গ্যালারিতে রেকর্ডের উপাখ্যান
চলতি বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে ফ্রান্স-সুইডেনের মধ্যকার দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলার সময় মাঠে উপস্থিত দর্শক
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব। তার এই সামষ্টিক অস্তিত্বের সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ও বর্ণিল প্রকাশ ঘটে খেলাধুলার ময়দানে। একটি বল, একটি মাঠ আর তাকে ঘিরে থাকা হাজারো-লাখো মানুষের গগনবিদারী চিৎকার–খেলাধুলা কেবল এগারো বনাম এগারোর লড়াই নয়, এটি লাখো মানুষের এক অভিন্ন আবেগ-অনুভবের মঞ্চ। গত এক শতাব্দীতে মাঠে বসে খেলা দেখার এই সংস্কৃতির একটি বিশাল বিবর্তন ঘটেছে। উন্মুক্ত প্রান্তরের বাঁধনহারা ভিড় থেকে আজকের যুগের সুনিয়ন্ত্রিত, প্রযুক্তিনির্ভর গ্যালারিতে উত্তরণের এই গল্প কেবল ক্রীড়া ইতিহাসের নয়, বরং মানব মনস্তত্ত্ব, স্থাপত্যবিদ্যা ও নিরাপত্তার এক যুগান্তকারী উপাখ্যান।
দর্শক সমাগমের কথা বললে প্রথমেই আসে সীমাহীন বিস্তৃতির কথা। ‘ট্যুর ডি ফ্রান্স’-এর মতো সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় কয়েক সপ্তাহে রাস্তার দু’পাশে জড়ো হন কোটি মানুষ। তবে আবদ্ধ স্টেডিয়ামের উন্মাদনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত স্টেডিয়ামের গ্যালারিগুলো ছিল উন্মুক্ত কংক্রিটের গ্যালারি। কে কোথায় বসবে তার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম ছিল না। যত মানুষ, তত ভিড়।
এই উন্মাদনার চূড়ান্ত রূপ বিশ্ব দেখেছিল ১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে। ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মধ্যকার সেই ‘মারাকানাজো’ বিশ্বকাপ ফাইনালে উপস্থিত ছিলেন প্রায় দুই লাখ দর্শক (আনুষ্ঠানিক হিসাব এক লাখ ৭৩ হাজার ৮৫০ জন)। গ্যালারির প্রতিটি ইঞ্চি সেদিন ঢাকা পড়েছিল মানুষের উপস্থিতিতে। এর আগে ১৯২৩ সালে লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে এফএ কাপ ফাইনালে প্রায় তিন লাখ মানুষ গেট ভেঙে ঢুকে পড়েছিল; যাদের সামলাতে মাঠে নামাতে হয়েছিল ঘোড়সওয়ার পুলিশ!
দর্শক উপস্থিতির এই রোমাঞ্চকর ইতিহাস থেকে আমাদের এ বঙ্গভূমিও পিছিয়ে নেই। ১৯৩৭ সালে লন্ডনের অপেশাদার ফুটবল দল ‘ইসলিংটন করিন্থিয়ান্স’ বিশ্বভ্রমণে বের হয়। তাদের এশিয়ান সফরের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটেছিল আমাদের চট্টগ্রামেই। ১৯৩৭ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম পুলিশ গ্রাউন্ডে স্থানীয় একাদশের বিপক্ষে তাদের ম্যাচটি দেখতে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রায় ৭৭ হাজার দর্শক! সে আমলের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল এক অভাবনীয় জনসমুদ্র।
পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে এই উন্মাদনার নতুন কেন্দ্র। আশির দশকে আবাহনী-মোহামেডান ‘ঢাকা ডার্বি’ মানেই ছিল ৫৫ হাজার ধারণক্ষমতার গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। সে সময়কার উন্মাদনা এতটাই তীব্র ছিল, অনেক সময় তা গ্যালারি ছাড়িয়ে মাঠেও গড়িয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নিরাপত্তার স্বার্থে স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন করা হয়। ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময় মিরপুরে শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা কমিয়ে আনা হয় ৩৬ হাজারে এবং এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৪০০-তে।
গ্যালারির এই অবারিত স্বাধীনতার একটি ভয়ানক অন্ধকার দিকও ছিল। ভিড় যখন প্রতি বর্গমিটারে চার থেকে পাঁচজনের বেশি হয়ে যায়, তখন মানুষ তাঁর নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ভিড় তখন তরল পদার্থের মতো আচরণ করে। এই অমোঘ পদার্থবিদ্যার সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রমাণ মেলে ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল ইংল্যান্ডের শেফিল্ডে।
হিলসবরো স্টেডিয়ামে লিভারপুল ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের মধ্যকার ম্যাচে অতিরিক্ত দর্শক প্রবেশের ফলে সৃষ্ট চাপে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান ৯৭ জন লিভারপুল সমর্থক। লোহার ফেন্সিং এবং অপরিকল্পিত ধারণক্ষমতাই ছিল এ ট্র্যাজেডির মূল কারণ। এ ঘটনার পর লর্ড জাস্টিস টেলরের বিখ্যাত ‘টেলর রিপোর্ট’ পুরো বিশ্বের স্টেডিয়াম স্থাপত্যের ধারণা বদলে দেয়। বাতিল করা হয় দাঁড়িয়ে খেলা দেখার গ্যালারি। জন্ম হয় ‘অল-সিটার’ বা সম্পূর্ণ আসনযুক্ত স্টেডিয়ামের। নিরাপত্তার এ কড়াকড়িতে রাতারাতি স্টেডিয়ামগুলোর দর্শক ধারণক্ষমতা প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়।
একুশ শতকে এসে মানুষের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক সফলতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে আধুনিক স্টেডিয়ামগুলো। বর্তমানে দর্শকসংখ্যা মানে ভিড় নয়, বরং বিক্রি হওয়া টিকিটের সুনির্দিষ্ট হিসাব। ভারতের আহমেদাবাদে অবস্থিত এক লাখ ৩২ হাজার ধারণক্ষমতার ‘নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম’ কিংবা অস্ট্রেলিয়ার এক লাখ ২৪ হাজার আসনের ‘মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড’ (এমসিজি) আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডা) এই বাণিজ্যিক ও কাঠামোগত বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ দেখাচ্ছে। গ্রুপ পর্বেই মোট ৪৬ লাখের বেশি দর্শক স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখেছেন, যেখানে স্টেডিয়ামগুলোয় ধারণক্ষমতার ৯৯.৭ শতাংশ পূর্ণ ছিল। ফ্রান্স-সুইডেনের মধ্যকার দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলার মাধ্যমে তা পৌঁছায় ৫০ লাখে। গত ২৫ জুন অনুষ্ঠিত খেলাগুলোয় এক দিনে চার লাখ ২৬ হাজার ৮৩৪ জন দর্শক মাঠে উপস্থিত হয়ে ফিফার ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
সবাইকে সিটে বসিয়ে স্টেডিয়াম নিরাপদ করা গেছে ঠিকই, কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবলের সেই পুরোনো গগনবিদারী উন্মাদনা যেন কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে। তাই নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করেই এখন ইউরোপের মাঠে ফিরছে ‘সেইফ স্ট্যান্ডিং’ বা রেল সিটিং ব্যবস্থা; যেখানে দর্শক নিরাপদে দাঁড়িয়ে প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রযুক্তির এই যুগে ঘরে বসে কোটি কোটি মানুষ খেলা দেখতে পারেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ হয়তো ২০৫ মিলিয়ন মানুষ টিভিতে দেখেছেন। তারপরও মানুষ পকেটের টাকা খরচ করে, মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে স্টেডিয়ামে যান। কারণ, হাজারো মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উল্লাস করা বা কান্নায় ভেঙে পড়ার যে সামষ্টিক আবেগ তা কোনো স্ক্রিন দিতে পারে না। মারাকানার সেই কংক্রিটের গ্যালারি থেকে আজকের অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম–সময় ও কাঠামো বদলালেও, মানুষের এই একসঙ্গে উদযাপনের চিরন্তন তৃষ্ণা আজও একইরকম রয়ে গেছে।।
- বিষয় :
- খেলা
