ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিস্তাপারের মানুষের কঠিন জীবন

তিস্তাপারের মানুষের কঠিন জীবন
×

.

আরিফুল ইসলাম রাফি 

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৫ | ০০:১৮

তিস্তাপারের মানুষ মানেই আশঙ্কায় দিন গোনা জীবন। রাতে ঘুমানোর আগে ভাবতে হয়, সকালটা কি সত্যিই নিজের ঘরে থাকা হবে? ২০২১-এর অক্টোবরে আকস্মিক বন্যায় তিস্তা নদীর পানির স্তর ২৪ ঘণ্টায় কয়েক গুণ হলে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়। একই বন্যায় ভাঙনের কারণে প্রায় ৩৩ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। পাঁচটি জেলার কৃষি খাত যে নদীর ওপর নির্ভরশীল, তার এমন বেহাল অবস্থা বিরূপ প্রভাব ফেলছে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির ওপর। 
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, তিস্তা ব্যারাজ ফেজ ২-এ মোট এলাকা ৭.৫০ লাখ হেক্টর। তার মধ্যে সেচযোগ্য ৫.৪০ লাখ হেক্টর; প্রথম পর্যায়ে ১.১১ লাখ হেক্টর সেচযোগ্য এলাকাও বাস্তবায়িত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ ৪৮ ঘণ্টার সমাবেশ পরিচালনা করেছে; মূল দাবি– ইন্দো-বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
২০১৪-এর পর ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ পরিচালনায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে পানি মাত্র ২০০-৩০০ কিউসেকে নামছে, যেখানে কাঙ্ক্ষিত ছিল পাঁচ হাজার কিউসেক পর্যন্ত। এতে নদীতীরবর্তী প্রায় ২০ হাজার পরিবার বসতি হারিয়েছে, ভাঙনের ফলে নদীর প্রস্থ কখনও পাঁচ কিলোমিটার অতিক্রম করেছে। 
ফুলগাজী, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, রংপুর এলাকাসহ চরাঞ্চলে মানবিক দুর্দশা: জনগণ বাঁধ নির্মাণে ব্যস্ত থাকলেও সরকারি সহায়তা আদৌ মেলে না। বর্ষা মৌসুমে বন্যায় পানিবন্দি মানুষের জন্য পৌঁছায় না কোনো ত্রাণ। তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরতে পৌঁছায় না কোনো ক্যামেরা। তিস্তাপারের মানুষ যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। 
সরকারের ঘোষণা বাতাসে ভেসে যায়; চীনের সহায়তায় মহাপরিকল্পনার গতিবিধি ডুবেছে। ২০১৬ সাল নির্ধারিত হলেও ২০২৫ সালেও প্রকল্প ‘কল্যাণমুক্ত’। তিস্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমন– ইন্দো-বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি অবিলম্বে প্রণয়ন; ব্যারাজ উজান থেকে মৌসুমভিত্তিক পানির মুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করা; সংযত ও পরিবেশবান্ধব ছোটখাটো বাঁধ ও খাল খনন করে চ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণ; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাস ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং বার্ষিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য শুরু করা ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ প্রতিবেদন জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা।
২০ বছর ধরে ‘মহাপরিকল্পনা’ কার্যক্রম কাগজ-কলমেই চলছে। কিন্তু তিস্তার দুই পারের মানুষ আজও দুর্ভোগের শিকার। জলবায়ু পরিবর্তন ও উপযুক্ত নদী ব্যবস্থাপনার অভাব এ দুর্দশা আরও জটিল করছে। এখন সময় পানি-নদী-জনতা-প্রকৃতি সবই যেন একসঙ্গে বাঁচে, সেই চিন্তা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার।

আরিফুল ইসলাম রাফি: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×