ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

নদী থেকে সাগর

মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার

মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার
×

 সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটের সুরমা নদীর বুকে যখন ভোরের আলো ফোটে, জেলের জালে কিংবা মাঝির নৌকায় জীবনের চেনা ছন্দই বেজে ওঠে। দূর থেকে দেখলে এ এক চিরচেনা, শান্ত ও স্বাভাবিক দৃশ্য। এই শান্ত জলের গভীরে, চোখের আড়ালে নিঃশব্দে বিস্তার ঘটছে এক ভয়ানক বিপদের– প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। 

শুধু সুরমা নয়, দেশের অন্যান্য নদ-নদীর চিত্রও শিউরে ওঠার মতো। সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণের এই জাল জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। গঙ্গা নদীর পানিতে প্রতি ঘনমিটারে গড়ে ৩৪ থেকে ৪২টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা ভাসছে। অর্থাৎ এক ঘনমিটার পানিতেই কয়েক ডজন বিষাক্ত কণা মিশে আছে। আরও ভয়াবহ অবস্থা নদীর তলদেশে। ব্রহ্মপুত্রের তলদেশের পলিতে প্রতি কিলোগ্রামে মিলেছে ৫৩১ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা। দূষণ কেবল পানির উপরিভাগেই ভাসছে না, তা বিষাক্ত পলির স্তরের মতো জমা হচ্ছে নদীর বুকেও এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা কেবলই বাড়ছে।

কোথা থেকে আসছে এই বিপুল দূষণ? পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিদিন আমাদের দেশে প্রায় তিন হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল–এই এক দশকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে বছরে প্রায় ৮২ কোটি কিলোগ্রাম প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়; যার মাত্র ২৭ শতাংশ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়। বাকি বিশাল অংশ পড়ে থাকে প্রকৃতিতে। প্রসাধনসামগ্রী, কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহৃত প্লাস্টিক রোদে-জলে ভেঙে তৈরি হওয়া এই কণাগুলো বৃষ্টির পানির সঙ্গে বা নালা হয়ে মিশছে নদীর স্রোতে। মেঘনা, কর্ণফুলী ও রূপসার মতো বড় নদীগুলো প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ টন বর্জ্য বয়ে নিয়ে ফেলছে সাগরে। ফলে দূষণ শুধু মোহনাতেই আটকে নেই, তা ছড়িয়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতেও।
রাজধানীর জলাশয়গুলোর অবস্থাও তথৈবচ। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি বা ক্রিসেন্ট লেকের পানিতে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতুর পাশাপাশি মিশে আছে হাজারো প্লাস্টিক কণা। এসব জলাশয়ের পানি শুধু পানের অযোগ্যই নয়, বরং স্পর্শ করার জন্যও হুমকিস্বরূপ। এর বড় কারণ, অর্ধেকের বেশি কারখানায় কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার নেই। ফলে বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি মিশছে পানিতে। এসব হ্রদের মাছ ও জলজ উদ্ভিদে জমছে ভয়াবহ বিষ। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এই দূষণ এখন আর কেবল নদী বা প্রকৃতির সমস্যা নয়; এটি পৌঁছে গেছে আমাদের খাবার প্লেটেও। গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় মাছ ইলিশের পেটেও গড়ে প্রায় ১৯টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যাচ্ছে। মেঘনা নদীর বড় মাছগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে এই দূষণের শিকার। শুধু মাছ নয়; গুঁড়া দুধ, তরল দুধ, এমনকি দৈনন্দিন ব্যবহৃত আটা-ময়দাতেও মিলেছে এই অদৃশ্য কণার উপস্থিতি। পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের নানা ধাপে এগুলো খাদ্যে মিশে যাচ্ছে। মানুষ হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো বড় রোগে ভুগছে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদিন একটু একটু করে প্লাস্টিক গ্রহণের এই পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এগুলো শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র থেকে শুরু করে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। 
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। দেশে ব্যবহৃত মোট প্লাস্টিকের বড় অংশ যদি পুনর্ব্যবহার করা যায় এবং উৎসমুখেই বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা থাকে, তবে আগামী দুই দশকের মধ্যে পরিবেশে প্লাস্টিকের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। আমাদের দেশে থাকা বিশাল অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহ খাতকে যদি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা যায়, তবে এটি দূষণ রোধে বড় হাতিয়ার হতে পারে। 

আরও পড়ুন

×