ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

টাকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি

টাকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি
×

কোলাজ :: বোরহান আজাদ

 নিজাম বিশ্বাস

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম হলো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সদ্য স্বাধীন দেশটির নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন করতে কিছুটা সময় লেগে গেল। প্রথম দিকে এত দিন ব্যবহৃত পাকিস্তানি রুপির ওপর ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ওভারপ্রিন্ট করে বাজারব্যবস্থা সচল রাখা হলেও সেই মুদ্রার পরিমাণ ছিল অপ্রতুল। এ দেশে তখনও গড়ে ওঠেনি কোনো টাঁকশাল। তাই অল্প সময়ের মধ্যে নতুন মুদ্রা ছাপানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাহায্য গ্রহণ করে। ভারতের জাতীয় ছাপাখানা থেকে ছাপিয়ে আনা হয় ১, ৫, ১০ ও ১০০ টাকার নোট। এরপর ১৯৭২ সালের মার্চ-এপ্রিলে নোটগুলো ছাড়া হয় বাংলাদেশের বাজারে। নতুন মুদ্রা চালু হওয়ার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার পড়ে গেল আরেক বিপদে। বাজারে দেখা গেল জাল নোটের ছড়াছড়ি। জাল নোট প্রতিরোধে সরকার এবার নোটের কাগজে সিকিউরিটি থ্রেড, জলছাপসহ অন্যান্য সুরক্ষা বজায় রেখে নতুন নকশায় নোট ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিল। চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও কাইয়ুম চৌধুরীকে নিয়ে গঠন করা হলো নোটের নকশা প্রণয়ন কমিটি। প্রবীণ শিল্পীরা অনুজ কাইয়ুম চৌধুরীকেই দিলেন এই মহাদায়িত্ব। তিনি কাজ এগিয়ে নিতে না পারায় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নকশাকার খোঁজা শুরু হলো। এরই মধ্যে পটুয়া কামরুল হাসান একদিন জানতে পারলেন করাচি সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের একজন বাঙালি নকশাকারের কথা। অনেক খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে তাঁকে পাওয়া গেল। তিনি হলেন শিল্পী কে জি মুস্তফা। পরবর্তী সময়ে তাঁর হাতেই ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের অসাধারণ কিছু ধাতব ও কাগজের মুদ্রা। বাংলাদেশের কাগজের মুদ্রায় স্থাপত্যকলার উপস্থিতি দেখা গেছে দীর্ঘ সময় ধরে। টাকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হতে লেগে গেছে অনেক দিন। ১৯৮৭ সালে গভর্নর নুরুল ইসলামের স্বাক্ষরকৃত ৫০ টাকা মূল্যমানের নোটে প্রথম উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য এ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। স্থপতি মাইনুল হোসেনের নকশায় সৌধের নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৮২ সালে। কংক্রিট নির্মিত ৭টি ত্রিভুজাকৃতির স্তম্ভ দিয়ে মূল সৌধ গঠিত, যা ছোট হতে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে ওপরে উঠে গেছে। এর উচ্চতা ১৫০ ফুট। প্রথম স্তম্ভটির উচ্চতা কম হলেও প্রস্থে সবচেয়ে বড়। এটিকে আন্দোলনের সূচনা অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তী স্তম্ভগুলো দ্বারা যথাক্রমে ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১-কে বোঝানো হয়েছে। সর্বোচ্চ স্তম্ভটির দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নুরুল ইসলাম ছাড়াও পরবর্তী দুজন গভর্নর–শেগুফতা বখত চৌধুরী ও খোরশেদ আলমের স্বাক্ষরও পাওয়া যায় স্মৃতিসৌধ আঁকা ৫০ টাকা মূল্যমানের নোটে। এ নোটটি মুদ্রিত হয় গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে। ২০০০ সালে নোটটির নকশায় পরিবর্তন আনা হয়; সম্মুখভাগে জাতীয় স্মৃতিসৌধের পরিবর্তে রাখা হয় ‘জাতীয় সংসদ ভবনে’র ছবি। বাজারে প্রচলিত ১০ টাকার নোটে ‘বিজয় দিবস রজতজয়ন্তী ৯৬’ কথাটি ওভারপ্রিন্ট করে বাজারে ছাড়া হয় ১৯৯৬ সালে। গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের স্বাক্ষরিত এ নোটটি বাংলাদেশের প্রথম স্মারক নোট। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বিতীয়বারের মতো ৫০০ টাকার নোটের নকশায় নিয়ে আসে আমূল পরিবর্তন। নোটটির সম্মুখভাগে আবারও তুলে ধরা হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। একই বছর বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ১০ টাকা মূল্যমানের স্মারক মুদ্রাও অবমুক্ত করে; সেই মুদ্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’ উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পর হার না-মানা অপরাজেয় বাংলার অবয়বকে প্রতিষ্ঠিত করতে ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে একটি ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এর নামই ‘অপরাজেয় বাংলা’। ভাস্কর্যের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালে আর ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে এটি উদ্বোধন করা হয়। এটি নির্মাণ করেন মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ‘অপরাজেয় বাংলা’ নামকরণটি করেন মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। ২০০২ থেকে ২০১০ সালের ১০০ ও ৫০০ টাকা মূল্যমানের নোটে আবারও দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি–সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের টাকার নকশায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়। নতুন নকশায় মুদ্রিত সব কয়টি নোটেরই সম্মুখভাগে রাখা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং টাকার জমিনে স্মৃতিসৌধের ম্লান উপস্থিতি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বিজয়ের ৪০ বছর উপলক্ষে ৪০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক নোট ও ১০ টাকা মূল্যমানের একটি ধাতব মুদ্রা অবমুক্ত করে। অবিনিময়যোগ্য সেই নোটের সম্মুখভাগে জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং অপর পাশে উঠে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আলোকচিত্র। ধাতব মুদ্রায় অবিকল নকশা বজায় থাকলেও স্মৃতিসৌধ রাখা হয়নি। এরপর ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের ২৫ বছর পূর্তিতে অবমুক্ত হওয়া ২৫ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোটেও উঠে আসে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ২০১৮ সালে অবমুক্ত হওয়া ৭০ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোটেও দেখা যায় স্মৃতিসৌধ। ২০২১ সালে বাংলাদেশ উদ্‌যাপন করে বিজয়ের ৫০ বছর। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় নানা আয়োজনের মধ্যে স্মারক মুদ্রা প্রকাশ করতে দেখা যায়। বাজারে প্রচলিত ৫০ টাকার নোটের ওপর বিজয়ের ৫০ বছরের লোগো যুক্ত করে বিনিময়যোগ্য স্মারক নোট ছাড়া হয়; একই সঙ্গে অবিনিময়যোগ্য ৫০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক নোটও প্রকাশ করা হয়। সেই স্মারক নোটে স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিকৃতি উঠে আসে। একই বছর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০ টাকা মূল্যমানের একটি স্বর্ণমুদ্রা অবমুক্ত করে, যেখানে ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত হয়েছে। এর পরের বছর জাপান-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে একটি রঙিন মুদ্রা প্রকাশিত হয়; যার এক প্রান্তে আবারও উঠে আসে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন কাগজের মুদ্রা বাজারে ছাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই নতুন আটটি নোটের নকশা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রচার করে। সেই আটটি নোটের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাঁচটি নোট বাজারে ছাড়া হয়েছে। এই পাঁচটি নোটের মধ্যে ১০০০ টাকা মূল্যমানের ব্যাংক নোটে আবারও স্থান পেয়েছে স্মৃতিসৌধ এবং প্রস্তাবিত ২০০ টাকা মূল্যমানের নোটে দেখা যায় ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্য। বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত দুই টাকা মূল্যমানের নোটের সম্মুখভাগে রাখা হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ; সেই সৌধের নিচে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সুপ্রভাত’ কবিতার প্রথম চারটি চরণ–‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই...।’ প্রস্তাবিত সেই ২ টাকার নোটটির অপর পৃষ্ঠে স্থান পেয়েছে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়। ৩০ লাখ মানুষের রক্তে রক্তিম এ দেশের পতাকা। তাই ঘুরেফিরে বাংলাদেশের টাকায় বারবার উঠে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। 

আরও পড়ুন

×