তেহরানে শোকের ছায়া
আলি খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু
মরদেহ নেওয়া হবে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়ও
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের দাফন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। তেহরানে ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় গতকাল শুক্রবার দেশি-বিদেশি কর্মকর্তারা তাদের শেষ শ্রদ্ধা জানান -এএফপি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় এক সুবিশাল হলে রাখা হয় তাঁর মরদেহ। এ সময় খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান ইরানের ধর্মীয় নেতা, কর্মকর্তা, বিদেশি প্রতিনিধি ও অন্যান্যরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় গত ফেব্রুয়ারিতে প্রাণ হারান তিনি।
খামেনির দাফনে ও শেষ বিদায়ে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ইরান। খামেনির মরদেহ নিয়ে কোম, নাজাফ ও কারবালায় যাওয়ার কথা রয়েছে। পরে আগামী বৃহস্পতিবার মাশহাদে ইমাম রেজার কবরের কাছেই তাঁকে দাফন করা হবে। মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার দেশটির সবচেয়ে পবিত্র স্থান বলে গণ্য হয়।
পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে, ৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান হবে। তাঁর সঙ্গে পরিবারের নিহত সদস্যদের কফিনও রাখা হবে। ৬ ও ৭ জুলাই তাঁর শেষ বিদায়ের মিছিল তেহরানের অন্যান্য অংশে যাবে এবং কোমের পথে যাত্রা শুরু করবে।
ইরান ও ইরাকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে গ্রহণ করা হবে খামেনির মরদেহ। এর পর ইরাকের শহর নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে কফিন। এর পর মরদেহ ফিরিয়ে এনে ৯ জুলাই সমাহিত করা হবে মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে। জানা গেছে, প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেবেন শোকের অনুষ্ঠানে।
গত বৃহস্পতিবার শেষ ভাগে খামেনির কফিন সামনে আনা হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন শোকাহত সমর্থকরা। কাউকে সেই সময় কাঁদতে দেখা যায়, কাউকে আবার দেখা যায় দূর থেকেই ফুল ছুড়ে দিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মরদেহ পরে গতকাল শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় এনে রাখা হয়। খামেনির মেয়ে, জামাতা, শিশু নাতনি, পুত্রবধূর কফিনসহ মোট পাঁচটি কফিন দেখা যায় সেখানে।
ইরানের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্তে খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশটি সদ্য একটি যুদ্ধ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় ধরনের আঘাত প্রতিহত করে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, খামেনির জানাজার অনুষ্ঠান প্রতীকী অর্থও বহন করছে। রাষ্ট্রীয় শক্তি ও গণমানুষের সমর্থন এর মধ্য দিয়ে বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইরান। ধারণা করা হচ্ছে, দুই কোটিরও বেশি মানুষ সমবেত হবেন খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর বলছে, তেহরানের হোটেলগুলোতে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। স্কুল, মসজিদ ও খেলার হলগুলোও শোক জানাতে আসা মানুষের বসবাসের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বাস ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সবাইকে মূল অনুষ্ঠানস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
কড়া নিরাপত্তা
খামেনির জানাজা কেন্দ্র করে তেহরানের সড়কে কড়া নিরাপত্তা দেখা গেছে। সামরিক ও পুলিশের গাড়ি উপস্থিত ছিল। মোটরসাইকেলে হাজির হয়েছিলেন আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সদস্যরাও। তাদের প্রধান প্রধান সড়কগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। জানাজা চলাকালে যাতে কোনো হামলা না হয়, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তবে দেশি-বিদেশি অনেক উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও জানাজার অনুষ্ঠানে খামেনির ছেলে ও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি থাকবেন না বলে খবর এসেছে।
শোকের ছায়া
খামেনির জানাজার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও ভারতের প্রতিনিধিদের। ইরাক, আর্মেনিয়া, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান ও পাকিস্তানের শীর্ষ রাজনীতিবিদরা ইরানে পৌঁছেছেন বলে জানা গেছে।
ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারানো হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ ও জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইমাম মুঘনিয়েহর পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। ইরানের রাজনৈতিক নেতা, প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্যদের গতকাল শুক্রবার দেখা গেছে শোক প্রকাশ করতে।
সব মিলিয়ে ৩৭ বছর ইরানের শাসনভার খামেনির হাতে ছিল। ইরানে খামেনি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান ও বিপ্লবী আন্দোলনের নেতা ছিলেন না; শিয়া মুসলিমদের বিশ্বাস অনুসারে, তিনি তাদের ১২তম ইমামের প্রতিনিধি ছিলেন। মধ্য তেহরানে গতকাল একদল মানুষকে কাঁদতে ও শোকের স্লোগান দিতে দেখা যায়। অনেকে আবার তাঁর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের শাসনভার গ্রহণ করেন। রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন দেশটির ইসলামিক বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী এবং দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা। আলি খামেনি পরবর্তী সময় দেশটির সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীকে নতুন ছাঁচে গড়েছিলেন।
ইসলামে মৃত্যুর পর দ্রুত জানাজার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। খামেনির জানাজার অনুষ্ঠান মূলত যুদ্ধের কারণে দেরিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত মার্চে একবার উদ্যোগ নিলেও পরে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, যুদ্ধের সময় এই মাপে আয়োজন করা সম্ভব হতো না। পাশাপাশি আগতদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হতো। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কারণে যুদ্ধ অবসানের ও সংঘাত নিরসনে একটি পথ তৈরি হয়েছে।
প্রতিনিধি পাঠায়নি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে খামেনির জানাজা ও শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা সমবেত হয়েছেন। তবে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েতের মতো দেশগুলো। মূলত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্যরা এতে অংশ নেননি।
এর আগে ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। সেই সময় সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে এবার রিয়াদের পক্ষ থেকে এ রকম কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর এই অবস্থান কূটনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। খামেনির মৃত্যুতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ করেনি। ইরানের নতুন নেতার বিষয়েও প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরানও পাল্টা জবাব দিয়েছিল। তারা সেই সময় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে থাকা মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। কয়েক দিন আগেও এ রকম হামলার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে।
- বিষয় :
- ইরান
