ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

দু-চোখে দুর্গম শিখর

দু-চোখে দুর্গম শিখর
×
×

হুমায়ুন আজাদ

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৫ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতি সব পারে; চিরশত্রুদের মধ্যে এনে দিতে পারে মিলনোৎসব, মিত্রদের মধ্যে জন্ম দিতে পারে যুদ্ধের তাণ্ডব;-বিভক্ত অথবা যুক্ত ক’রে দিতে পারে রাষ্ট্র-সভ্যতা-ভাষা-সাহিত্য-শিল্পকে। সাতচল্লিশের দ্বিখণ্ডন দু-ভাগে ভাগ ক’রে দেয় হাজার বছর-দীর্ঘ বাঙলা কবিতাস্রোতকেও। বাঙলা কবিতা দু-স্রোতে-অন্তঃস্রোত ও বহিঃস্রোতে-ভাগ হ’য়ে ঢোকে দু-দিকে মৃদু ক্ষীণ মন্ময় অন্তঃস্রোতটি প্রবেশ করে পশ্চিমে, আর পুবে প্রবেশ করে ব্যাপকবিস্তৃত তরঙ্গসংকুল বহিঃস্রোতটি। অন্তঃস্রোতা কবিতা বাঙলা ভাষার পশ্চিম-অঞ্চলে বইতে থাকে ব্যক্তির অন্তর্লোকের লতাগুল্ম ভিজিয়ে; সেখানে ঢেউ-প্লাবন-বিস্তারের বদলে শোনা যায় গীতল গুঞ্জন; আর বহিঃস্রোতা কবিতা ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র-জীবনের সব তীর প্লাবিত ক’রে প্রবাহিত হয় বাঙলাদেশে। সাতচল্লিশোত্তর বাঙলাদেশ ও তার কবিতা বহির্জীবনময়। চল্লিশ-দশকের শেষাংশ, ও সমগ্র পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর দশক ভ’রে এমন এক দারুণ সময়ের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে এগোয় বাঙলাদেশ যে এ-সময়ে আপন অন্তর্লোকের একান্ত অধিবাসী হওয়া সম্ভব ছিল না কারও পক্ষে।

প্রত্যেককেই প্রথমে হ’তে হয়েছে রাষ্ট্র ও জীবনের বাসিন্দা, পরে অন্য সবকিছু-কবি অথবা ধ্যানী; এবং উত্তেজনা-কলরোল-বাস্তব পীড়নপূর্ণ বাহ্যজীবন-জগৎ পেরিয়ে এক সময় আপন অন্তর্লোকে পৌঁছে বাঙলাদেশের কবিরা দেখেছেন: আন্তর জগৎজীবনকেও দখল ক’রে আছে বাহ্যজগৎ আর জীবন। একান্ত ব্যক্তিরা ও ব্যক্তিগত স্বপ্নকল্পনা বিদায় নেয়নি তাদের বুক থেকে, কিন্তু গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেদের-জীবনের জন্য জায়গা ক’রে দেওয়ার জন্য। এমন প্রতিবেশে ও মানস-অবস্থায় কবিতাও বাহ্যজীবনময় হ’য়ে উঠতে বাধ্য; এবং হয়েছে তা-ই সাতচল্লিশ, বিশেষ ক’রে বায়ান্নোর পরে বাঙলাদেশের কবিতায় প্রধান জায়গা ক’রে নেয় জীবন-তার ক্ষুধা, হাহাকার, ক্রোধ, উত্তেজনা; এবং কবিতা হ’য়ে ওঠে বহিঃস্রোতক্ষুব্ধ। এ-সময়ের পশ্চিম বাঙলার কবিতা শরীরাত্মায় গীতিকাব্যিক; আর বাঙলাদেশের কবিতা, শরীরে না হ’লেও, মর্মমূলে মহাকাব্যিক। তাই বাঙলাদেশের কবিতার যে-দিকে তাকাই চোখে পড়ে জীবন উছলে উঠছে কবিতারূপ পাওয়ার জন্য।

বাঙলাদেশের কবিতা জীবনকল্লোলিত-বহিঃস্রোতা-; আর এ-কবিতার প্রধান পুরুষ শামসুর রাহমান। তাঁর প্রথম কবিতার নাম ‘১৯৪৯’;-কবিতাটি এখন অবলুপ্ত, কিন্তু এটি ইঙ্গিত দেয় যে এর কবি সমকাল-ও জীবনমথিত। শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগেতে একটি তীব্র ও পৌনপুনিক বাসনা ব্যক্ত হয়েছে কবিতাপরস্পরায়; তা হচ্ছে জীবনে ঢোকার বাসনা। প্রথম মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় জীবন লাভের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে যেন জীবনপ্রবেশ: তাঁর কবিতা জীবন-বহিরিস্থিতের জীবন-অভ্যন্তরে প্রবেশের ও জীবন দ্বারা মথিত হওয়ার গাথা। জীবন-বহিরিস্থিত মাত্রই রোমান্টিক, যাঁর বুক ভ’রে অপার্থিব রূপ-সৌন্দর্য-আবেগের জ্যোৎস্না; আর চারপাশের প্রতিবেশ জুড়ে পার্থিব অসুন্দরের অন্ধকার। শামসুর রাহমানও এ-জ্যোৎস্না-আঁধারের বিরোধ; তাঁর চৈতন্যলোক ভ’রে আছে রূপ-সৌন্দর্য ও তার স্মৃতি এবং সংরক্ত কাতরতায়; কিন্তু তিনি আপাদমস্তক ধরা দিয়েছেন অসুন্দর-জ্বালাময়-কলরোলিত জীবন ও সমকাল ও প্রতিবেশের বাহুপাশে। প্রাক-দ্বিমাত্রিকতাতেই একটি বিষয় স্পষ্ট হ’য়ে ওঠে যে সৌন্দর্যলোকের অবস্থান শামসুর রাহমানের পেছনে ও অতীতে, আর সময়-জীবন-প্রতিবেশের অবস্থিতি তাঁর সম্মুখে ও ভবিষ্যতে। তাই দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ রৌদ্র করোটিতেতে, ও পরবর্তী কাব্যগ্রন্থসমূহে, সমকাল, সমকালীন জীবন ও প্রতিবেশই হ’য়ে উঠেছে তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় ও প্রেরণা। কিন্তু কখনোই তিনি নিজেকে বর্জন করেননি ও করেন না কোনো বিষয় বা প্রসঙ্গ, অর্থাৎ কবিতা থেকে। প্রতিটি কবিতার অন্তরেই ঢুকে থাকেন তিনি– ধ্বনিত করেন আপন স্বর ও হৃৎস্পন্দন; কিন্তু তা তাঁর সমকাল ও প্রতিবেশের স্বর ও হৃৎস্পন্দন ব’লেই বোধ হয়। 

এ-ভাবেই তিনি তিরিশি কবিতার অন্তর্জগৎ থেকে বাঙলা কবিতাকে নিয়ে আসেন বর্হিজগতে ও অব্যবহিত প্রতিবেশে– তার কোলাহল কলরোল ক্লান্তি শ্রান্তি উজ্জ্বলতায়। অন্যভাবে বলা যায় যে শামসুর
রাহমান তাঁর কবিতারাশিতে বাহ্যজগৎ ও প্রতিবেশকে, তার সমগ্র চারিত্রকে, শুষে নিয়েছেন নিজের অন্তর্লোকে; এবং পরিণত করেছেন কবিতায়। তাই তাঁর কবিতা ধ্যান বা স্তব বা গান বা শাশ্বত শ্লোক নয়; তা সমকালীন জীবনসৃষ্টি।
শামসুর রাহমান দ্রোহী নন-ভেঙে, তছনছ ক’রে তিনি আসেননি; বিপ্লবী নন-দিকে দিকে আত্মঘোষণার ইশতেহার ছড়াননি; আবিষ্কারকও নন তিনি-তাঁর চোখ সবার আগে দেখতে পায়নি কোনো অজানা মহাদেশ অথবা গ্রহ। তিনি বিনয়ী ও শ্রমী; পূর্বগামীদের পথের শেষপ্রান্ত থেকে যাত্রা শুরু হয় তাঁর, এবং একদিন চ’লে যান অনেক দূর, যতদূর যাওয়ার স্বপ্ন দ্যাখেন নি পূর্বগামীরা। তিরিশি আধুনিকেরা বাঙলা কবিতার ভাষা ও বিষয় বদলে দিয়েছিলেন, নতুন চেতনা সঞ্চার করেছিলেন; এবং কবিতায় কিছু পরিমাণে, অনেকটা সংকোচের সাথে, সংক্রামিত ক’রে দিয়েছিলেন ব্যক্তিতা ও প্রতিবেশ; কিন্তু ব্যক্তিতা, অব্যবহিত প্রতিবেশ ও সময়কে তাঁরা গৌণমূল্য দিয়েছিলেন, কেননা তাঁরা চারপাশের সমাজ-জীবন-প্রতিবেশকে কখনো মূল্যবান মনে করেননি। প্রান্তরে কিছুই নেই; জানালায় পর্দা টেনে দে’-বুদ্ধদেবের এ-উক্তি যেন তিরিশের সারকথা। শামসুর রাহমান খুলে দিলেন ওই জানালাটি, এবং সমস্ত দরোজা, যা দিয়ে ঢুকল অব্যবহিত-প্রতিবেশপৃথিবী, সময়, জীবন তাঁর অভ্যন্তরে, মিশ্রিত হলো তাঁর একান্ত ব্যক্তিতার সাথে। প্রত্যেক কবিরই থাকে আপন এলাকা-সাম্রাজ্য-; শামসুর রাহমানের কবিতাসাম্রাজ্যের নাম একান্ত ব্যক্তিতাজড়িত অব্যবহিত প্রতিবেশ পৃথিবী জীবনপূর্ণ সমকাল। তাই তাঁর কবিতায় পাই ব্যক্তিগত কামনাবাসনা, এবং সমকালীন জীবন। শুধু ইঙ্গিত-সঙ্কেত-প্রতীকে তৃপ্ত হন না তিনি সমকালকে কবিতায় গ্রহণ করতে যেয়ে; পেশ করেন বর্ণনা-বিবরণ, সমকালচিত্র; এবং তার সাথে জড়িত ক’রে দেন বক্তব্য ও ভাষ্য। তাই তাঁর কবিতা হঠাৎ আলোর ঝলক, শান্ত স্নিগ্ধতা, প্রশান্তির বদলে সঞ্চার করে বিশ শতকের দ্বিতীয়াংশে বসবাসের তাপ-জ্বালা-দাহ।
সমকালীন বহির্জীবনের সাথে শামসুর রাহমান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে দিয়েছেন আপন ব্যক্তিতাকে বারবার ‘আমি’ উচ্চারণ তাঁর স্বভাব, যার ফলে তাঁর কবিতায় রচিত হয়েছে বিপুল পরিমাণ আত্মবিবরণী। আত্মকেন্দ্রিকতা ও আত্মকথনে তিনি বাঙলা ভাষায় সম্ভবত অদ্বিতীয়; আপন প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গ, ব্যক্তিগত জীবন ও প্রতিবেশ, আত্মীয়-বান্ধব এবং নিজের সাথে সম্পর্কিত প্রায়-সমস্ত কিছু ঢুকেছে তাঁর কবিতায়। আত্মবিবরণীর এ-প্রাচুর্যে মনে হ’তে পারে যে তিনি লাওএল-প্লাথ-রেটকি-বেরিম্যান-সেক্সটনগোষ্ঠীর মতো স্বীকারোক্তিপ্রবণ; এবং তাঁর কবিতা স্বীকারৌক্তিক কবিতা। কিন্তু তিনি স্বীকারৌক্তিক কবি নন, যদিও তাঁর কবিতায় নিজের জীবনের অনেক টুকরো জায়গা পেয়েছে। তাঁর ‘আমি’, একগুচ্ছ ব্যতিক্রম বাদে, চিরকালের কবিদের অপরিহার্য ‘আমি’। ১ তাঁর আত্মনির্দেশক সর্বনাম ‘আমি’র প্রাণকেন্দ্রে অবশ্যই বাস করেন কবি নিজে, কিন্তু তা কবিকে অতিক্রম ক’রে নির্দেশ করে একজন আদর্শ সমকালবাসীকে, যে উৎসাহী তার কালের মানুষের সমগ্র অভিজ্ঞতা ও আবেগ নিজের মধ্যে ধারণ করতে। এমন না হ’লে তাঁর কবিতা হ’য়ে উঠত একান্ত আত্মতান্ত্রিক, নিরন্ত্র; কিন্তু শামসুর রাহমানের ‘আমি’র সমস্ত দরোজা খোলা। তবু তিনিই বাঙলা কবিতাকে সবচেয়ে বেশি গর্ভবতী করেছেন আপন ব্যক্তিতায়। আরো দুটি প্রবণতা, যা তিরিশি আধুনিক কবিতায় দেখা দেয় ব্যাপকভাবে, শামসুর রাহমানের কবিতায় হ’য়ে ওঠে আরো ব্যাপক; এবং এদের একটিকে তিনি নিয়ে যান চূড়ান্তে। এ-প্রবণতা দুটি হচ্ছে নগরযাত্রা ও পাশ্চাত্য পুরাণমুখিতা। পশ্চিমি পুরাণ বিদায় নিয়েছে বাঙলা কবিতা থেকে; কিন্তু নগর দখল করেছে কবিদের। শামসুর রাহমানের কবিতায় তিরিশি কবিতার নগরযাত্রা পৌঁছেছে পথের শেষ প্রান্তে; এবং এমন বোধ সৃষ্টি করে যে নগরই গন্তব্য-সমকালীন মানুষের ও কবিতার। পশ্চিমি পুরাণ ব্যবহারেও অশেষ উৎসাহ তাঁর;-আধুনিকদের মধ্যে বিষ্ণু দে ছাড়া আর কারো মধ্যে এমন উৎসাহ চোখে পড়ে না।
কবিদের, নদীর মতো, পৌনপুনিক সরল ও বাঁকাস্রোতে এগোতে হয় সম্মুখে এবং সম্মুখে এবং সম্মুখে; নইলে তাঁরা হন নিষ্ক্রিয় বা আত্মপ্রদক্ষিণরত। মানবমণ্ডলী অনন্ত সৃষ্টিশীলতার উৎস হ’লেও ব্যক্তিমানুষ সীমাবদ্ধ, যদিও স্বল্পসংখ্যকের সীমা বিস্ময়কররূপে বিস্তৃত। জন্মসূত্রে পাওয়া শক্তি ও আয়ুষ্কাল ব্যক্তিমানুষকে সসীম ক’রে রাখে। এ-সূত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কবিরাও; যদিও প্রত্যেকেরই লক্ষ্য গভীর-ব্যাপক-অনন্ত হওয়া, তবুও কারো পক্ষেই ওই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। জন্ম-প্রতিভা স্বল্পসংখ্যক কবিকে উৎস থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়, কিন্তু অধিকাংশই এগোতে পারেন উৎস থেকে সামান্য সম্মুখে। অগ্রসরতার চেয়ে অনেক সহজ ব্যাপ্তি ও গভীরতা অর্জন কিছু স্বপ্ন-কল্পনা-আবেগ-বোধ, যার উন্মেষ ঘটে আবির্ভাবকালে, নিরন্তর প্রচেষ্টায় গভীর-ব্যাপক ক’রে তুলতে পারেন অনেকে, কিন্তু অবিরাম নতুন স্বপ্ন-কল্পনা-আবেগ-বোধের বিকাশ ঘটানো খুবই কঠিন। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ব্যতীত আর কেউ চিরঅগ্রসরমান নন বাঙলা ভাষায়; এমনকি তিনিও প্রতিপর্যায়ে পরিচ্ছন্নভাবে অভিনব নন। 
হুমায়ুন আজাদ রচিত ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’ গ্রন্থ [১৯৮৩] থেকে

আরও পড়ুন

×