ডালাসেও মেক্সিকান ঢেউ
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৫
শত শত বছর আগে যাদের পূর্বপুরুষরা শ্রম দিতে টেক্সাসে এসেছিল, আজ তাদের চতুর্থ প্রজন্ম নিজেদের ‘তেহানা’ বা মেক্সিকান আমেরিকান হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করে। ডালাসের এই ‘টেক্স-মেক্স’ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪২ শতাংশ। সপ্তাহের শেষ দিন এখানকার ‘টর্নেডো’ বা ‘ওমনিবাস’ এক্সপ্রেসের মতো মেক্সিকোগামী আন্তঃদেশীয় বাসগুলোর জানালায় ঝুলে থাকে কিছু ক্লান্ত প্রবাসীর মুখ। এসব বাসের জানালায় যে মেক্সিকান পতাকাটি ওড়ে, সেই একই পতাকায় বৃহস্পতিবার রাতে ছেয়ে গিয়েছিল পুরো ডালাস। শহরের ফেয়ার পার্কের ফ্যান ফেস্ট আসা হাজারও মেক্সিকান যেন ৪৩০ মাইল দূরত্বের হাইওয়ে আর কাঁটাতারের দূরত্বটা কমিয়ে এনেছিল ৯০ মিনিটের এক ফুটবল ম্যাচে; যেখানে দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে এবারের বিশ্বকাপে প্রথম দল হিসেবে শেষ বত্রিশে পা রাখার যে গর্ব, তা ছুঁয়ে গিয়েছিল ডালাসকেও।
আসলে এই শহরটির সঙ্গে এক নাড়ির টান আছে মেক্সিকানদের। এখানকার আকাশছোঁয়া ভবনগুলোর ৬৩ শতাংশই সীমান্ত পেরিয়ে আসা মেক্সিকান শ্রমিক। রাস্তা মেরামত, ম্যানুফ্যাকচারিং, রেস্তোরাঁ, হোটেল, বাগান পরিচর্যা, ট্রাকচালক–টেক্সাসের একটি টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএস টেক্সাস, তাদেরই একটি পরিসংখ্যানের তথ্য এগুলো। বাস্তবে তারচেয়েও বেশি দেখা, ডালাস সত্যিই যেন এক ‘লিটল মেক্সিকো’। তাই লুইস রোমোর গোলে গুয়াদালাহারার গ্যালারির ঢেউটাই যেন আছড়ে পড়ে ডালাসের বিভিন্ন পাব আর রেস্তোরাঁতে। এই শহরে ফুটবল যতটা না মার্কিনিরা চেনে, তার চেয়েও এই খেলাটিকে যেন বেশি ভালোবাসেন এই প্রবাসী মেক্সিকানরা। তাদের পাসপোর্ট এখানকার হলেও ভিসা এখন এই বিশ্বকাপ ফুটবলের।
এদিনের ম্যাচটি অবশ্য ফেভারিটের মতো দেখায়নি মেক্সিকোকে। প্রথমার্ধে বড্ড বেশি রক্ষণাত্মক ছিল তারা। যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার বল পজেশনই ছিল ৫৭ শতাংশ। ঘরের মাঠে প্রিয় দলকে এতটা গুটিয়ে থাকতে দেখে গ্যালারি থেকেও একসময় দুয়ো ওঠে। তবে দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই গোলের জন্য মরিয়া ছিল। আসলে ম্যাচটির সমীকরণ এমনটাই ছিল যে, জয় পেলেই পরের রাউন্ড নিশ্চিত। সেখানে কোরিয়ান কোচ হং-ম্যুর বো ৩-৪-২-২ ফরমেশনে মাঝ মাঠের দখল নেন। কিন্তু দৃষ্টিকটুভাবে একটি ভুল করে বসেন কোরিয়ান
ফুটবলাররা। ম্যাচের ৫০ মিনিটে কোরিয়ান ডিফেন্ডার লিগি হিউক এবং গোলরক্ষক কিম সুং গিউয়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে গোলরক্ষকের হাত থেকে বল ফসকে যায়। বক্সের ভেতরে থাকা মেক্সিকান মিডফিল্ডার লুইস রোমো তা ফাঁকা পেয়ে যান এবং শরীরটাকে চমৎকারভাবে ঘুরিয়ে তা জালে পাঠিয়ে দেন। কোরিয়ান গোলরক্ষক যখন শিশুতোষ এই ভুল করেন তখন মেক্সিকান গোলরক্ষক রাউল রাঞ্জেলের দুর্দান্ত দুটি সেভ স্বাগতিকদের নিশ্চিত জয় এনে দেয়। একেবারে শেষ মুহূর্তে চো গুয়ের একটি জোরালো হেড ঠেকিয়ে দেন মেক্সিকান গোলরক্ষক রাউল। প্রথমে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পরে মাটিতে স্লাইড করে ফিরতি ভলিটিও অবিশ্বাস্যভাবে গ্রিপে নেন। ম্যাচ শেষে তিনিই হয়ে যান মেক্সিকান হিরো।
প্রথম দল হিসেবে শেষ বত্রিশে যাওয়ার আনন্দটা ছিল মেক্সিকান কোচ হ্যাভিয়ের আগিররের মধ্যে। ‘খেলাটা খুব সুন্দর বা দৃষ্টিনন্দন ছিল না– আমরা তা জানি। কোরিয়া আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং সত্যি বলতে কী তাদের একটি ভুলে আমাদের ভাগ্য খুলে দেয়।’ কোরিয়ান কোচেও সেই ভুলের জন্যই ম্যাচ শেষে কপাল চাপড়াতে হয়। ম্যাচের তাঁর ভুল কৌশলের জন্যও সমালোচনা শুনতে হয়। বলের পজেশন ৫৭ শতাংশ, পাসিং অ্যাকিউরেসি ৮৭ শতাংশ থাকার পরেও পুরো ম্যাচে কোনো ক্রস বা ড্রিবল আক্রমণভাগে দেখা যায়নি। ৫৬ মিনিটে অধিনায়ক সন হিউং মিনকে উঠিয়ে নেওয়ার জন্যও কোরিয়ান সমর্থকদের অসন্তোষ দেখা যায় ডালাসেরই ফ্যানপার্কে।
তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এবারের ফরম্যাটে প্রতিটি দলের প্রথম ও দ্বিতীয় দল ছাড়াও তৃতীয় দলেরও সুযোগ থাকবে শেষ বত্রিশে যাওয়ার। তাই কোরিয়ারও সম্ভাবনা থাকছে। আপাতত না হয় মেক্সিকান ওয়েবই চলুক গ্যালারিতে।
- বিষয় :
- মেক্সিকো
- বিশ্বকাপ ফুটবল
