাস্টারপিস The Grapes of Wrath উপন্যাসটি পড়ছিলেন। কিংবা Of Mice and Men.
পরিতাপের বিষয়, জীবনে পার্থিব সাফল্য দেখেননি জীবনানন্দ দাশ। জীবনের চাওয়া না-পাওয়ার অঙ্কটা তাঁকে পীড়িত করত। এ ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন: কোনো কোনো দিন রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে জীবনের সামগ্রিক হতাশার (পেছনে বিরাজমান ৮টি কারণের) কথা মনে পড়ে:-
(১) বরিশালের বাড়ি এবং বি.এম. কলেজ আর কখনো ফিরে আসবে না... কলেজের নরকযন্ত্রণা এবং ছাত্রদের কথা;
(২) ‘স্বরাজ’-এর চাকরি: কেবল ভিন্ন আদলে সমান এক নরকভোগ;
(৩) ল্যান্সডাউন রোড: অসহ্য একটা দম আটকানো কারাগার;
(৪) পরিবার: এরাই আমার জন্য নিয়ে এসেছে এই শ্বাসরুদ্ধকারী কারাগার এবং আমার কোনো স্বস্তি না-হলেও তাদেরও এহেন সামগ্রিক হতাশায় নিপতিত হতে হবে;
(৫) মা: মরণশয্যায় শায়িত (–কুসুমকুমারী দেবীর মৃত্যু হয় ১৯৪৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর);
(৬) ভাই (অশোকানন্দ দাশ): মনে হচ্ছে সেও এখন যথেষ্ট ভুগছে এবং এ মুহূর্তে স্ত্রীকে নিয়ে বোকার স্বর্গে বাস করছে–
(৭) মঞ্জু: কাজকর্মে মন নেই এবং ওর প্রতি খুকির (অর্থাৎ কন্য মঞ্জুশ্রী দাশের) অদ্ভুত আনুকূল্য,
(৮) সাহিত্যে হতাশা, প্রেম, হেরোডিয়াসের কন্যারা, বনলতা সেন, কল্পনার নারীরা, বাসযাত্রী দেহোপজীবীরা এবং জীবন।
লক্ষণীয়, ‘হেরোডিয়াসের কন্যারা’ এবং ‘কল্পনার নারীদের’ মধ্যখানে বনলতা সেনের অবস্থান। সুতরাং শোভনা বনলতা সেন নন, যা এতদিন আমরা ভেবে এসেছিলাম। আবার বনলতা সেন কোনো কল্পিত নারীও নন। তিনি বাস্তবের অন্য কোনো নারী যাকে জীবনানন্দ স্মরণে রেখেছেন।
এই সব নির্মম ও দুর্দশাময় পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন জীবনানন্দ। তবে এ-ও ভেবেছিলেন, মৃত্যুর আগে একদিকে পরিবারের সবার খোরপোষের ব্যবস্থা করা দরকার– অন্যদিকে অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলির কিছু একটা ব্যবস্থা করে যেতে হবে। সেসব হয়তো শেষাবধি সম্ভবপর হবে না। তাই তিনি ভেবেছেন: তিনজনকে (রঞ্জু, মঞ্জু, লাবণ্য) ডুবিয়ে মেরে এবং নিজে ডুবে মরে সব সমস্যার ইতি টানতে হবে। তাদেরকে সজোরে টেনে বড় বড় ঢেউয়ের দিকে টেনে নিয়ে যেতে হবে। ওরা প্রত্যেকে যার যার মতো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করবে এবং আমার শারীরিক শক্তি ও হতাশাই বিজয়ী হবে।
এসব কথা লিখেই আবার আশাবাদী হয়ে উঠেছেন জীবনানন্দ দাশ। লিখেছেন: তবে আরও কয়েকটি বই প্রকাশ এবং আমার পাণ্ডুলিপিগুলির একটা পরিপাটি ব্যবস্থা না-করা পর্যন্ত আত্মহত্যা আমি করব না।
আবার আরেক দিন রাতে বিষাদগ্রস্ত জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন: প্রায় প্রতিরাতেই ভাবছি জীবনের সমস্যাজট আত্মহত্যার মাধ্যমে শেষ করে দেওয়ার কথা। কারণ (১) ‘স্বরাজ’ পত্রিকায় চাকরির অনিশ্চয়তা; (২) কলকাতার জীবন একদম একঘেয়ে, তিক্ত এবং একাকী; (৩) পৃথিবীর কোথাও না আছে নিশ্চয়তা; না আছে মর্যাদা; (৪) কোনো মেয়েমানুষ নেই– কোনো প্রেম নেই– আর আমি দ্রুত বার্ধক্যগ্রস্ত হয়ে পড়ছি; (৫) হেরোডিয়াসের কন্যারা; (৬) ব্যর্থতার অতলান্ত হতাশাবোধ।
একবার সবাইকে নিয়ে সমুদ্রে ডুবে সবার অস্তিত্বের চূড়ান্ত বিনাশের কথা ভেবেছিলেন অসহায় জীবনানন্দ। সমুদ্রমরণ তাঁর কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। ডায়েরিতে লিখেছেন: একজন স্কুল শিক্ষকের কথা মনে পড়ছে যিনি কুঠারের আঘাতে পরিবারের সকলকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু এটা তো একটা স্থূল সমাধান– সেরা সমাধান হলো একটি রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সমুদ্রমরণ।
নিজের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন: (সমুদ্রমরণের জন্য) সকালের চেয়ে সন্ধ্যা ভালো সময় নাকি?
লিখেছেন: অন্যভাবে আত্মহত্যা যেমন ইউথেনেশিয়া করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো পাশবিক পদ্ধতিতে নয়– আবার বলছি, কারও উচিত না কেবল নিজের জীবন নাশ করা– তাতে পরিবারের বাকিদের মুখে চুনকালি পড়বে এবং তারা সীমাবদ্ধহীন যন্ত্রণায় নিপতিত হবে।
এখানে স্পষ্ট ভাষায় লেখা দরকার, জীবনানন্দ কোনো পাশবিক বা স্থূলভাবে নিজের ক্ষতি করার মানুষ ছিলেন না; বরং এই জাতীয় ভয়ংকর বাস্তব ঘটনা বা গল্পের উপাদানগুলোকে তিনি ডায়েরির পাতায় লিখে নিজের ভেতরের জমে থাকা অন্ধকারকে কাটিয়ে ফেলতেন। ডায়েরিতে তিনি বারবার নিজেকে মনে করাচ্ছেন– অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিসমূহের সুব্যবস্থা না করে তিনি মরতে পারবেন না। অর্থাৎ এসব কথাবার্তা তাঁর আত্মহত্যার নীলনকশা ছিল না। ছিল মনের জমানো অন্ধকার দূর করার এক মনস্তাত্ত্বিক কপাট।
গভীর দুশ্চিন্তায় ভুগতেন জীবনানন্দ দাশ। লিখেছেন: রাতে স্বপ্ন দেখি– মায়ের মৃত্যু– আমার তীব্র যন্ত্রণা– বাবা এবং প্রথম জীবনের ঘটনাবলি। কিন্তু তাঁর কবিসত্তা ছিল সদা জাগরূক। আশাবাদ ছিল অটুট। এ ডায়েরিতে এক জায়গায় লিখেছেন: গভীর রাতের অন্ধকারে কফি হাউস থেকে ফেরার সময়, রাস্তা এবং গলিগুলোর গোলকধাঁধাময় আঁকাবাঁকা পথ আমি অনুভব করি; তালগাছগুলো (গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং বা কলকাতার দাঙ্গার সময় যেখানে শকুনরা বাসা বেঁধেছিল) বসন্তের রাতের বাতাসে সতেজ, শান্ত এবং দুলন্ত অবস্থায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ধর্মতলা মসজিদ এবং তালগাছগুলো চেনার রাস্তা চেনার উপায় হওয়ায়, মসজিদটি যেন ধ্রুবতারার মতো আমাকে সঠিক দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়!
- বিষয় :
- গল্প