হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার
দানবাক্স বসিয়ে তিন ডেগ সিলগালার নেপথ্যে কী
দানের ডেগে প্রশাসনের সিলগালা
ফয়সল আহমদ বাবলু, সিলেট
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
শতাব্দীর পুরোনো অলিখিত রেওয়াজ ভেঙে সিলেটের হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের দানের হিসাবে প্রথমবারের মতো হস্তক্ষেপ করেছে জেলা প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লার নেতৃত্বে প্রশাসনের একটি উচ্চপর্যায়ের দল আকস্মিক মাজার চত্বরে আসে। তারা তিনটি প্রধান দানের ডেগ সিলগালা করে দেন। এ সময় তারা নতুন দানবাক্স বসিয়ে দেন।
প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপ সবাই সহজভাবে নেয়নি। মাজার-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। কেউ সাধুবাদ জানালেও কারও কারও মতে, এটি শতাব্দীপ্রাচীন পরম্পরায় ‘সরকারের ভাগ’ বসানোর চেষ্টা। যদিও প্রশাসন বলছে, আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকার সাভার থেকে আসা ভক্ত আলীমুল এহসান বলেন, ‘আমরা যুগ যুগ ধরে এখানে আসি ভক্তি থেকে। আমাদের দেওয়া দান যেন সঠিক জায়গায় খরচ হয়, এটিই আমাদের চাওয়া।’ এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহজালাল ভক্ত পরিষদের নেতা আসলাম উদ্দিন বলেন, ‘এখানে প্রশাসন কেন সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে, তা আমার বোধগম্য নয়। তারা হিসাব চাইতে পারত, মাজার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিতে পারত। এভাবে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই বিষয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করা দরকার ছিল।’
ঘটনার নেপথ্যে কী
প্রশাসনের এই আকস্মিক হস্তক্ষেপের পেছনে রয়েছে বড় এক আর্থিক জটিলতা। অনুসন্ধানে জানা যায়, দরগাহ এলাকায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক ভবন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২৫ কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ ও বাকি ৫ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল দরগাহ কর্তৃপক্ষের। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন ৩ কোটি টাকা দিলেও বাকি ২ কোটি টাকা দিতে ব্যর্থ হয় দরগাহ কর্তৃপক্ষ। এর সূত্র ধরেই পরিকল্পনা কমিশন দরগাহের আয়-ব্যয়ের হিসাব তলব করে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম
মাজার পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, সেখানে আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব বা রেজিস্ট্রার নেই। নগদ টাকা ও নজরানা লিপিবদ্ধ করার কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। কিছু ব্যক্তি সংগৃহীত টাকা ইচ্ছামতো ভাগ করে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে গত ১৬ জুন মাজারের খাদেম ও সিলেটের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে জরুরি সভা করেন জেলা প্রশাসক। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা মাজারের পার্কিংয়ের সংকট, চুরি-ছিনতাই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব ও ভক্তদের ভোগান্তিসহ নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই দানবাক্স বসায় প্রশাসন। মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সাতশ বছরের প্রচলিত প্রক্রিয়া জোর করে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে; যা মাজার ও অলি-আউলিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড। এই টাকা শুধু খাদেমরাই নেন না, মসজিদসহ মাজারের উন্নয়নেও ব্যয় হয়।’
খাদেম সামুন মাহমুদ খান বলেন, ‘আমরা পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করছি। সময় হলেই জানতে পারবেন।’
দানের টাকা সরকারি তহবিলে নেওয়া হবে না জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, এই অর্থ সরকারের নয়, জনগণের; আর সেই অর্থ কোথায় যায় তা জানার অধিকার জনগণের আছে। আগামী এক মাস ওয়াক্ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ব্যাংকের মাধ্যমে হিসাব রাখবে। আর আদালতের নির্দেশে প্রতি ১৫ দিনে তালা খুলে অর্থ গণনা করে মাসিক বিবরণী প্রকাশ করা হবে।
- বিষয় :
- মাজার
