ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এখন ক্রিপ্টো জগতে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জাতীয় পতাকা
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এখন চলছে ক্রিপ্টোকারেন্সির জগতে। ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের এক বছরে প্রায় ১২০ কোটি ডলার আয় করেছে। এই খবরের পাশাপাশি ক্রিপ্টো জগতে ইরানের অন্যরকম উপস্থিতির তথ্যও চমকে দেওয়ার মতো।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জামসহ গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটায় ডলার-টেথার (ইউএসডিটি) নামক ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে ইরান। এই মুদ্রাটি চালু করেছে মার্কিন কোম্পানি টেথার হোল্ডিংস। প্রতিষ্ঠানটি ১১৭ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের মার্কিন ট্রেজারি বিল (স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্র) কিনেছে। প্রতিষ্ঠানটির চালু করা স্টেবলকয়েন ইউএসডিটি মান মার্কিন ডলারের সমান। টেথারের মুদ্রা ইউএসডিটির বড় ক্রেতা ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার; যার একাংশ নেওয়া হয় ট্রেজারি বিল বিক্রির মাধ্যমে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করেন। ওয়াশিংটন ও তাদের মিত্ররা দেশটির ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশেষ করে তেল রপ্তানি ও পরিবহনকারী জাহাজগুলোর ওপর।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান নিজেদের জন্য একটি বিকল্প ক্রিপ্টো-ইকোসিস্টেম গড়ে তোলে। এর প্রতিষ্ঠাতারা দেশটির সর্বোচ্চ নেতার পরিবারের ঘনিষ্ঠ। ওই ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মটির নাম–নোবিটেক্স। গত বৃহস্পতিবার নোবিটেক্সের ওয়েবসাইটে গ্রাহক সংখ্যা দেখানো হয় ১১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১০ লাখ। নোবিটেক্সের মাধ্যমে ইউএসডিটি ব্যবহার করে ইরান তার কোনাকাটা করছে।
প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে মে মাসে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে রয়টার্স। তাতে বলা হয়, নোবিটেক্সের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মতো সংস্থাগুলো এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেন করে।
নোবিটেক্সের লেনদেন সম্পর্কে ধারণা রাখে এমন তিনটি ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী ফার্মের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে ইন্টারনেট শাটডাউন ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যেও প্ল্যাটফর্মটির লেনদেন প্রক্রিয়া চালু ছিল। ক্রিস্টাল ইন্টেলিজেন্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দাবি, ওই সময় নোবিটেক্সে ১০ কোটি ডলারের বেশি লেনদেন হয়; যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় ২০ শতাংশ।
গত ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আলজাজিরা জানায়, ইরানি অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে আইআরজিসি তার লেনদেনের প্রায় ৫০ শতাংশ ক্রিপ্টোর মাধ্যমে করেছে। প্রচলিত আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় এই লেনদেন বন্ধের উপায় না থাকায় তেল, অস্ত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রিপ্টো ইরানকে বড় সুবিধা দিচ্ছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, লেনদেনের তথ্য গোপন রাখতে ইরানের নোবিটেক্স তাদের ব্যবহৃত ওয়ালেট অ্যাড্রেসগুলো বারবার পরিবর্তন করে। ওয়ালেটগুলোর মধ্যকার সংযোগ আরও অস্পষ্ট বা গোপন করার জন্য তারা নিজস্ব ক্রিপ্টোগ্রাফিক টুলও তৈরি করেছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার বিশ্লেষণকারী নিউইয়র্কভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম মোবি বলছে, নোবিটেক্সের মাধ্যমে তেহরান সহজেই তাদের মুদ্রাকে ডলারে রূপান্তর করতে পারে।
ইয়াহু ফিন্যান্সে প্রকাশিত মোবির এক নিবন্ধ অনুযায়ী, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইআরজিসি তাদের তহবিলগুলো ইরানি রিয়াল বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে নোবিটেক্স অ্যাকাউন্টে জমা করে। তারপর ইউএসডিটি নামের স্টেবলকয়েন কিনে লেনদেন করে।
গত মার্চ মাসে ব্লুমবার্গে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন টেথার হোল্ডিংসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তা শিথিল করেন।
মার্কিন ঋণ, টেথার ও যুদ্ধের খরচ
ডেটা বিশ্লেষণের কানাডাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট গত জুন মাসের এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে মার্কিন ট্রেজারি বিল ও বন্ডে টেথারের বিনিয়োগ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির স্বর্ণের রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
ক্রিপ্টো অর্থনীতির এই চক্রে মার্কিন জাতীয় ঋণের বোঝা, টেথারের মুদ্রা ইউএসডিটি এবং ইরানের নোবিটেক্সের লেনদেন পরোক্ষভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। মোবি বলছে, একটু ভিন্নভাবে দেখলে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ মেটাতে ইরানকে সাহায্য করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপ
যুদ্ধ বিরতির আলোচনার মধ্যেই ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে ক্রিপ্টোর জগতে বড় পদক্ষেপ নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। সিএনএনে ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করেছে। ওই সময় মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ডিজিটাল ওয়ালেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তবে কোন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ওয়ালেটে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র তার স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে টেথারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দের কাজে তারা মার্কিন প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছে।
প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় লেনদেন হয়–সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন বা সুইফটের মাধ্যমে। এটি একটি সুরক্ষিত আন্তর্জাতিক মেসেজিং নেটওয়ার্ক, যা বিশ্বের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে অপরের সঙ্গে নিরাপদে আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদান করতে সাহায্য করে।
অপরদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন হয়–ব্লকচেইন নামক একটি সুরক্ষিত ও জটিল কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। যেখানে প্রচলিত কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকে না।
