ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

২২৯ কোটি টাকার প্রকল্প

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে উল্টো কমেছে

প্রকল্প মেয়াদ শেষ ৩০ জুন

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে উল্টো কমেছে
×

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৯:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২২৯ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল মৎস্য অধিদপ্তর। লক্ষ্য ছিল, ইলিশ উৎপাদন ৫৩ হাজার টন বাড়বে। পাশাপাশি মাছের আকার বড় হবে। এতে বাজারে সরবরাহ বাড়বে, দামও কমবে। ছয় বছর মেয়াদের প্রকল্পটি শেষ হচ্ছে এই জুনে। কিন্তু লক্ষ্য পূরণ হয়নি, বরং উল্টো ফল হয়েছে।

তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন ৫৩ হাজার টন বাড়ানোর প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু ছয় বছরে ৬৭ হাজার টন কমেছে। আকার আরও ছোট হয়েছে। ছয় বছর আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ গ্রাম। এখন সেটি হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম। 

প্রকল্প দায়িত্বশীলদের ভাষ্য, আহরণ সংখ্যার হিসাবে ইলিশ বেড়েছে। আকার ছোট হওয়ায় ওজনের হিসাবে বার্ষিক উৎপাদন কমেছে। সাগরের ইলিশ সুরক্ষিত করতে না পারা ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণের জন্য এমনটা হয়েছে। 

‘ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামের প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ১ জুলাই। ছয় বছর নিষ্ফল প্রকল্প পরিচালনার পর এখন নতুন আরেকটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রকল্পের প্রথম দুই বছরে উৎপাদন বেড়েছিল। এর পর প্রতিবছর কমতে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছিল পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টন, যা ছিল মৎস্য অধিদপ্তরের ইতিহাসে বার্ষিক সর্বোচ্চ আহরণ। পরের বছর ৪২ হাজার টন কমে হয় পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও ২৯ হাজার টন কমে নেমে আসে পাঁচ লাখ টনে। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে ইলিশের আহরণ কমেছে ৭১ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আহরণের তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা নিশ্চিত করেছেন, এবারও পাঁচ লাখ টনের বেশি হবে না। 

উৎপাদন কেন কমলো 
ইলিশ কমেছে এটা মানতে নারাজ ‘ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন। তাঁর যুক্তি, আহরিত ইলিশের সংখ্যা গুনলে সেটি আগের চেয়ে অনেক বেশি। আকারে ছোট হওয়ায় ওজনের হিসাবে বার্ষিক আহরণ আগের চেয়ে কম। 

তাঁর মতে, ইলিশের পেটে প্রথমবার ডিম আসে ৮ থেকে ৯ মাস বয়সে। তখন সেটি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের হয়। দ্বিতীয় বছর যখন ডিম আসে, তখন ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশে পরিণত হয়। সেই হিসাবে পরিপূর্ণ ইলিশ হতে দুই বছর সময় লাগে। তবে আহরণ অস্বাভাবিক বাড়ায় প্রথম বছর প্রজননের সময়েই জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। এ কারণে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম আকারের প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। 

তবে নাসির উদ্দিনের যুক্তিকে দায় এড়ানোর অজুহাত বলে মন্তব্য করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী। ইলিশ উৎপাদন কমার বিষয়ে তিনি বলেন, মোহনা-সংলগ্ন ইলিশের অভয়াশ্রমের নদীতীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র করে সেখানকার পানি দূষিত করা হচ্ছে। যে কারণে অভয়াশ্রমে ইলিশ কমেছে। বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর দূষিত পানি মিশে পদ্মা-মেঘনা ইলিশ বসবাসের উপযোগিতা হারাচ্ছে। জেলেরা মোহনায় নিরবচ্ছিন্ন জাল পেতে ইলিশের যাতায়াতের পথ আটকে দিয়েছে। এ ছাড়া ডুবোচর ও নাব্য সংকটে ইলিশের চলার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে ইলিশ উৎপাদন কমার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ জন্য অতিরিক্ত আহরণ যেমন দায়ী, তেমনি মানবসৃষ্ট ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাও রয়েছে। ইলিশ কমার কারণ চিহ্নিত ও পরিস্থিতি উত্তরণে মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন। 
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন ধাপে নিধনে ইলিশ হারাতে যাচ্ছে। প্রথম ধাপে, সূক্ষ্ম জাল দিয়ে নিধন হয় একেবারে ছোট বাচ্চা, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাপিলা’ নামে বাজারে বিক্রি হয়। এ পর্যায় থেকে যেসব বাচ্চা রক্ষা পায়, সেগুলো পরে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে নির্বিচারে ধরা হয়। এর পরও যেসব জাটকা বেঁচে সাগরের দিকে যেতে পারে, সেগুলোকে বড় ট্রলার এবং কাঠের রূপান্তরিত ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ধরা পড়ছে। এতে ইলিশ বেড়ে ওঠার সুযোগই পাচ্ছে না।

ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হবে। ইলিশের জন্য নতুন আরেকটি প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলছে। প্রকল্পটি গৃহীত হলে কমপক্ষে এক বছর পর এর কার্যক্রম শুরু হবে। 
চলমান প্রকল্পের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইলিশের বাড়ি সাগরে। আমরা নদীতে সফল হয়েছি। সাগরের ইলিশ রক্ষা করতে পারিনি। এ ছাড়া ডুবোচর ও নাব্য সংকটও দায়ী। এর সমাধান করতে হলে সরকারের মেগা প্রকল্প নিতে হবে। নতুন প্রকল্প গৃহীত হলে সাগরে অভিযান চালানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে।
 

আরও পড়ুন

×