ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

শান্তিময় বিশ্ব বিনির্মাণে সমবায়

শান্তিময় বিশ্ব বিনির্মাণে সমবায়
×

সমবায়ের মধ্য দিয়ে অনেক নারী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছেন

 লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

এ বছরের ‘আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস’ এমন এক সময়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যখন একদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি আর মুক্তবাজার অর্থনীতির অসম প্রতিযোগিতায় পিষ্ট প্রান্তিক মানুষ। এখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার এক পরীক্ষিত হাতিয়ার হিসেবে আবার সামনে উঠে আসছে ‘সমবায়’ বা কো-অপারেটিভ মডেল।
এ বছরের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য–‘শান্তিময় বিশ্বের জন্য সমবায়’। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল যুদ্ধ বা সংঘাত না থাকাই শান্তি নয়; প্রকৃত শান্তি তখনই আসে যখন সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তি এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত হয়। সমবায় ব্যবস্থা ঠিক এ কাজটিই করে। এটি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে সমবায় আন্দোলন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সংবিধানেও সমবায়কে (অনুচ্ছেদ ১৩-খ) রাষ্ট্রায়ত্ত ও ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি সম্পদের মালিকানার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশের সমবায়ের সফলতার কথা উঠলে সবার আগে আসে ‘মিল্ক ভিটা’র নাম। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সমবায়ের সদস্য বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার খামারি। শুধু ন্যায্যমূল্যই নয়, গবাদিপশুর চিকিৎসা, উন্নত জাতের বীজ এবং ঋণ সুবিধাও দেয় এ সমবায়। তবে সম্প্রতি বিবিধ সমস্যার সম্মুখীন এই প্রতিষ্ঠান; যার মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমবায়কে যথাযথ মূল্যায়ন না করা।
১৯৫৫ সালের কথা। মহাজনদের চড়া সুদের ঋণের জালে আটকে পড়া দরিদ্র খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে বাঁচাতে ফাদার চার্লস জোসেফ ইয়াং মাত্র ২৫ টাকা পুঁজি এবং ৫০ জন সদস্য নিয়ে রাজধানীর লক্ষ্মীবাজারে গড়ে তুলেছিলেন ‘ঢাকা ক্রেডিট’। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগটি এক হাজার ৫৩৯ কোটি টাকার বিশাল সম্পদে পরিণত হয়েছে!  
সমবায় যে শুধু সনাতনী কৃষি বা ঋণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তার প্রমাণ মেলে পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় অঞ্চলে। ‘লজিক’ প্রকল্পের আওতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্বান্ত হওয়া নারীরা আজ সমবায়ের ছায়াতলে একজোট হয়েছেন। তারা ব্যক্তিগতভাবে ঋণ না নিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে তহবিল গঠন করছেন। সেই টাকায় জমি লিজ নিয়ে জলবায়ু সহনশীল ফসল (যেমন মুগ ডাল, তরমুজ) চাষ করছেন, হাঁস-ভেড়া পালন করছেন।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশজুড়ে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার নিবন্ধিত সমবায় সমিতিতে যুক্ত আছেন এক কোটি ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ। তবে আইডিএসের মতে, দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশ সমবায় সমিতিই অকার্যকর। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতারা সমবায় দখল করে নিচ্ছেন। ঋণ লুটপাট করার অভিযোগও রয়েছে।
‘শান্তিময় বিশ্বের জন্য সমবায়’–এই স্লোগান কেবল একটি বুলি নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক দর্শন। মানুষে মানুষে বৈষম্য কমিয়ে, একতাবদ্ধভাবে লড়ে যাওয়ার যে শক্তি সমবায় দেয়, তা দিয়ে কেবল দারিদ্র্যই দূর হয় না, বরং রচিত হয় একটি টেকসই ও শান্তির সমাজ। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়েই কেবল সেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ সম্ভব। 

আরও পড়ুন

×