সার্ফিংয়ে অদম্য দুজন
ইব্রাহিম খলিল মামুন
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১২:৪৫ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৩:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের বুকে আছড়ে পড়ছে একের পর এক উত্তাল ঢেউ। সেই ঢেউয়ের গর্জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন শুরু হয় এক অন্যরকম জীবনসংগ্রাম ও স্বপ্ন বোনার গল্প। সার্ফবোর্ড হাতে ঢেউয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া এ তরুণরা শুধু সমুদ্রকেই জয় করছেন না, জয় করছেন জীবনের শত বাধাবিপত্তিকেও। এমনই দুই অদম্য স্বপ্নবাজ তরুণের নাম ফাতেমা আক্তার ও মোহাম্মদ মান্নান…
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো সার্ফিং হয়তো এখনও তেমন পরিচিতি পায়নি, কিন্তু দুই তরুণ সার্ফার ফাতেমা আক্তার ও মোহাম্মদ মান্নান ইতিহাস গড়তে চলেছেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ২০তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন তারা।
ঢেউয়ের বুকে মুক্তির আনন্দ
‘সার্ফিং বোর্ডে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বাকি সবকিছু ভুলে যাই’–কথাগুলো বলছিলেন ফাতেমা আক্তার। তাঁর চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত তৃপ্তি। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে, বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে, একজন কিশোরীর জন্য সার্ফবোর্ড হাতে সমুদ্রে নেমে পড়া মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। পদে পদে তাঁকে সইতে হয়েছে সামাজিক কটূক্তি আর রক্ষণশীল ভ্রুকুটি।
মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান ফাতেমা। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট এই কিশোরীর বেড়ে ওঠা চরম অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। মা অন্যের বাড়িতে রান্না করে সংসার চালান। দারিদ্র্যপীড়িত এ অঞ্চলে বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রম খুব সাধারণ দৃশ্য। ফাতেমাকেও প্রতিনিয়ত পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
ফাতেমার ভাষায়, ‘আমাদের এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দারিদ্র্য। সমাজের মানুষ সবসময় প্রত্যাশা করে মেয়েরা বড় হয়ে পরিবারের আয়ে সাহায্য করবে, না হয় বিয়ে করে সংসার সামলাবে।’
তবে ফাতেমার অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘যে বন্ধুদের সঙ্গে আমি সার্ফিং শিখেছি, তাদের অনেকেই আজ বাল্যবিবাহের শিকার। সমুদ্রসৈকতে কাটানো সেই দিনগুলোর কথা তাদের খুব মনে পড়ে। ওরা যখনই পারে, আমাকে বলে, বিয়ে করিস না। তুই সার্ফিংটা ধরে রাখ।’
বন্ধুদের এ আক্ষেপ আর সমুদ্রের বিশালতা ফাতেমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। ‘যখন সফলভাবে কোনো ঢেউয়ের চূড়ায় উঠি, তখন এক অদ্ভুত আনন্দ আর তৃপ্তি কাজ করে। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়’–দীপ্ত কণ্ঠে জানান এ কিশোরী।
ঝিনুক বিক্রেতা থেকে সার্ফার
কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা এলাকার ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মানিকের ছেলে মোহাম্মদ মান্নান। চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় মান্নানের গল্পটাও শুরু হয়েছিল এ কক্সবাজার সৈকতেই। পরিবারের হাল ধরতে একসময় এ সৈকতেই ঝিনুকের গহনা বিক্রি করতেন তিনি। ছোটবেলায় স্কেটবোর্ডিংয়ের হাতেখড়ি হলেও, অচিরেই সমুদ্রের ঢেউ তাঁকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে।
‘সার্ফিংয়ের তুলনায় স্কেটবোর্ডিং বেশ ছোট পরিসরের একটা খেলা। আমি সার্ফিংয়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ এর সঙ্গে আছে সমুদ্রের নিবিড় সম্পর্ক’– বলেন মান্নান।
বিশ্বমানের কোচ বা একাডেমির অভাবে মান্নান নিজেকে তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ নিজ চেষ্টায়। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দূর থেকেই বিশ্বের সেরাদের খেলা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। হাওয়াই দ্বীপের কিংবদন্তি এবং দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জন ফ্লোরেন্সের ইউটিউব ভিডিও দেখেই নিজের কৌশলগুলোকে নিখুঁত করেছেন এই তরুণ।
ইতোমধ্যে ভারত ও মালদ্বীপে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে মান্নানের। তিনি বলেন, ‘বিশ্বমঞ্চের লড়াইটা কতটা কঠিন। অন্যান্য দেশের সার্ফাররা আমাদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে। কারণ তাদের কাছে উন্নতমানের বোর্ড আছে, তারা বড় ঢেউয়ে অনুশীলনের সুযোগ পান এবং নিয়মিত বিভিন্ন দেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন।’
মান্নান স্বপ্ন দেখেন, ‘বাংলাদেশে সার্ফিং হয়তো এখনও আর্থিকভাবে খুব একটা লাভজনক নয়। ভবিষ্যতে যে এটি বড় পরিসরে জায়গা করে নেবে না, তা কেউ বলতে পারবে না।’
প্রস্তুতির ঘাটতি, স্পন্সরের আক্ষেপ
জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে সার্ফিং ইভেন্ট বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল মাইলফলক। এই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থসংকট এবং যথাযথ প্রস্তুতির অভাব।
সার্ফার মান্নান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘জাপানের সার্ফিং পরিস্থিতি এবং সমুদ্রের ঢেউ আমাদের দেশের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। সেখানে ঢেউ অনেক বড়। তাই প্রতিযোগিতার আগে সেখানে গিয়ে বা বড় ঢেউ আছে এমন কোনো দেশে গিয়ে মানিয়ে নেওয়াটা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’
ফাতেমাও একই সুরে বলেন, ‘আমরা যদি প্রতিযোগিতার আগে অন্তত দুই সপ্তাহ বা এক মাসের জন্য বড় ঢেউয়ে অনুশীলনের সুযোগ পাই, তবে আমাদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যাবে।’
সার্ফিং কোচ রাশেদ আলম তাঁর শিষ্যদের সামর্থ্য নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তিনি মনে করেন, ‘সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তারা শুধু এশিয়ান গেমস নয়, অলিম্পিকের মঞ্চেও লড়তে সক্ষম। এশিয়ান গেমসের আগে যদি আমাদের সার্ফারদের জন্য ইন্দোনেশিয়া বা শ্রীলঙ্কায় অন্তত দুই সপ্তাহের একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা যায়, তবে তারা চমৎকার পারফরম্যান্স দেখাতে পারবে।’
সব পরিকল্পনাই থমকে আছে স্পন্সরের অভাবে। বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ মো. সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, ‘বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) মানদণ্ড অনুযায়ী অ্যাথলেটদের তালিকা ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, তা এখনও মেলেনি। আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে স্পন্সরশিপের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা দ্রুতই অ্যাথলেটদের দেশের বাইরে অনুশীলনে পাঠাতে পারতাম।’
স্বপ্নের লাল-সবুজ
সার্ফিং এখন আর নিছক কোনো শখ নয়, ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিক থেকেই এটি একটি স্বীকৃত অলিম্পিক ইভেন্ট। বিশ্বজুড়ে সার্ফিংয়ের যখন জয়জয়কার, তখন বাংলাদেশের মতো দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের দেশে এই খেলার যে বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ফুটবলের বিশ্বকাপ বা ক্রিকেটের উন্মাদনার ভিড়ে ফাতেমা আর মান্নানের মতো সংগ্রামীদের গল্প হয়তো পত্রিকার প্রথম পাতায় খুব বেশি জায়গা পায় না। তাতে তাদের স্বপ্ন দেখায় কোনো ভাটা পড়েনি। কোনো এক কুয়াশা ঢাকা ভোরে যখন শহরবাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন কক্সবাজারের নোনাজলে এই সার্ফাররা প্রতিদিন নিজেদের তিল তিল করে প্রস্তুত করেছেন। তাদের একটাই স্বপ্ন–জাপানে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউকে জয় করে লাল-সবুজ পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। এখন শুধু প্রয়োজন দেশের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ এবং পৃষ্ঠপোষকদের একটু সদয় দৃষ্টি।
নিবন্ধে ব্যবহৃত ছবি:: মুনির উজ জামান / এএফপি
- বিষয় :
- সাঁতারু