কাঠ-টিনের আস্ত ঘরের বাজার
মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর, টঙ্গিবাড়ী, লৌহজং ও সিরাজদীখান উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সারি সারি সাজানো রয়েছে এসব দৃষ্টিনন্দন ঘর
কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ২০:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইট-বালু-সিমেন্ট কিনে মাসের পর মাস অপেক্ষা করে বাড়ি বানানোর দিন হয়তো অনেকের জন্যই ফুরিয়েছে। কারণ, চাইলেই এখন বাজার থেকে কিনে আনা যায় আস্ত একটি নান্দনিক ঘর! টিন আর কাঠের তৈরি এমন রেডিমেইড বা ‘আস্ত ঘর’ বিক্রির এক অনন্য বাজার গড়ে উঠেছে মুন্সীগঞ্জে। জেলার সদর, টঙ্গিবাড়ী, লৌহজং ও সিরাজদীখান উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সারি সারি সাজানো রয়েছে এসব দৃষ্টিনন্দন ঘর। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলা এই ঐতিহ্যবাহী ঘর তৈরির ব্যবসা আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে এখন দেশজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়।
প্রয়োজন থেকে গড়ে ওঠা শিল্প
মুন্সীগঞ্জের এই আস্ত ঘর বিক্রির ব্যবসার পেছনে রয়েছে এক ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। প্রমত্তা পদ্মা ও মেঘনা বিধৌত বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জ চিরকালই নদীভাঙনকবলিত এলাকা। ভাঙনের মুখে মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে। তাই এমন ঘর নির্মাণের তাগিদ তৈরি হয়, যা প্রয়োজনে সহজেই খুলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়।
জানা যায়, মানুষের এ সমস্যার কথা মাথায় রেখে নব্বইয়ের দশকে মুন্সীগঞ্জ সদরের ধলাগাঁও বাজারের কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান প্রথম ঢেউটিন ও কাঠ দিয়ে রেডিমেইড ঘর বানানোর ধারণা নিয়ে আসেন। সে সময় কাঠ ব্যবসায়ীরা বড় গাছ থেকে ভালো কাঠ বের করার পর অবশিষ্ট ছোট টুকরা কাঠগুলো জোড়াতালি দিয়ে কম দামে ঘর বানাতেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা এসব ঘর কিনলেও, স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে প্রেক্ষাপট, বদলেছে ক্রেতার রুচি। এখন আর জোড়াতালি দেওয়া কাঠ নয়, বরং লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা উন্নতমানের কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিলাসবহুল সব ঘর।
ইউরোপের আদলে কটেজ ঘর
মুন্সীগঞ্জের বর্তমান ঘরের বাজার ঘুরে সবচেয়ে বড় চমকটি হলো ‘কটেজ ঘর’। একসময় টিন ও কাঠের ঘরে এসির (এয়ার কন্ডিশনার) ব্যবহার ছিল অকল্পনীয়। এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাড়ির ক্যাটালগ দেখে নিখুঁত নকশায় তৈরি হচ্ছে এসব ঘর, যেখানে ব্যবহার করা যাচ্ছে এসি।
কীভাবে সম্ভব হলো এই অসাধ্য সাধন? বড় নওপাড়া এলাকার ঘর ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন জানালেন এর পেছনের গল্প, ‘গরমের তীব্রতা বাড়ায় ক্রেতারা কাঠের ঘরেও এসি লাগাতে চাইছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই আমরা ডিজাইনে পরিবর্তন আনি।’
সাধারণত কাঠের ঘরের বেড়া টিনের হলেও, কটেজ ঘরগুলোয় বেড়া এবং চালের নিচে কাঠ বা কার্ডবোর্ড ব্যবহার করা হয়। কাঠের জোড়াগুলো বিশেষ পুটিং দিয়ে নিখুঁতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বাইরে যেতে না পারে। এ ছাড়া দরজা ও জানালায় আধুনিক থাই গ্লাস ব্যবহার করায় ঘরগুলো হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। পাশাপাশি সাধারণ সাদা টিনের বদলে চালে ব্যবহৃত হচ্ছে রঙিন টালি টিন, যা ঘরের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই ঘরগুলোর স্থায়িত্ব ও আভিজাত্যের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এর কাঁচামালে। আগে মিয়ানমারের লোহাকাঠ বা শালকাঠ ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে দুষ্প্রাপ্যতা ও দাম বাড়ার কারণে নাইজেরিয়ান লোহাকাঠ, সেগুন, মেহগনি ও কেরোসিন কাঠ বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ঘরের মূল কাঠামো, খাম বা খুঁটিতে ব্যবহার করা হয় অত্যন্ত শক্ত নাইজেরিয়ান লোহাকাঠ, যার স্থায়িত্ব ১০০ বছরেরও বেশি। বেড়া ও নকশার কাজে ব্যবহৃত হয় মেহগনি বা কেরোসিন কাঠ। নরম হওয়ায় এগুলোয় সহজেই দৃষ্টিনন্দন নকশা ফুটিয়ে তোলা যায়। মেহগনি কাঠের ঘরগুলো অনায়াসে ৪০-৫০ বছর টিকে থাকে।
এই শিল্পের প্রাণ হলেন কারিগররা। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ থেকে আসা হাজারেরও বেশি দক্ষ শ্রমিক মুন্সীগঞ্জের এ কারখানাগুলোয় কাজ করছেন। কাঠমিস্ত্রি সনৎ চন্দ্র বালা, কামরুল ইসলাম ও রাজু হোসাইনদের মতো কারিগরদের হাতের জাদুতে কাঠগুলো হয়ে ওঠে জীবন্ত। কারিগররা চুক্তিতে বা দৈনিক ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরিতে কাজ করেন। একটি কটেজ ঘর পাঁচ থেকে সাতজন মিস্ত্রির তৈরি করতে সময় লাগে এক থেকে দেড় মাস।

চাহিদা ও বাজারদর
ইউটিউব ও ফেসবুকে এসব বাহারি ঘরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। বর্তমানে এক থেকে তিন তলা পর্যন্ত ঘর তৈরি হচ্ছে। একেকটি রেডিমেইড ঘরের দাম শুরু হয় আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা থেকে, যা নকশা ও কাঠের মানভেদে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে অনেক শৌখিন ক্রেতা নিজ বাড়িতে মিস্ত্রি নিয়ে গিয়ে ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রাসাদের মতো দ্বিতল বা ত্রিতল কাঠের ঘরও নির্মাণ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ঢাকা, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা আসছেন মুন্সীগঞ্জে। বিশেষ করে সিলেট, কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন রিসোর্ট মালিকদের কাছে এ কটেজ ঘরগুলোর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। ঘর ব্যবসায়ী জসিম ব্যাপারী জানান, ক্রেতারা ঘর পছন্দ করেন। কিনে নেওয়ার পর মিস্ত্রিরা গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে তা নিখুঁতভাবে স্থাপন করে দিয়ে আসেন।
প্রয়োজন থেকে শুরু হওয়া মুন্সীগঞ্জের এই ‘আস্ত ঘর’ নির্মাণ আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল শিল্পে। টঙ্গিবাড়ীর বালিগাঁও, দিঘিরপাড়, সদর উপজেলার বজ্রযোগিনী, বাগেশ্বর, লৌহজংয়ের কলাবাগান কাঠপট্টি কিংবা সিরাজদীখানের কুচিয়ামোড়া–যেদিকে চোখ যায়, দেখা মেলে আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি শত শত নতুন ঘরের। নদীভাঙনের ভয় জয় করে এই কাঠ-টিনের ঘরগুলো আজ কেবল আশ্রয়ের প্রতীক নয়, বরং আভিজাত্য ও নান্দনিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- বিষয় :
- আস্ত ঘর
- মুন্সীগঞ্জ