চমেক হাসপাতাল
স্বজনরা ফেলে গেছে রাস্তায়, এখন হাসপাতালই পরিবার
তিন বছর ধরে চিকিৎসাধীন, স্বজনদের খোঁজ নেই
অজ্ঞাত পরিচয়ে সাড়ে তিন বছর ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে শিশুটি। রক্তের সম্পর্কের না হলেও তাকে লালন-পালন করছেন ডাক্তার-নার্স-আয়ারা। সম্প্রতি তোলা- সমকাল
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৯:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। শিশু বিভাগের ‘এসএএম-০৪’ নম্বর শয্যা। সেখানে শুয়ে আছে একটি শিশু। সে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। কথা বলতে পারে না। তাই তার নাম-পরিচয় কেউ জানে না। মা-বাবার হদিস নেই। বয়স বড়জোর ১১ বছর। সাড়ে তিন বছর ধরে এই শয্যায় চিকিৎসাধীন সে। চিকিৎসক, নার্স, আয়া কিংবা ওয়ার্ড বয়দের দেখলে ওর মুখে এক অনাবিল হাসি ফুটে ওঠে। খুশি হয় সে। নানাভাবে তার মনের ভাব প্রকাশ করে। এতদিনে তাঁরাই হয়ে উঠেছেন শিশুটির পরম স্বজন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩০ মে। দুই সহৃদয় ব্যক্তি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনেন শিশুটিকে। তখন জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছিল, শ্বাসকষ্টে হচ্ছিল। তার নাম-পরিচয় কেউ জানতেন না। তাই রেজিস্ট্রি খাতায় লেখা হয়, অজ্ঞাতপরিচয়। তার মা-বাবা কিংবা কোনো স্বজনের সন্ধান মেলেনি। তাকে খুঁজতে কেউ হাসপাতালে যোগাযোগ করেননি। হয়তো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় মা-বাবা তাকে পরিত্যাগ করেছেন। কিন্তু হাসপাতাল তাকে ফেলেনি, দিয়েছে আশ্রয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে ‘এসএএম-০৪’ নম্বর শয্যায় দেখা যায়, শিশুটি শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মুসা আসেন। শিশুটির মাথায় হাত বোলান। শিশুটি হাসিমুখে তাঁর দিকে তাকায়। কী যেন বলার চেষ্টা করে। চিকিৎসকও নানাভাবে তার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করেন।
একটু পর ওয়ার্ডের আয়া রানু বড়ুয়া আসেন খাবার নিয়ে। শিশুটির মুখে খাবার তুলে দেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এ সময় রানু বড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে শিশুটিকে হাসতে দেখা যায়।
এর কিছুক্ষণ পর শিশুটির শয্যার পাশে এসে দাঁড়ান ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ শাহানাজ বেগম। ওষুধ খাইয়ে দেন তিনি নিজ হাতে। একে একে আসেন ওয়ার্ডের আয়া রোকেয়া বেগম, রেহানা বেগম, কবিতা মিত্র, মরিয়ম বেগম, সুমি বেগম, সখিনা বেগম ও ফরিদা বেগম। তাঁরাই শিশুটির পরিচর্যা করেন। রঙিন ফুটবল নিয়ে সেখানে হাজির হন ওয়ার্ডের সরদার নিজাম উদ্দিন। সবাইকে চারপাশে দেখে শিশুটি খুবই আনন্দিত হয়। যেন মা-বাবা, রক্তের সম্পর্কের কাউকে কাছে পেয়েছে সে। তাঁরাই এখন তার পরম বন্ধু, আত্মার আত্মীয়।
জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘অজ্ঞাতপরিচয়ে শিশুটির চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে ওষুধ, খাওয়া সবকিছুই হাসপাতালের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে। মনে করেছিলাম মা-বাবা শিশুটিকে নিতে আসবে। এতদিনেও কেউ আসেনি। পরিবারের কেউ পাশে না থাকলেও, আমরা সবাই তার পাশে আছি।’
শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুসা বলেন, ‘শিশুটি জন্মগত প্রতিবন্ধী। ২০২৩ সালের ৩০ মে থেকে আমাদের তত্ত্বাবধানে তার সবকিছুই চলছে। ওয়ার্ডের চিকিৎসক, নার্স, আয়ারা তার যাবতীয় বিষয় দেখভাল করছেন। দীর্ঘদিন ধরে সবাই পাশে থাকায় সবার সঙ্গে শিশুটির আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।’
ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ শাহানাজ বেগম বলেন, সবাই পালা করে শিশুটির দেখাশোনা করেন। সে এখন সবার পরিবারের একজন সদস্যের মতো হয়ে গেছে।
ওয়ার্ডের আয়া রানু বড়ুয়া বলেন, ‘মানুষ কতটা অমানবিক হলে এমন একটি অসহায় শিশুকে রাস্তায় ফেলে যেতে পারে! সে জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। এ কারণেই হয়তো মা-বাবা শিশুটিকে রাস্তায় ফেলে চলে গেছেন। কিন্তু শিশুটির কী দোষ?’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সুরক্ষাবঞ্চিত শিশুদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা শিশুটিকে নিতে রাজি হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শিশুটিকে সেখানে পাঠানো হবে।
হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সমাজসেবা কর্মকর্তা অভিজিৎ সাহা বলেন, ‘শিশুটির ওষুধ, পোশাকসহ আনুষঙ্গিক জিনিস বাবদ অর্থসহ নানা সহায়তা দিয়ে আসছি আমরা। শুরুর দিকে শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। হাসপাতালের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিশুটি এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে। এতে আমরা আনন্দিত।’
- বিষয় :
- চমেক হাসপাতাল
- হাসপাতাল
