ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ

রহস্যঘেরা পৃথিবীর গভীরতম খাত

রহস্যঘেরা পৃথিবীর গভীরতম খাত
×

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৪ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ২১:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীতে এমন একটি স্থান আছে, যেখানে মাউন্ট এভারেস্টকেও যদি উল্টে রাখা হয়, তবুও এর চূড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ স্পর্শ করতে পারবে না। সেই স্থানটি হলো মারিয়ানা ট্রেঞ্চ–প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে অবস্থিত এক গভীর খাত, যা মানুষের কল্পনার সীমানাকেও হার মানায়। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই চরম প্রতিকূল পরিবেশে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে এক নতুন পৃথিবীর গল্প, যেখানে চরম চাপ আর অন্ধকারের মধ্যেও প্রাণের স্পন্দন চলছে অবিরাম।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ কেবল সমুদ্রের তলদেশে একটি গর্ত নয়; এটি দুটি বিশাল টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলাফল। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে, গুয়াম দ্বীপের কাছে অবস্থিত এই ট্রেঞ্চটি লম্বায় প্রায় দুই হাজার ৫৫০ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ৬৯ কিলোমিটার। এখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটটি ফিলিপাইন সাগর প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে; যাকে বলা হয় ‘সাবডাকশন’। প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটের এ অংশটি জুরাসিক যুগের (প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বছর আগের) এবং এটি অত্যন্ত ভারী ও ঠান্ডা; যার ফলে এটি খাড়াভাবে পৃথিবীর ম্যান্টলের দিকে দেবে যাচ্ছে। এই ট্রেঞ্চের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ হলো পৃথিবীর গভীরতম বিন্দু, যা গভীরতা ১০ হাজার ৯৩৫ মিটার (± ৬ মিটার)।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের জীববৈচিত্র্য নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের আট হাজার মিটার নিচে, যেখানে পানির চাপ আঙুলের ডগায় একটি আস্ত হাতি রাখার সমান, সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। অথচ ঠিক এ গভীরতাতেই রাজত্ব করে এক অদ্ভুত দর্শন প্রাণী–নাম ‘হ্যাডাল স্নেইলফিশ’। পৃথিবীর গভীরতম স্থানে বসবাসকারী এ মাছটি আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়। গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে মাছের বেঁচে থাকার জন্য ‘টিএমএও’ নামক এক বিশেষ রাসায়নিক উপাদানের প্রয়োজন হয়। এ উপাদানটি মাছের কোষের প্রোটিনকে উচ্চ চাপের কারণে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের শরীরে ‘টিএমএও’-এর পরিমাণ বাড়তে থাকে। তবে তাত্ত্বিকভাবে আট হাজার ২০০ মিটার গভীরতায় পৌঁছানোর পর কোনো মাছের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এই সীমানার নিচে রাজত্ব করে ‘অ্যাম্পিপড’ বা এক ধরনের চিংড়িসদৃশ প্রাণী। এরা ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং কাঠের টুকরো পর্যন্ত হজম করতে সক্ষম। তাদের শরীরে ‘সাইলো-ইনোসিটল’ নামক উপাদান থাকে, যা তাদের প্রোটিনকে রক্ষা করে। 

২০২৫ সালের মার্চ মাসে ‘সেল’ জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চীনা বিজ্ঞানীদের একটি দল মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মাটি বা পলি পরীক্ষা করে সাত হাজার ৫৬৪টি নতুন প্রজাতির অণুজীব এবং দুই হাজারেরও বেশি নতুন ভাইরাসের সন্ধান পেয়েছে। এদের কেউ কেউ সালফার বা হাইড্রোকার্বন খেয়ে বেঁচে থাকে। আবার ভাইরাসের উপস্থিতি নির্দেশ করে, এখানে ‘ভাইরাল শান্ট’ নামক এক প্রক্রিয়া কার্যকর, যেখানে ভাইরাস অণুজীবদের মেরে ফেলে তাদের পুষ্টি উপাদান পুনরায় পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়, যা খাদ্যের অভাব মেটাতে সাহায্য করে।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা যদি হয় ভয়ের কারণ, তবে এর ‘শিনকাই সিপ ফিল্ড’ হলো আশার আলো। প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত এ অঞ্চলটি পৃথিবীর জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে। ‘সার্পেন্টিনাইজেশন’ নামক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখানে পাথর এবং পানির বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন ও মিথেন গ্যাস নির্গত হয়। এ অঞ্চলটি ক্ষারীয় বা অ্যালকালাইন ভেন্টসমৃদ্ধ, যেখানে ব্রুসাইট নামক খনিজ দিয়ে তৈরি চিমনির মতো কাঠামো দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর আদিম সমুদ্রে ঠিক এভাবেই জীবনের প্রথম স্পন্দন শুরু হয়েছিল। এমনকি শনি বা বৃহস্পতির চাঁদ এনসেলাডাস বা ইউরোপার বরফ ঢাকা সমুদ্রের নিচেও এমন পরিবেশ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×